সুগ্রীব (লক্ষ্মণের নাড়ি টিপে বুকে কান পেতে)।।সুমিত্রানন্দন মনে হচ্ছে এখনও পুরো পটল তোলেননি, কলজেটা ধুকধুক করছে। হনুমান, দৌড়ে ডাক্তার ডেকে আন।
হনুমান।।এত রাত্তিরে ডাক্তার আসবে ভেবেছেন? তিন কাঁদি কলা দিলেও আসবে না। তাতে রুগি মরে তো মরুক।
সুগ্রীব।।কোবরেজমশাই সুষেণ গেলেন কোথা? (দেখতে পেয়ে) এই যে কোবরেজ, দেখুন তো লক্ষ্মণকে বাঁচিয়ে তোলা যায় কি না।
সুষেণ (লক্ষ্মণের পেট টিপে, চোখের পাতা টেনে, চুল ধরে নাড়া দিয়ে, হাতের আঙুল মটকে, নাকের তলায় হাত রেখে)।।
প্রভু না হও কাতর।
বাঁচিবেন অবশ্য লক্ষ্মণ ধনুর্ধর।।
হস্ত—পদে রক্ত আছে প্রসন্নবদন।
নাসিকায় শ্বাস বহে প্রফুল্ল লোচন।।
হেনজনে নাহি মরে সবাকার জ্ঞানে।
আনিবারে ঔষধ পাঠাও হনুমানে।।
রাম।।এখন আমার মাথার ঠিক নেই, আপনিই বলে দিন কোথা থেকে কী ওষুধপত্তর আনতে হবে। অ্যাই হনুমান, কোবরেজমশাই যা আনতে বলবেন, নিয়ে এসো।
সুষেণ।।
শুন পবনন্দন।
ঔষধ আনিতে যাহ হে গন্ধমাদন।।
গিরি গন্ধমাদন সে সর্বলোকে জানি।
তাহাতে ঔষধ আছে বিশল্যকরণী।।
হনুমান।।কোবরেজি ওষুধ মানে গাছপালা, শেকড়বাকড়। ওসব চেনা আমার কম্মো নয়। অ্যালোপ্যাথি হলে সোজা টাবলেট ক্যাপসুল কেনো আর খাও, নয়তো প্যাঁট করে ইঞ্জেকশন ফোটাও।
জাম্বুবান।।কোবরেজমশাই, এ মুখ্যুটাকে বরং ফর্দ করে লিখে দিন নয়তো সব গুবলেট করে ফেলবে।
সুষেণ।।তাই লিখে দিচ্ছি। চটাপট জলদি যাবি আর আসবি। রাত্রি মধ্যে ঔষধ বাঁচাব সহজে। রজনী প্রভাতে প্রাণ যাবে সূর্যতেজে। আয় আমার সঙ্গে, ব্যবস্থা লেখার প্যাডটা বাড়িতে রয়ে গেছে।
(সুষেণ ও হনুমানের প্রস্থান।)
(স্টেজের আলো ক্ষীণ হতে—হতে অন্ধকার।) উইংয়ের বাইরে দ্রুত তৎপরতা। ব্রততী হাতঘড়ি তুলে কলাবতীকে দেখিয়ে বলল, ‘আর পাঁচ মিনিট এক ঘণ্টা হতে। নাইলনের দড়িতে দাঁড়িপাল্লার মতো ঝুলছে একটা পিঁড়ে। তার উপর তোলার চেষ্টা চলছে হনুমানকে। ধূপছায়া ও জয়দেব কোনওক্রমে পাঁজাকোলা করে রুকমিনিকে তুলে পিঁড়িতে বসাল। হাতে তুলে দিল ছোট্ট একটি ধামা। সেটা লাউডগা, কলমি আর পুঁইশাক, নিমপাতা ও কচুপাতায় ভরা। মজা পেয়ে মিটমিট করে হাসছে রুকমিনি।
কলাবতী ধমক দিয়ে বলল, ”হাসবি না একদম। ধামাটা এইভাবে মাথায় ধরে স্টেজে নামবি। নেমে বলবি ‘অন্ধকারে আপনার প্রেসক্রিপশনটা পড়তে পারিনি। হাতের লেখাটাও বিচ্ছিরি। গন্ধমাদনের মাথাটাই ভেঙে নিয়ে চলে এলুম। এবার যা খোঁজার খুঁজে নিন।’ পারবি বলতে?”
হনুমান মাথা হেলিয়ে দিল। জয়দেব দড়ি ধরল টানার জন্য। টর্চটা হাতে নিয়ে চাপাস্বরে কলাবতী বলল, ”গো হনু।”
মঞ্চ অন্ধকার। রোমাঞ্চিত হয়ে দর্শকরা টর্চের আলোয় দেখল ধামা মাথায় হনুমান। ধামা থেকে উপচে বিশল্যকরণীর নানান পাতা। ঝুলতে—ঝুলতে হনুমান অন্য প্রান্তের উইংয়ের দিকে মন্থর গতিতে এগোচ্ছে। স্টেজের উপরদিক থেকে ঝোলানো কালো কাপড় এবং অন্ধকার থাকায় হনুমান ঝুলছে যে তার থেকে, সেটি দেখা যাচ্ছে না। উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে টর্চের রশ্মিতে শুধু হনুমান। হাততালিতে ফেটে পড়ল মণ্ডপ। রুকমিনির মা অরুণা দাঁড়িয়ে উঠে দু’হাত তুলে ঝাঁকাতে লাগল। একদল মেয়ে চিৎকার করে উঠল ‘জয় হনুমানজি কি জয়।’ ‘বলো বজরংবলীজি জিন্দাবাদ।’
হনুমান পুলকে একহাতে ধামাটা ধরে অন্য হাতটা তুলে সামান্য নাড়ল দর্শকদের উদ্দেশ্যে। পিঁড়িটা একটু নড়ে উঠল। দড়ির কোথাও রোলারটা আটকে গেছে, জয়দেব টানাটানি করতেই হনুমান দুলে উঠল। অবশেষে জয়দেব মরিয়া হয়ে দড়িতে একটা হ্যাঁচকা দিল। হনুমান—বসা পিঁড়িটা কাত হতে যেতেই রুকমিনি লাফ দিয়ে পড়ল অন্ধকার স্টেজে।
মড়াৎ একটা শব্দ। টর্চের রশ্মি হনুমানকে অনুসরণ করে যাচ্ছিল। দেখা গেল, হনুমান ধামা—মাথায় একটা গর্ত দিয়ে স্টেজের তলায় চলে যাচ্ছে। কলাবতীর মুখ দিয়ে বেরোল শুধু একটি শব্দ, ”সর্বনাশ।”
জয়দেবের মুখ ফ্যাকাশে। কোনওক্রমে বলল, ”কাঠটা পচে গেছল। তার উপর এত লাফালাফি!”
কলাবতী দৌড়ে স্টেজের পিছন দিয়ে অপর প্রান্তের উইংয়ের সিঁড়ির কাছে উবু হয়ে ফিসফিস করে ডাকল, ”রুক, অ্যাই রুক।”
”এই যে আমি।” স্টেজের অন্ধকার তলা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল হনুমান, ”আমার ল্যাজটা দুমড়ে নীচের দিকে নেমে গেছে। আমি এখন লোকের সামনে যাই কী করে?”
”যেতে হবে না। ধামাটা গর্ত দিয়ে স্টেজে তুলে কোবরেজ মশাইকে ডাক।”
স্টেজের আলো জ্বলে উঠেছে। দর্শকরা দেখল, স্টেজ ফুঁড়ে ধামা ভরা লতাপাতা উঠল, তার নীচে হনুমানের মুণ্ডু।
হনুমান।।ও কোবরেজমশাই, শুনুন। আপনার জিনিসগুলো খুঁজে পেতে নিন এর মধ্যি থেকে।
(স্টেজে চিত হয়ে শুয়ে লক্ষ্মণ। তাকে ঘিরে সাত—আটজন। সেখান থেকে সুষেণ ছুটে এল। ধামাটা তুলে পাতা ঘেঁটে দেখল।)
সুষেণ। (উল্লসিত কণ্ঠে)।।যা—যা চেয়েছি সব আছে এতে। আর ভয় নেই, লক্ষ্মণ বেঁচে গেল।
তখন আরতির হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ব্রততী ভোকাট্টা করার মতো পরদার দড়ি টানতে টানতে বলল, ”তিন মিনিট পর্যন্ত গ্রেস দিয়েছি, আর নয়।”
প্রচণ্ড কোলাহলের এবং হাততালির মধ্যে শেষ হল নাটক। কুশীলবদের দেখার জন্য দর্শকরা দাবি জানাল। পরদা সরে যেতে দেখা গেল মঞ্চে কলাবতীর দু’ধারে মেয়েরা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু হনুমান নেই।
