ইচ্ছাময়ী চলে যাওয়ার পর কলাবতী কার্ডটা পড়ল।
”দাদু, ১৬ নম্বর সি আই টি রোড, মনে হচ্ছে বাড়িটা চিনি, আমাদের স্কুলের কাছেই। খুব পুরনো, মোটা—মোটা থাম আছে, ফটক আছে অনেকটা আমাদের বাড়ির মতোই। এখন বিয়ের জন্য ভাড়া দেয়।”
”কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোর এখন বেশিরভাগেরই এই দশা। পূর্বপুরুষেরা তো আর জানত না কলসির জল গড়িয়ে—গড়িয়ে খেয়ে একশো দেড়শো বছর পরে বংশধরদের কী হাল হবে। তারা তো বড়লোকি দেখাতে মোটা—মোটা থামের বাড়ি করে গেছে। এখন ওই থামে সিমেন্ট—বালি লাগিয়ে কলি করাবার টাকা নেই তার ওপর অংশীদারের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। সেদিক থেকে আমি বরং বেঁচে গেছি। আমার সম্পত্তির মালিক হবে একজনই।” রাজশেখর মিটমিট হাসলেন কলাবতীর দিকে তাকিয়ে।
”এতবড় বাড়ি, লোক মাত্র তিনজন, কী হবে এটা দিয়ে? তার থেকে বরং বিক্রি করে ফ্ল্যাট কেনো।” কলাবতী দাদুকে চটাবার জন্য বলল। রাজশেখর হাতের লাঠিটা তুলতেই দুটো লাফ দিয়ে কলাবতী সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাতের খাওয়ার টেবিলে ওরা তিনজন। রাজশেখর, ছোট ছেলে সত্যশেখর ওরফে সতু আর কলাবতী। রুটি ছিঁড়ে আলু—পটল—কুমড়োর ডালনার বাটিতে ডুবিয়ে সতু বলল, ”শীতকালেই খাওয়ার আরাম, তাই না রে কালু? কতরকমের তরিতরকারি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কড়াইশুঁটি—”
কাকাকে থামিয়ে দিয়ে কলাবতী বলে উঠল, ”তার ওপর অঘ্রান, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন মাসে বিয়ের সিজন, কত নেমন্তন্ন খাওয়া।”
”কালু পৌষ মাসে বিয়ে হয় না।” রাজশেখর ভুল ধরিয়ে দিলেন।
রুটি চিবোতে—চিবোতে সতু বলল, ”ওহ, কতদিন নেমন্তন্ন বাড়ির বেগুনভাজা আর ছোলার ডাল যে খাইনি। ফুলকো—ফুলকো গরম লুচি…পৃথিবীর কোনও খাবারের সঙ্গে তুলনা হয়?”
রাজশেখর বিরক্ত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ”আমাদের বাড়ির লুচি কি ফুলকো হয় না। ছোলার ডাল বেগুনভাজা কি অপুর মা খারাপ রাঁধে?”
কলাবতী প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলল, ”তোমার লুচি বেগুনভাজার একটা ব্যবস্থা আজ হয়েছে।”
সতু সটান হয়ে গেল। ”নেমন্তন্ন! কোথায়, কার, কবে?”
”আর তিনদিন পরে, ইচ্ছেদিদার নাতনির, ষোলো নম্বর সি আই টি রোড।”
সতু এবার বাবার মুখের দিকে তাকাল। রাজশেখর বললেন, ”ইচ্ছে হল আমার পিসতুতো বোন। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ তো রাখো না, জানবে কী করে। আমাদের কত আত্মীয় সারা ভারতে ছড়িয়ে রয়েছে। ইচ্ছের মা খাঁদুপিসির বিয়ে হয় গাজিয়াবাদে, ইচ্ছের বিয়ে হয় লখনউয়ে। ওর নাতনির বিয়ে হচ্ছে কলকাতায় সার বলেনের নাতির সঙ্গে। আজ ইচ্ছে এসেছিল নেমন্তন্ন করতে। তোমরা তো ওদের কাউকেই চোখে দ্যাখোনি। অবশ্য আমিও কাউকে দেখিনি শুধু ইচ্ছেকে ছাড়া। যাই হোক, তোমরা দু’জন এ—বাড়ির তরফে নেমন্তন্নটা রেখে এসো।”
”নিশ্চয় নিশ্চয়।” সতু দাঁত দিয়ে রুটি ছিঁড়ে পটলের টুকরো মুখে ঢোকাল। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে গেলে বিয়ের নেমন্তন্নে যাওয়ার থেকে ভাল আর কী হতে পারে, তাই না রে কালু? কত লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়, আলাপ পরিচয় হয়, কত খবর জানা যায়। তা হলে বাবা আমি আর কালু যাচ্ছি। কার নাতনি রে কালু?”
”বললুম তো ইচ্ছেদিদার।”
”ওহ ইয়েস, ইচ্ছে মানে উইশ, ডিজায়ার, অ্যাসপিরেশন। মনে থাকবে। কতদিন ফুলকো লুচি, বেগুনভাজা, ছোলার ডাল যে—।”
”দাদু, কী উপহার দোব?”
কলাবতীর প্রশ্নে রাজশেখর গভীর চিন্তায় পড়ে ক্ষীরের বাটিতে চামচ নাড়তে লাগলেন।
”সোনার একটা কিছু না দিলে তো মান থাকে না। ইচ্ছের নাতনি মানে আমারও নাতনি।”
”একটা আংটি?” কলাবতী প্রস্তাব দিল।
রাজশেখর ভ্রূ তুলে তাকিয়ে রইলেন। কথাটা যথেষ্ট মনঃপূত হল না।
”তা হলে কানের কিংবা গলার? আধ ভরির?” সতু প্রস্তাবটার সংশোধন করল।
”যা ভাল বুঝিস। পাঁচজন লোক দেখবে তো সিংহিবাড়ি কী দিল।”
”তা হলে এক ভরির, কী বলো কাকা?”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমি কালই হাইকোর্ট থেকে ফেরার পথে বউবাজার ঘুরে কিনে নিয়ে ফিরব। গলার একটা, পাথরটাথর বসানো—হ্যাঁ রে কালু, পুঁইশাকের সঙ্গে মাছের তেল আর কাঁটা দিয়ে ছ্যাঁচড়া বোধ হয় বিয়েবাড়িতে আজকাল আর করে না। লোকজনের খাওয়ার টেস্ট যে কত খারাপ হয়ে গেছে।” সতু আক্ষেপ জানিয়ে কাঁচাপাকা চুলেভরা মাথাটা নাড়তে লাগল, ”কত কাল যে খাইনি।”
”কাকা, অপুর মা চারদিন আগে পুঁইশাক আর ইলিশের মুড়ো দিয়ে ছ্যাঁচড়া করেছিল।”
”কালু, তোর কাকার জিভ আর স্মৃতিশক্তি দুটোই খারাপ হয়ে গেছে।” রাজশেখর চেয়ার ছেড়ে উঠলেন বিরক্ত মুখে।
ফিসফিস করে কলাবতী কাকার দিকে ঝুঁকে বলল, ”দাদুর কথাটার মানে বুঝলে? আবার ডায়েট চার্ট ক’রে তোমাকে থানকুনি, কালমেঘ, উচ্ছে, কাঁচাহলুদ খাওয়ানো শুরু করবে।”
”না, না, ছ্যাঁচড়া ফ্যাঁচড়া কি একটা খাওয়ার মতো জিনিস? পেঁপেসেদ্দ কত টেস্টফুল বল?”
সতু একটু জোরেই বলল, যাতে ঘর থেকে প্রস্থানরত রাজশেখরের কানে কথাটা পৌঁছয়।
.
গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যা ঘণ্টাখানেক উতরেছে। রাত প্রায় সাড়ে আটটা। কাকা আর ভাইঝি সি আই টি রোড ধরে হাঁটছে। সত্যশেখরের পরনে ধুতি, সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়ে শুঁড়তোলা চটি। কলাবতী পরেছে শাড়ি। টিকোল নাকে একটা হিরেমাত্র। যখনই মুখটি ঘোরাচ্ছে রাস্তার দোকানের আলোয় ঠিকরে উঠছে দ্যুতি। পথচারীরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। নাকের এই নাকছাবিটা রাজশেখর দিয়েছিলেন কলাবতীর মাকে, সেইসঙ্গে আরও লাখদেড়েক টাকার সোনার ও জড়োয়ার গহনা। তার অঙ্গে আর একটিও গহনা নেই, অবশ্য হাতঘড়িটাকে যদি গহনা ধরা না হয়। জামদানি শাড়ি পরে সে যখন দাদুকে দেখাতে আসে বিয়েবাড়ি যাওয়ার আগে, তখন মুগ্ধ চোখে রাজশেখর বলেন, ”এত সুন্দর করে সাজতে শিখলি কার কাছে?”
