১ম বানর।।সাগরটা কত চওড়া রাজামশাই?
সুগ্রীব।।একশো যোজন।
২য় বানর।।ওরে বাববা। অতটা কী করে লাফাব। পঞ্চাশ যোজন হলে চেষ্টা করতে পারি।
৩য় বানর।।সত্তর—টত্তর হলে নয় লাফানো যায়।
৪র্থ বানর।।সাগরের মাঝামাঝি যদি পাহাড়—টাহাড় গোছের কিছু থাকত তা হলে তার উপর প্রথম লাফ দিয়ে পড়ে আর এক লাফে লঙ্কায় পৌঁছনো যায়।
জাম্বুবান।।হনুমান চুপ কেন? মহাবীর তুমি। (পাঁচালির সুরে)
জানিয়া সীতার বার্তা আইস হনুমান।
চিন্তিত রামেরে সব করো পরিত্রাণ।।
পৌরুষ প্রকাশ করো সাগর লঙ্ঘিয়া।
শ্রীরামেরে তুষ্ট করো সীতা উদ্ধারিয়া।।
হনুমান।।মন্ত্রীমশাই, সুড়সুড়ি দিয়ে কার্য উদ্ধার হয় না। আগে বলুন মালকড়ি কী ছাড়বেন?
জাম্বুবান।।একশোটা মর্তমান কলা।
হনুমান।।ঠিক—ঠিক দেবেন তো? মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি তো, না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
জাম্বুবান।।হ্যাঁ রে বাবা, দোব।
(হনুমান বৈঠক দিয়ে হাত—পা ছুড়ে ওয়ার্ম আপ শুরু করল। ছোট—ছোট লাফ দিয়ে স্টেজের উপর ঘুরল। সেই সঙ্গে পাঁচালির সুরে বলতে লাগল,
সাগর যোজন শত দেখি খালিজুলি।
শতবার পার হই আমি মহাবলী।।
উড়িয়া পড়িব গিয়া স্বর্ণ লঙ্কাপুরী।
শত্রু মারি উদ্ধারিব রামের সুন্দরী।।
চূড়ান্ত লাফ দেওয়ার আগে দৌড়বার জন্য হনুমান স্টেজের একপ্রান্তে কুঁজো হয়ে প্রস্তুত হল।
রাম।।হনু, একবারটি শোনো। (হনুমান কাছে এল। রাম কাঁধের থলি থেকে মালার মতো গাঁথা পানপরাগের পাউচ বের করে তার হাতে দিল) সীতাকে দিয়ো। রোজ ভাত খেয়ে একটা না খেলে অম্বল হয় ওর।
(পাউচগুলো বারমুডার পকেটে রেখে হনুমান আবার প্রস্তুতি নিল। কুঁজো হয়ে সামনে—পিছনে কয়েকবার দুলে হনুমান চিৎকার করে ‘জয় শ্রীরামজি’ বলেই দুড়দাড় বেগে স্টেজ কাঁপিয়ে ছুটে গিয়ে খড়ির দাগ টানা জায়গায় পৌঁছেই দু’হাত তুলে ঝাঁপ দিল। উইংয়ের বাইরে জমির উপর একটা চাদর টানটান করে জালের মতো ধরে দাঁড়িয়ে ছিল জয়দেব ও কলাবতী। হালকাভাবেই হনুমান পড়ল তাকিয়াগুলোর উপর।
কলাবতী উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ”রুকু, লাগেনি তো?”
হাততালিতে তখন ফেটে পড়ছে মণ্ডপ। মেয়েরা ওঠবোস করছে চেয়ারে। গলা ছেড়ে ‘রুকু, রুকু’ বলে চেঁচাচ্ছে। তারই মধ্যে রাজশেখর মলয়াকে বললেন, ”কালু লিখেছে কেমন বলো? অবশ্য সতু ব্রাশআপ করে কিছুটা ঝালাই করে দিয়েছে। প্রত্যেকটি মেয়ে কিন্তু দারুণ অভিনয় করছে।”
”ও যে এইরকম ভাবতে পারে ধারণায় ছিল না। ওর গোটা টিমটাকে একদিন নেমন্তন্ন করে খাওয়াব।” মলয়া কথাটা বলে এধার—ওধার তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজল, তারপর বলল, ”উদ্বোধনের দিন যদি আসতেন, বেলুন ওড়ানো দেখলে আপনার ভাল লাগত।”
(ইতোমধ্যে মঞ্চে আবার আলো জ্বলে উঠেছে। বানররা চোখের উপর কর রেখে বহু দূরে আকাশে মিলিয়ে যাওয়া হনুমানকে দেখছিল।)
১ম বানর।।এতক্ষণে বোধহয় পৌঁছে গেছে। যা একখানা লম্ফ দিল।
পাটাতনে খড়ির দাগ যেখানে কাটা, হনুমান সেখানে পায়ে ধাক্কা দেওয়ায় পেরেক খুলে গিয়ে পাটাতনটা ঝুলে পড়ে। অন্ধকার থাকায় সেটা কারও নজরে পড়েনি।
সুগ্রীব।।জাম্বুবান, আমাদের চিফ ইঞ্জিনিয়ারটা কে যেন, তাকে ডাকো তো।
জাম্বুবান।।বিশ্বকর্মার ছেলে নল। দারুণ রাস্তাঘাট, বাঁধ বানায়। এক—একদিনে কুড়ি—পঁচিশ যোজন পাকা রাস্তা তৈরি করে ফেলে, এগারো—বারো দিন পর্যন্ত টিকে থাকে!
সুগ্রীব।।বটে বটে, এ তো দারুণ ইঞ্জিনিয়ার। এগারো—বারো দিন, বলো কী? আমি তো জানতুম সাড়ে সাতদিনের বেশি আমাদের রাস্তা টেঁকে না। নলকে ডাকো, ওকেই সেতুবন্ধনের বরাতটা দেওয়া যাক।
জাম্বুবান।।রাজামশাই, আমাদের নিয়ম বড় কাজ টেন্ডার ডেকে দেওয়ার।
সুগ্রীব।।আরে রাখো তোমার নিয়ম। দেখছ না রামচন্দ্রজির কী অবস্থা। আর সাতদিনও টেকেন কিনা বলা যায় না। জরুরি ভিত্তিতে আমাদের কাজ করতে হবে। টেন্ডার—ফেন্ডার কাজ শেষ হলে ডেকো, তখন যা পাস—টাস করার করে দেব। যাও, জলদি যাও। (জাম্বুবানের দ্রুত প্রস্থান)। রামচন্দ্রজি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। হাজার—হাজার বেকার বানর ছেলে সৈনিক হওয়ার জন্য গ্রাম থেকে ছুটে এসে সত্তর ঘণ্টা আগে লাইন দিয়েছে খবর পেলুম। সেতুটা করে ফেলছি, আর দু’টো দিন সময় দিন, কাজ শুরু করে দেব। তারপর সেতুর উপর দিয়ে হাজার—হাজার বানর সেনা গিয়ে দেখবেন কী লঙ্কাকাণ্ড তখন বাধিয়ে দেবে।
(জাম্বুবানের প্রবেশ। সঙ্গে নল, তার বগলে একটা ফাইল)
জাম্বুবান।।ধরে এনেছি রাজামশাই। সহজে কী আসতে চায়, ঠিকেদারদের সঙ্গে বৈঠক করছিল।
সুগ্রীব।।কীসের বৈঠক?
নল।।আজ্ঞে, গঙ্গোত্রীতে বন্যা। গ্রামকে গ্রাম জলে তলিয়ে যাচ্ছে। বোল্ডার ফেলতে হবে। ঠিকাদাররা যে রেট দিচ্ছে, তা মানা যায় না। তাই নিয়েই বৈঠক।
সুগ্রীব।।কী ঠিক হল?
নল।।মেনে নিলুম। লোকে কাজ হচ্ছে দেখতে চায়। দেখাবার একটা ব্যবস্থা তো হল।
সুগ্রীব।।খুব বুদ্ধিমান তো তুমি। তা এবার বুদ্ধি করে সেতুটা চটপট বেঁধে দাও।
নল।।কীরকম সেতু চাইছেন। (ফাইল খুলে সুগ্রীবকে দেখাতে লাগল) এটা হল সাসপেনশন ব্রিজ আর এটা হল ক্যান্টিলিভার…”
সুগ্রীব।।তোমার পেনশন—টেনশন, লিভার—ফিভার ছাড়ো। বেশি সময় দিতে পারব না, স্রেফ পরপর নৌকো সাজিয়ে তার উপর তক্তা পেতে দাও।
