”বড়দির কাছে।” একটু আড়ষ্ট হয়েই কলাবতী বলেছিল। সে জানে মুখুজ্যেবাড়ির প্রশংসা শুনলেই দাদু তেলেবেগুনে হয়ে যায়।
”মলুর, মলয়ার কাছে? ও—বাড়ির মেয়েরা আবার সাজগোজের বোঝেটা কী? হরির মেয়ের রংটাই শুধু ফরসা। তোর এই রঙের পাশে কি মেমসাহেবদের রং দাঁড়াতে পারে? লোকে কেন যে ফরসা ফরসা করে হেদিয়ে মরে। কালো হচ্ছে জগতের আলো।”
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা কলাবতী। নাকটা কুঁচকে বলল, ”তা হলে এবার যাই বিয়েবাড়ি আলো করে দিয়ে আসি।”
”কাকার দিকে নজর রাখিস, লুচি—ছ্যাঁচড়ায় যা লোভ।”
হাঁটতে হাঁটতে দু’জনে বিয়েবাড়ির সামনে হাজির হল। নানান রঙের নানান চেহারার মোটরগাড়ি এসে ফটকের সামনে দাঁড়াচ্ছে, সাজগোজ করা মেয়ে পুরুষ ও বাচ্চচারা গাড়ি থেকে নামছে। ফুল দিয়ে বাংলায় ‘স্বাগতম’ আর ইংরেজিতে ‘ওয়েলকাম’ লেখা ফটকের মাথায়। সামনে দাঁড়ানো কিছু বয়স্ক ও আধা—বয়স্ক ধুতি—পাঞ্জাবি পরা লোক এগিয়ে হাতজোড় করে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলছে। তারপর হাত দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ভেতরে ঢুকে ডান দিকের না বাঁ দিকের কোন পথ ধরে যেতে হবে।
ফটকটা পার হয়েই বাঁদিক ও ডান দিকে পথ চলে গিয়েছে অর্ধচক্রাকারে একটুকরো ঘাসের জমিকে ঘিরে এবং আবার এসে মিলেছে বাড়িতে ওঠার টানা লম্বা সিঁড়িতে। সিঁড়িতে প্রায় দশটা ধাপ। উঠে গেলে চওড়া দালান। তার দু’ দিকে দুটো ঘর, সামনে তিনটে দরজা। দরজা পার হলে উঠোন। উঠোন ঘিরে চওড়া দালানের মতো রক। রকের দু’ধারে দোতলায় যাওয়ার দুটো সিঁড়ি। সিঁড়ির শ্বেত পাথরগুলো ভাঙা এবং ফাটা, থামগুলোয় দায়সারা কলি করা। ফটকে ঢুকেই দু’ধারে আগাছা। মার্কারি ভেপারের আলো ফটকের মাথায়। বাড়ির ছাদ থেকে ঝুলছে তিন—চার রঙের টুনি বালব, দু’দিকের পথের ধারে রাখা চেয়ারে আমন্ত্রিতরা বসে।
ওরা দু’জন হাঁটতে—হাঁটতে এসে ফটকের সামনে দাঁড়াল। কলাবতীর হাতে সোনালি জরির ফিতেয় বাঁধা রঙিন কাগজে মোড়া গহনার বাক্স। হাবিলদারি সাদা গোঁফ, টাকমাথা, গরদের পাঞ্জাবি গায়ে, ছড়ি হাতে এক বৃদ্ধ হাসি—হাসি মুখে এগিয়ে এলেন সত্যশেখরের দিকে।
”আপনারা কি বরপক্ষের?”
”না, না, কনেপক্ষের, কাছেই তো বাড়ি, তাই হেঁটেই চলে এলুম।” সত্যশেখর বিনীত স্বরে বলল।
”কিছু মনে করবেন না, আমি তো সবাইকে চিনি না। মানুর বিয়েতে এসেছেন তো?”
”অবশ্যই।” সত্যশেখর সপ্রতিভ দ্রুত উত্তর দিল।
”তা হলে এই ডান দিকে চলে যান। বর এখনও আসেনি, লগ্ন তো দশটায়। একটু পরেই এসে যাবে, কলকাতায় ট্র্যাফিকের যা অবস্থা।” বলতে বলতে বৃদ্ধ সদ্য আগত এক দম্পতির দিকে এগিয়ে গেলেন।
”আয় রে কালু।” সত্যশেখর ডান দিকের পথ ধরল।
কলাবতী তখন কথা বলছে সিল্কের পাঞ্জাবি, কোঁচানো ধুতিপরা এক প্রৌঢ়ের সঙ্গে।
”ইচ্ছেদিদার নাতনি!” প্রৌঢ়কে থতমত দেখাল। ”আমি বাচ্চচুর জ্যাঠামশাইয়ের শালা, ধানবাদে থাকি। তুমি বরং বাঁ দিকের ওই চেয়ারের একটায় বোসো। মুশকিল হয়েছে কী, আমি এদের বাড়ির দু—তিনজন ছাড়া কাউকেই চিনি না।” কিন্তু—কিন্তু করে তিনি বললেন।
”ওই একই সমস্যা আমারও। ইচ্ছাদিদার নাতনির নাম যে বাচ্চচু, সেটাই এই প্রথম শুনলাম।” বলেই কলাবতী বাঁ দিকের পথে এগোল। বিব্রত হয়ে ভাবল, বিয়ের কার্ডে অমিতা না সুমিতা কী যেন একটা নাম দেখেছিল। নামটা এখন আর মনে পড়ছে না। ওটা সঙ্গে করে আনলে ভাল হত। চেয়ারগুলো ভর্তি হয়ে রয়েছে। খালি চেয়ারের খোঁজে সে তাকাচ্ছে তখন দেখতে পেল হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছেন হরিদাদু। অবাক হয়ে সে এগিয়ে গেল হরিশঙ্কর মুখুজ্যের দিকে। সিংহিবাড়ির এক নাতনির বিয়েতে কিনা বকদিঘির মুখুজ্যেবাড়ির লোক নিয়ন্ত্রিত! তাজ্জব ব্যাপার!
”হরিদাদু আপনি?”
”কেন আমি কি নেমন্তন্ন খেতে যাই না? আমার বহুদিনের বন্ধুর নাতনির বিয়ে, এই অ্যাত্তটুকু বয়স থেকে বাচ্চচুকে দেখে আসছি। তারপর এধার—ওধার তাকিয়ে হরিশঙ্কর বললেন, ”খালি চেয়ার তো একটাও দেখছি না। তুমি বরং ভেতরে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে বোসো।”
বয়স্ক মহিলামহল কলাবতীর একেবারেই ভাল লাগে না। সে বলল, ”এই তো বেশ দাঁড়িয়ে আছি, অসুবিধে হচ্ছে না। বড়দি আসেনি হরিদাদু?”
”না। সন্ধে থেকে মাথা ধরেছে, শুয়ে আছে। বাচ্চচুর বিয়েতে আটঘরার লোকের নেমন্তন্ন ভাবতেই পারছি না। সিংহিবাড়ির সঙ্গে ভবতোষদের সম্পর্ক আছে তা তো জানতুম না।”
”আমিও কি জানতুম ইচ্ছাদিদার নাতনির বিয়েতে আপনাকে দেখতে পাব!” কলাবতী হাসল। দেখল দূরে একটা চেয়ারে বসে কাকা হাত তুলে তাতে ডাকছে।
”ইচ্ছেদিদা কে?” হরিশঙ্কর উদগ্রীব হলেন।
”লখনউয়ে থাকেন। দাদুর পিসতুতো বোন। আচ্ছা আমি এখন কাকার কাছে যাব, ডাকছে।”
অবাক হয়ে থাকা হরিশঙ্করকে রেখে কলাবতী তার কাকার কাছে এল।
”হরিকাকা এখানে কেন রে?”
”ওঁর বন্ধুর নাতনি বাচ্চচুর বিয়ে।”
”বাচ্চচু কী? মানুর বিয়ে।”
”হরিদাদু তো বাচ্চচুই বললেন।”
”আমাদের এই এক মুশকিল। আদর করে এক—একজন এক—একটা নাম রাখে। কেউ ডাকছে বাচ্চচু, কেউ বলবে মানু।…হ্যাঁ রে ভেতরটা একবার ঘুরে আসবি? উপহারটা তো মেয়ের হাতে দিতে হবে। চট করে দিয়ে আয় আর সেইসঙ্গে পারলে দেখে নিবি এই ব্যাচটার পাতে এখন কী চলছে, চাটনি পর্যন্ত এসেছে কি না।”
