বলতে বলতে যুবকটি কয়েক পা গিয়েই শুয়ে থাকা লোকটির পায়ে ঠোক্কর খেল। ভয়ে চমকে উঠে ”উরি বাবা, ভূউউত নাকি গো।” বলে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর নিচু হয়ে খুঁটিয়ে দেখে বুঝল মানুষ। প্রচণ্ড রেগে ঘুমন্ত লোকটিকে লাথি মেরে সে বলল, ”এই ব্যাটা ওঠ, সন্ধেবেলায় রাস্তার মধ্যিখানে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছিস, আক্কেল—সাক্কেল নেই?”
লোকটি (উঠে বসে)।।মতো কেন, আমি তো কুম্ভকর্ণই!
যুবক।।কোন কুম্ভকর্ণ, রাবণের ভাই?
কুম্ভকর্ণ।।হ্যাঁ, বিভীষণের মেজদা, মেঘনাদের মেজকাকা।
যুবক।।তোমার বাড়ি তো লঙ্কায়। এটা তো কিষ্কিন্ধ্যা, মাঝে সমুদ্দুর। এলে কী করে?
কুম্ভকর্ণ।।ইচ্ছে করে কি আর এসেছি! দাদা বলল, তোর রাক্ষুসে খাওয়ার খরচ জোগাতে আমার ট্রেজারি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, কত আর নোট ছাপিয়ে সামাল দোব, এখনও তেত্রিশটি সোনার বাড়ি তৈরি করা বাকি। এই বলে দাদা পুষ্পক রথে চাপিয়ে আমাকে এখানে এনে নামিয়ে দিয়ে বলল, তোলা আদায় করে খা।
যুবক।।আদায় হয়েছে?
কুম্ভকর্ণ।।আরে দূর, আমার তেমন লোকবল, মানে সাগরেদ নেই, পিছনে পার্টিও নেই, কেউ আমায় ভয় পায় না। তবে চেনে না তো আমি কে, একদিন টপাটপ বানরগুলোকে ধরে—ধরে যখন মুখে ফেলব, তখন বুঝবে কুম্ভকর্ণ কী জিনিস। তা বাপু, তুমি কে?
যুবক।।আমি ঘটোৎকচ। তোমার ত্রেতার পরের দ্বাপর যুগের মানুষ, তোমার চেয়ে মডার্ন। ভীম আমার বাবা, হিড়িম্বা আমার মা, আমিও তোমার মতো রাক্ষস। (হাত বাড়িয়ে দিল, কুম্ভকর্ণ হাত ধরে ঝাঁকাল।)
কুম্ভকর্ণ।।রাক্ষস সব যুগেই আছে।
ঘটোৎকচ।।দেখবে কলিযুগেও থাকবে। কুম্ভ, আমি তো শুনেছি তোমার দাদা দুই যোজন লম্বা আর এক যোজন চওড়া একটা ঘর করে দিয়েছিল তোমার ঘুমোবার জন্য। অভিধানে বলেছে যোজন মানে চার ক্রোশ, এক ক্রোশ মানে আট হাজার হাত, দু’মাইলের বেশি। দু’যোজন মানে যা দাঁড়ায়, তোমার গতরটা তো দেখছি তেমন নয়।
কুম্ভকর্ণ।।আরে দূর, এই মহাকাব্যওলাদের কাজই তিলকে তাল করে দেখানো, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে না দেখালে ওদের পেটের ভাত হজম হয় না। তা বাপু ঘটোৎ, তুমি এই অবেলায় যাচ্ছিলে কোথা?
ঘটোৎকচ।।কাগজে বিজ্ঞাপন দ্যাখোনি, অত ঘুমোলে আর দেখবেই বা কী করে, সুগ্রীব সৈন্য রিক্রুট করবে, তোমার দাদার সঙ্গে যুদ্ধু করবে রাম আর চুক্তি অনুযায়ী সুগ্রীব রামকে সৈন্য সাপ্লাই দেবে, আজ রাত থেকেই লাইনে দাঁড়াতে হবে।
কুম্ভকর্ণ।।কেন মিছিমিছি বেঘোরে প্রাণটা দেবে ভাই। তার চেয়ে অন্য কোথাও চেষ্টা করো। তুমি পশ্চিমবঙ্গে চলে যাও না কেন, সেখানে রোজগারের এত পথ আছে যে, তুমি কোন পথটা নেবে ভাবতে—ভাবতে দিশাহারা হয়ে যাবে।
ঘটোৎকচ।।দু’—একটা পথ বাতলে দাও তো ভাই। লোকে হিড়িম্বা রাক্ষুসির ছেলে, জংলি, এই সব বলে এমন ঘেন্না করে যে, সহ্য করা যায় না।
কুম্ভকর্ণ।।তুমি পুকুর বোজানোর কাজ শুরু করো। ঠিকা নাও আর পুকুর ভরাট করো। কেউ কিচ্ছু তোমায় বলবে না, প্রোমোটার সব সামলে দেবে। আর প্রোমোটার যদি খুঁজে না পাও, তা হলে ডাক্তার হয়ে যাও। ডিগ্রি নেই? কিচ্ছু ভেব না, কতকগুলো ইংরিজি অক্ষর নামের পাশে সাইনবোর্ডে লাগিয়ে বসে যাও, কেউ টুঁ শব্দটি করবে না। চুটিয়ে ডাক্তারি করে যাও গ্রামে, এমনকী শহরেও। ডাক্তার হতে ইচ্ছে না করলে মাস্টার হয়ে যাও, স্কুলে যেতেও হবে না। তুমি দু’—একটা চেয়েছিলে, আমি এক্ষুনি তিনটে বলে দিলুম। একটু ভাবতে সময় পেলে গোটা পনেরো পথ বলে দিতে পারতুম।
(নেপথ্যে বিউগল ধ্বনি। কুম্ভকর্ণ ও ঘটোৎকচের সচকিত হয়ে স্থান ত্যাগ। সপার্ষদ রাম ও লক্ষ্মণের প্রবেশ।)
পারিষদদের মালকোঁচা করে পরা ধুতি। হাফ শার্ট। পিঠে কাগজে লালকলিতে লেখা ‘সুগ্রীব’, ‘অঙ্গদ’, ‘জাম্বুবান’ ইত্যাদি নাম পিন দিয়ে সাঁটা।
রাম (উবু হয়ে বসে ললাটে করাঘাত)।।সীতা সীতা! হায় সীতা! তুমি বেঁচে আছ কি মরে গেছ জানি না। কেউ যদি একবার খবর এনে দিত সীতা ঠিকমতো খাচ্ছে—ঘুমোচ্ছে কিনা, তা হলে আমি নিশ্চিন্ত হতুম। সুগ্রীব, সীতার খবর নিতে কাউকে পাঠাও না ভাই। এই সাগরটা লাফ দিয়ে পার হওয়া মানুষের কর্ম নয়, পারে শুধু বানরেরা।
সুগ্রীব।।আপনি কিচ্ছু ভাববেন না সীতাপতি। জানকী কোথায় আছেন সে খবর যখন পেয়ে গেছি আর ভাবনার কিছু নেই। আমি লোক পাঠাচ্ছি।
লক্ষ্মণ।।লোক?
সুগ্রীব।।সরি, বানর পাঠাচ্ছি। বাবা অঙ্গদ, তোমার সাঙ্গপাঙ্গদের ডাকো তো।
(অঙ্গদ উইংয়ের কাছে গিয়ে ভিতরদিকে মুখ করে হাঁক দিল, ‘এইই কারা আছিস দৌড়ে আয় রাজামশাই ডাকছেন।’ হনুমানসহ কয়েকজন বানর ছুটে স্টেজে ঢুকল হুমড়ি খেতে—খেতে।)
সুগ্রীব।।তোমাদের লম্ফঝম্পের কেরামতি এবার দেখাতে হবে। এই যে সাগর দেখছ (অপর প্রান্তের উইংয়ের দিকে হাত তুলে দেখাল), এই সাগর লাফিয়ে পার হয়ে লঙ্কায় যেতে হবে। সেখানে অশোকবনে সীতাজননী রয়েছেন। তাঁর খবর আনতে হবে। তিনি ঠিকমতো খাচ্ছেন—দাচ্ছেন কিনা, ঘুমটুম হচ্ছে কিনা, এগুলো জেনে আসবে আর এখানকার খবর, রামচন্দ্রর খবর দিয়ে বলবে তিনি ভীষণ কান্নাকাটি করছেন। আপনার অদর্শনে চান করেন না, চুল আঁচড়ান না, কিচ্ছুটি মুখে দেন না। আর বলবে আপনাকে উদ্ধারের জন্য কিষ্কিন্ধ্যার রাজা সুগ্রীব জোর কদমে কাজ শুরু করেছেন। সাগরের উপর একটা ব্রিজ বানাবার জন্য টেন্ডার ডাকা হবে আর সৈন্য রিক্রুটের কাজ এখুনি শুরু হবে।
