লক্ষ্মণ।।ওসব বড়—বড় প্রথার কথা রাখ। আজ তোকে বাগে পেয়েছি, আর ছাড়াছাড়ি নয়। তোকে শেষ করে এখান থেকে যাব (ছুরি তুলে এগিয়ে এল)। মেঘনাদ লাফ দিয়ে উঠে লক্ষ্মণের হাতে লাথি মারতেই ছুরি পড়ে গেল। বিভীষণ কুড়িয়ে নিয়ে তুলে দিল লক্ষ্মণের হাতে। মেঘনাদ ছুটে স্টেজ থেকে বেরিয়ে যেতে—যেতে বলল, ”দাঁড়া, অস্ত্র আনি, তারপর দেখি তুই কত বড় বীর।” লক্ষ্মণ দ্রুত ছুরি মারল প্রস্থানরত মেঘনাদের পিঠে।
মেঘনাদ (আর্তস্বরে)।।বীর কুলগ্লানি, সুমিত্রানন্দন তুই! শত ধিক তোরে। রাবণনন্দন আমি, না ডরি শমনে। কিন্তু তোর অস্ত্রাঘাতে মরিনু যে আজি, পামর, এ চির দুঃখ রহিল রে মনে। বাবা, বাবা, তুমি এর বদলা নিয়ো। (টলতে—টলতে বেরিয়ে গেল, তাকে অনুসরণ করল বিভীষণ ও লক্ষ্মণ)
(স্টেজ অন্ধকার। খাকি হাফপ্যান্ট, হাফশার্ট ও মোজা পরা উদভ্রান্ত রাবণ। মাথায় হেলমেট, তাতে গোল করে সাঁটা নয়টি মুখ। দ্রতু অস্থির পায়চারি। ধুতি—পাঞ্জাবি পরা দূত তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে।)
রাবণ।।কহ দূত! কে বধিল চির রণজয়ী ইন্দ্রজিতে আজি রণে? কহ শীঘ্র করি।
দূত।।ইঁদুরের মতো নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ঢুকে সৌমিত্রি কেশরী অন্যায় যুদ্ধে বধ করেছে। বীরশ্রেষ্ঠ রাবণ, এখন শোক ভুলে যে আপনার ছেলেকে মেরেছে তাকে সংহার করুন।
রাবণ (চিৎকার করে)।।এ কনকপুরে, ধনুর্বর আছে যত সাজ শীঘ্র করি চতুরঙ্গে! রণরঙ্গে ভুলিব এ জ্বালা। এ বিষম জ্বালা যদি পারি রে ভুলিতে। (দূতসহ প্রস্থান। সঙ্গে—সঙ্গে বেজে উঠল বিউগল, ড্রাম, ঢোল, ঝাঁঝর এবং কোলাহল, হুঙ্কার। সপার্ষদ সুগ্রীবসহ রাম ও লক্ষ্মণের প্রবেশ।)
রাম (সভয়ে)।।সুগ্রীব, মনে হচ্ছে প্রলয় উপস্থিত, মাটি যেন কাঁপছে, টাইফুন যেন ধেয়ে আসছে। আমার ভীষণ ভয় করছে। রাখ গো রাঘবে আজি এ ঘোর বিপদে। (সুগ্রীবকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল) স্ববন্ধুবান্ধবহীন বনবাসী আমি ভাগ্যদোষে; তোমরা হে রামের ভরসা। কুল, মান, প্রাণ মোর রাখ হে উদ্ধারি, রঘুবন্ধু, স্নেহপণে কিনিয়াছ রামে তোমরা।
সুগ্রীব।।কিচ্ছু ভয় পাবেন না। দয়া করে কাঁদবেন না। এখন কান্নাকাটি করার সময় নয়। লক্ষ্মণ যে কেন ওইভাবে মেঘনাদকে খুন করল। এখন ঠেলা বুঝুন। রাবণ এখন ক্ষ্যাপা ষাঁড়, আমাদের গুঁতিয়ে শেষ করে দেবে, ওর টার্গেট এখন লক্ষ্মণ।
জাম্বুবান।।আমি বলি কী, লক্ষ্মণ এখন লুকিয়ে পড়ুক। আমি ওকে আমার পুকুরপাড়ের কচুবনে নিয়ে যাই। রাবণ খুঁজে পাবে না, আসুন লক্ষ্মণ। (লক্ষ্মণকে নিয়ে প্রস্থান।)
অঙ্গদ।।লক্ষ্মণ কি সাঁতার জানে? পুকুরপাড়টা ঢালু আর মাটিটা পিছল, গড়িয়ে পড়লে একেবারে জলে। ওকে বারণ করে আসি, ঢালের দিকে যেন না যায় (ছুটে প্রস্থান)।
(ট্রাইসাইকেল চেপে রাবণের প্রবেশ। গলায় দড়ি দিয়ে একটা লোহার নল, পিঠে বন্দুকের মতো আড়াআড়ি ঝোলানো। নলের মাথায় ঢোকানো একটা টর্চ। রাবণের কোমরে ঝুলছে চ্যালাকাঠ। ভিতরে হাঁড়ি চাপা কালিপটকা ফাটার শব্দ।)
রাবণ।।কোথায়, কোথায় লক্ষ্মণ। আজ ব্যাটার ছাল ছাড়িয়ে রোস্ট করে খাব। (হনুমানকে দেখে) এই হনু (কোমর থেকে চ্যালাকাঠ খুলে হনুমানের পিছনে দু’ ঘা কষিয়ে) ভাগ ভাগ। (গলা ধাক্কা, হনুমান পড়ে গেল এবং হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে গেল।)
সুগ্রীব (হাতজোড় করে)।।আমার হাঁটুতে বাত, দৌড়তে পারব না। আস্তে হেঁটে যাচ্ছি (খোঁড়াতে—খোঁড়াতে প্রস্থান)।
রাবণ।।এই যে রামচন্দর, দেবতাদের পুষ্যিপুত্তুর, পাবলিসিটি পেয়ে—পেয়ে মহাবীর হয়েছ। না চাহি তোমারে হে বৈদেহীনাথ। এ ভবমণ্ডলে আর একদিন তুমি জীব নিরাপদে। কোথা সে অনুজ তব কপটসমরী পামর?
রাম (কম্পিত কণ্ঠে)।।লক্ষ্মণ পুকুরপাড়ে কচুবনে। যদি বলো তো ডেকে আনছি।
রাবণ।।এক মিনিট সময় দিচ্ছি, ডেকে আনো।
(রামের দৌড়ে প্রস্থান।)
(রাবণ পিঠ থেকে নলটি খুলে পরীক্ষা করে সাইকেলে ঠেস দিয়ে রাখল। পায়চারি শুরু করল। উইংয়ের কাছে লক্ষ্মণকে দেখা গেল।)
রাবণ।।এতক্ষণে রে লক্ষ্মণ। এ রণক্ষেত্রে নরাধম তোকে পেলুম। কুক্ষণে সাগর পার হলি, পশিলি রাক্ষসালয়ে চোরবেশ ধরি, চুরি করলি জগতের অমূল্য রাক্ষসরত্ন।
লক্ষ্মণ।।আমি ক্ষত্রিয়ের ছেলে, রাক্ষসকে ভয় পাই না, এটা জেনে রেখো।
রাবণ।।বটে। তোর লম্বা চওড়া কথা বলা এবার ঘুচোচ্ছি।
(স্টেজের আলো বিদ্যুৎ চমকের মতো দপদপ করতে থাকল। দেখা গেল পিঠের নলটা রকেট লঞ্চারের মতো রাবণ কাঁধে রাখল।)
রাবণ।।লক্ষ্মণ, আজি নাহি রক্ষা মোর হাতে।
(নলের মাথায় ঢোকানো টর্চের বোতাম টিপল, তীব্র আলো অন্ধকার মঞ্চ ভেদ করে লক্ষ্মণের বুকে পড়ল। এবার চকলেট বোমা ফাটার শব্দ। ঝাঁঝর, ঢোল, ড্রাম বেজে উঠল। আর্তনাদ করে লক্ষ্মণ মঞ্চের উপর পড়ে গেল। অট্টহাসি হেসে রাবণ ঝুঁকে লক্ষ্মণকে দেখে সাইকেলে উঠে উইং দিয়ে বেরিয়ে গেল। আলো জ্বলে উঠল। ছুটতে—ছুটতে মঞ্চে এল রাম, সুগ্রীব, বিভীষণ এবং অন্যান্যরা। লক্ষ্মণের বুকে আছড়ে পড়ল রাম।)
রাম।।ভাই রে লক্ষ্মণ (হাউহাউ করে কেঁদে)। আজি এ রক্ষঃপুরে অরি মাঝে আমি বিপদসলিলে মগ্ন। রাখিবে আজি কে, কহ, আমারে? কার কাছে আমাকে রেখে গেলি ভাই, এইসব ভিতু কলা—খাওয়া বানরগুলোর হাতে? (কপাল চাপড়াতে লাগল।)
