”হনুমান কোথায়, হনুমান কোথায়।” চিৎকার উঠল দর্শকদের থেকে।
কলাবতী ডাকল ”অ্যাই হনুমান, শিগগির আয়।”
বিরাট একটা লাফ দিয়ে উইং থেকে স্টেজে পড়ল হনুমান। ল্যাজটা নামানো। হাতে একটা মর্তমান কলা। সেটার খোসা ছাড়িয়ে খেতে শুরু করল।
কলাবতী বলল, ”এই নাটক লেখায় প্রথমেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি দুই কবির কাছে—কৃত্তিবাস ওঝা আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তারপর ওঁদের বই যিনি পড়তে দিয়েছিলেন, সেই রাজশেখর সিংহর কাছে।”
মিনিটদশেক পর রাগে কাঁপতে—কাঁপতে মলয়া বলল, ”কোথায় ডেকরেটরের সেই লোকটা? মেয়েটার হাড়গোড় যদি ভেঙে যেত?”
জয়দেব তখন উলটোডাঙা স্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য অপেক্ষা করছে।
ভূতের বাসায় কলাবতী (১৯৯৮)
ভূতের বাসায় কলাবতী – মতি নন্দী / প্রথম সংস্করণ: আগস্ট ১৯৯৮/ আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা ৯ / পৃ. ১৪৪। মূল্য ৫০.০০ / প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: শংকর বসাক / উৎসর্গ: পুট্টু বোরা-কে
”কালু, এ হল আমার পিসতুতো বোন ইচ্ছাময়ী, তোর দিদা হয় আর ইচ্ছে, এ হল আমার নাতনি দিব্যর মেয়ে কালু, কলাবতী। এইবার উচ্চচ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিল, এখন ছুটি চলছে।” রাজশেখর কথা শেষ করেই চোখের ইঙ্গিতে প্রণাম করতে বললেন। কলাবতী ইচ্ছাদিদাকে তারপর ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসা দাদুকে প্রণাম করল।
ইচ্ছাময়ী প্রসন্ন চোখে কলাবতীর চিবুক ছুঁয়ে আঙুল ছোঁয়ালেন ঠোঁটে। ”শিখলে কোথায় গুরুজনদের প্রণাম করার এই শিক্ষাটা? এসব তো আজকালকার মেয়েরা জানেই না।” জিনস আর টপ পরা কলাবতীর থেকে চোখ সরিয়ে তিনি রাজশেখরের দিকে তাকালেন।
”সিংহি বংশের মেয়েদের কি এসব শেখাতে হয়, এ—বাড়িতে যে জন্মেছে, এ—বাড়ির বাতাসে যে শ্বাস নিয়েছে, সে আপনা থেকেই শিখে যায়।” রাজশেখরের গলার স্বরে ফুটে উঠল ক্ষীণ অহঙ্কার, চাপা গর্ব।
কলাবতী এই প্রথম দেখল ইচ্ছাদিদাকে। দাদুর যে একজন পিসতুতো বোন আছে সে জানত না। চেহারায় দাদুর সঙ্গে অনেক মিল আছে। তেমনই লম্বা নাক, বড় বড় টানা চোখ, ভারী গলা। সওয়া ছ’ফুট দাদুর পাশে দাঁড়ালে ইচ্ছাদিদার মাথা কান পর্যন্ত তো পৌঁছবেই আর ওজনেও দাদুর নব্বই কেজি’—র থেকে সামান্যই কম হবে। ওদের অমিলটা শুধু চুলে। রুপোর মতো ঝকঝকে থাক থাক বাবরি রাজশেখরের ঘাড় ঢেকে রেখেছে, বিধবা ইচ্ছাময়ীর মাথায় কাঁচাপাকা কদমফুল।
”রাজুদা তুমি যাবে তো?”
”এই পা নিয়ে! অসম্ভব।” রাজশেখর ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান পায়ের গোড়ালিটা আঙুল দিয়ে দেখালেন। চারদিন আগে ভোরে নিত্যদিনের মতো দু’মাইল প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়ে রাস্তার গর্তে পা পড়ে মচকে যায়। লাঠিতে ভর দিয়ে এখন ঘর থেকে বারান্দায় ইজিচেয়ার পর্যন্ত আসতে পারছেন।
”দিব্যকে কত ছোট দেখেছিলুম। লখনউয়ে থাকতেই শুনেছিলুম ওর বউ মারা গেছে। তারপর সন্নেসি হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে একটা মেয়ে রেখে।” ইচ্ছাময়ী স্নেহাতুর চোখে কলাবতীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ”তোমার আর নাতি—নাতনি নেই?”
”নাহ।” রাজশেখর গম্ভীর হলেন। ”সতু বিয়ে করেনি, মনে হয় করবেও না, পঁয়তাল্লিশ পার করে ফেলেছে। যা ওর মনে হয় তাই করুক, আমি তো তিনবার বলেছি, আমার কথা এড়িয়ে গেছে।…যাকগে কালুই আমার নাতনি আবার নাতিও। নিজের ইচ্ছেমতো ও বড় হয়েছে, আমি কোনও হস্তক্ষেপ করিনি। ওর স্কুলের হেডমিস্ট্রেস হল হরির মেয়ে মলু, সেই হল কালুর গার্জেন, মায়ের মতো। হরিকে তোর মনে আছে?”
”বকদিঘির মুখুজ্যে হরিশঙ্কর? ওরে বাবা মনে থাকবে না!” ইচ্ছাময়ী ভুরু কপালে তুললেন। ”কালোয়াতি গান শিখবে বলে একবার আগ্রা না পাটিয়ালা কোথায় যেন গেছল। তারপর ওস্তাদজির ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।”
”তুই তা হলে জানিস।” তৃপ্তস্বরে রাজশেখর বললেন, ”ওস্তাদজি হরিকে বলেছিলেন, আমার বকরিটাও তোর থেকে শুদ্ধভাবে পুরিয়া কল্যাণের সরগম করতে পারে। তাই শুনেই আগ্রা থেকে তানপুরাটা বগলে নিয়ে হরি চলে আসে। ওস্তাদজি ভদ্রলোক, ওকে ঘাড়ধাক্কা আর দেননি।”
”রাজুদা, তুমি আমার নাতনির বিয়েতে না আসতে পারো, কিন্তু সতু আর কালু অবশ্য—অবশ্যই যেন আসে। এই কার্ডে ঠিকানা লেখা আছে, তোমার বাড়ির কাছেই বাড়ি ভাড়া করে বিয়ে হবে।”
ইচ্ছাময়ী আধহাত লম্বা একবিঘত চওড়া একটা ঘাম এগিয়ে দিলেন। খাম থেকে রাজশেখর কার্ডটা বার করলেন—একটা কাগজের পালকি। কার্ডের ভাঁজ খুলে ভ্রূ কুঁচকে পড়ার চেষ্টা করে তাকালেন কলাবতীর দিকে। বুঝতে পেরে সে রাজশেখরের ঘরে গিয়ে চশমাটা নিয়ে এল।
”হ্যাঁ রে ইচ্ছে, ছেলের বাবার নামটা যেন চেনা—চেনা ঠেকছে—জ্ঞানেন্দ্র ঘোষ প্রাক্তন ডি আই জি। আই সি এস প্রেমেন ঘোষের ভাই না?”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি চেনো নাকি?”
”সার বলেন ঘোষের ছেলে ওরা। প্রেমেন তাদের সঙ্গে সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়ত। তখন ওদের ওল্ড বালিগঞ্জের বাড়িতে কয়েকবার গেছি। ভাল ঘরেই কুটুম্বিতে করছিস। পা—টা এই সময়ই বিগড়োল নইলে অবশ্য যেতুম, কত বছর প্রেমেনকে যে দেখিনি। নাতনির বিয়ে দিতে সেই লখনউ থেকে এসে উঠেছিস কোথায়?”
”গড়পাড়ে আমার ভাসুরের বাড়িতে। ছেলের বাড়ি থেকে বলল লখনউ গিয়ে বিয়ে দিতে পারব না, আপনারাই মেয়ে নিয়ে কলকাতায় আসুন। কলকাতার কিছুই তো জানি না, যা কিছু করাকম্মো সব ভাসুরপোরাই করে দিচ্ছে। এ বিয়েবাড়ি ভাড়া করা যে কী ঝকমারি তা কি আগে জানতুম! ছ’মাস আগে বুক না করলে নাকি পাওয়া যায় না। ভাসুরপো—র চেনা ছিল তাই ধরাধরি করে একটা বাড়ি পাওয়া গেছে। এই তোমাদের কাঁকুড়গাছির কাছেই। আজ তা হলে আমি উঠি, গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি, এখনও দশ—বারো জায়গায় যেতে হবে নেমন্তন্ন করতে।”
