নল।।পন্টুন ব্রিজ? চারদিন সময় দিন, এমন জবরদস্ত সেতু বানিয়ে দেব অন্তত একমাস টিকবে। ততদিনে যুদ্ধটা শেষ হয়ে সীতাদেবীকে ওই সেতুর উপর দিয়েই ফিরিয়ে আনবেন রঘুনন্দনজি। (নলের প্রস্থান। প্রবেশ করল বিভীষণ)
বিভীষণ।।এখানে রামচন্দ্র কে আছেন?
রাম।।আমি। আপনি কে? কী দরকার?
বিভীষণ।।আমি লঙ্কেশপতি দশাননের ছোট ভাই বিভীষণ। আপনার শ্রীচরণে আশ্রয় নিতে এসেছি। দাদা লাথি মেরে আমাকে একটা নৌকোয় তুলে দেয়, ভাসতে—ভাসতে এসে পড়লুম। আমাকে দয়া করুন রাঘব। সীতা উদ্ধারে আমি আপনাকে লঙ্কার সব সুলুকসন্ধান দোব।
লক্ষ্মণ।।এ তো দেখছি ঘরশত্রু। দাদা, একে দরকার হবে। রেখে দাও। তা বাপু বিভীষণ, রাবণ তোমায় লাথি মারল কেন?
বিভীষণ।।দাদা তোলা আদায়ের জন্য কুম্ভকর্ণকে কিষ্কিন্ধ্যায় পাঠাতে চাইল। আমি বললুম, ‘এটা অধর্ম, অন্যায় কাজ হবে।’ দাদা চটে গিয়ে লাথি মেরে বলল, ‘তুই ধার্মিকদের সঙ্গে গিয়ে থাক, লঙ্কায় তোর স্থান হবে না।’
(এক বানর সেনা বিভীষণের কোঁচা খুলে পকেট হাতড়ে সার্চ করা শুরু করল। পকেট থেকে বেরোল একটা পুরিয়া। সেনাটি পুরিয়া খুলে শুঁকে সেটা সুগ্রীবের হাতে দিল।)
সুগ্রীব।।এটা কী বিভীষণ? মনে হচ্ছে নারকোটিকস। তুমি কি এইসব নেশার জিনিস শোঁকো? খাও?
(মাথায় ছোট—ছোট কাগজের নৌকো নিয়ে সার দিয়ে বানররা স্টেজের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। স্টেজের পিছন দিক দিয়ে ঘুরে এসে আবার স্টেজে ঢুকল।)
জাম্বুবান।।চোরা চালানদার হতে পারে। আমাদের সুকুমারমতি ছেলেদের নেশা ধরাতে হয়তো রাবণই এই ব্যাটাকে পাঠিয়েছে। একে জেলে রাখা উচিত।
রাম।।সুগ্রীব, বিভীষণ জেলে নয়, আমার সঙ্গে থাকবে। এইরকম লোকই আমার দরকার।
(নলের প্রবেশ।)
নল।।কাজ কমপ্লিক্ট। এবার সৈন্য—টৈন্য নিয়ে লঙ্কায় চলুন।
রাম (অবাক হয়ে)।।সে কী! এর মধ্যে হয়ে গেল সেতু?
নল (আরও অবাক হয়ে)।।এতে অবাক হওয়ার কী আছে? জরুরি ভিত্তিতে কাজ না? কাঠগুলো অবশ্য কাঁচা, বেশ নরম, একটু পা টিপে—টিপে যেতে হবে। খাওয়া—দাওয়াটা এবার সেরে ফেলুন, তারপর একটা দিবানিদ্রা দিয়ে ঝরঝরে হয়ে লঙ্কা জয় করতে বেরিয়ে পড়া যাবে।
(সকলের প্রস্থান। কুম্ভকর্ণ এবং ঘটোৎকচের প্রবেশ।)
কুম্ভকর্ণ।।ঘটোৎ, কী হল, ল্যাংড়াচ্ছ কেন?
ঘটোৎকচ।।আর বোলো না কুম্ভ। হাজার—হাজার মরিয়া বেকার ছেলে এমন হুড়োহুড়ি শুরু করল যে, জাম্বুবানের পুলিশ লাইন সামলাতে লাঠি চালাল, লাইন ছত্রভঙ্গ। পায়ে লাঠি, পিঠে লাঠি, এই দ্যাখো না (জামা তুলে পিঠ দেখাল)। লাইন থেকে সেই যে ছিটকে গেলুম আর ঢুকতে পারলুম না। এখন ভাবছি মায়ের কাছে জঙ্গলে চলে যাব। সেখানে হাতিটা, গণ্ডারটা তো খেতে পাব। তুমি এখন কী করবে?
কুম্ভকর্ণ।।আমিও দেশে ফিরে যাব। শুনলুম আমার ছোট ভাইটা এখানে এসে রামের সঙ্গে ভিড়েছে, নিশ্চয়ই আমার খবর এতক্ষণে রামকে দিয়েছে। ধরার জন্য পুলিশ নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। দ্যাখো বাপু, জেল খাটা আমার পোষাবে না। শুনেছি ওখানে শান্তিতে ঘুমোনো যায় না। আমি বরং সুগ্রীবের সৈন্যদের সঙ্গে ভিড়ে সেতু দিয়ে কুচকাওয়াজ করে লঙ্কায় ফিরে যাই।
(নেপথ্যে ড্রামের ও বিউগলের আওয়াজ। মার্চ করে জনাদশেক বানরসেনা ঢুকে ‘জয় জয় শ্রীরাম’ বলতে—বলতে অপরপ্রান্তের উইংয়ের দিকে এগোল। কুম্ভকর্ণ শেষ সেনাটির পিছনে টুক করে ভিড়ে গেল।)
ঘটোৎকচ।।তা হলে আর আমিই বা এখানে থেকে কী করব। যাই। (প্রস্থান।)
স্টেজের আলো কমে গেল। বিপরীত দিক থেকে পূজারীর বেশে মেঘনাদের প্রবেশ। স্টেজের মাঝখানে পূজা দেওয়ার ভঙ্গিতে বসে জোড়হাতে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চচারণ করতে লাগল। চুপিসাড়ে বিভীষণ ঢুকে হাতছানি দিয়ে লক্ষ্মণকে ডাকল। জিনসের ট্রাউজার্স আর জ্যাকেট, মাথায় সবুজ কাউন্টি ক্যাপ পরা লক্ষ্মণ গুঁড়ি মেরে ঢুকল। উইংয়ের আড়ালে সরে গেল বিভীষণ।
মেঘনাদ (চমকে উঠে)।।কে, কে ঢুকল এই নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে? ওহ বিভাবসু, আপনি। কী সৌভাগ্য আমার। কিন্তু কী কারণে, কহ তেজস্বী আইলা রক্ষঃকুলরিপু নর লক্ষ্মণের রূপে প্রসাদিতে এ অধীনে?
লক্ষ্মণ (দু’ পা ফাঁক করে কোমরে হাত রেখে)।।নহি বিভাবসু আমি দেখ নিরখিয়া (স্টেজের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল) রাবণি। লক্ষ্মণ নাম, জন্ম রঘুকুলে। সংহারিতে, বীরসিংহ তোমায় সংগ্রামে আগমন হেথা মম; দেহ রণ মোরে অবিলম্বে।
মেঘনাদ।।সত্যি যদি তুমি রামানুজ, তা হলে কোন কায়দায় এখানে ঢুকলে? চারিদিকে এত পাহারা, মাছি পর্যন্ত গলার সাধ্য নেই।
লক্ষ্মণ (কোমর থেকে পাউরুটি কাটার ছুরি বের করে)।।কী করে ঢুকলুম? বিভীষণ, কোথায় গেলে বিভীষণ (প্রবেশ করল বিভীষণ) এই যে। তোমার কাকাই আমাকে রাস্তা চিনিয়ে এনেছে।
মেঘনাদ (বিষাদভরে)।।এতক্ষণে জানলুম কী করে লক্ষ্মণ ঢুকল রক্ষঃপুরে। হায় কাকা, কাজটা কি উচিত হয়েছে? তোমার মা—দাদা—ভাইপো কারা, সেটা কি ভুলে গেলে? নিজের বাড়ির রাস্তা চোরকে দেখালে, ছোটলোককে রাজবাড়িতে আনলে?
বিভীষণ।।কী করব বল, আমি রাঘবের চাকর। তার বিপক্ষে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
মেঘনাদ।।কাকা, তোমার কথা শুনে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে আনিলে একথা। স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থানুর ললাটে, পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি ধুলায়? কোন মহাকুলে তোমার জন্ম, সেটা কি ভুলে গেছ? এই লক্ষ্মণটা কী নীচ দ্যাখো, আমার কাছে অস্ত্র নেই, আর বলছে কিনা যুদ্ধ করো। এটা কি মহারথিপ্রথা?
