পরদার দড়ি হাতে দাঁড়িয়ে আরতি ঘটক। মলয়া ব্যস্ত হয়ে বলল, ”টানো, দড়ি টানো, পরদা টানো।”
আরতি দু’হাতে ঘুড়ির সুতো টানার মতো দড়ি টেনে স্টেজ পরদা দিয়ে আড়াল করে দিল। স্টেজে তখন মুখ লাল করে দাঁড়িয়ে বলরাম, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। মলয়া বলল, ”ব্রততীদি, পাবলিককে বেরিয়ে যেতে বলা উচিত হয়নি।”
বলরাম গর্জন করে উঠল, ”একশোবার উচিত হয়েছে।”
উইংয়ের পাশে দাঁড়ানো অসীমা মন্তব্য করল, ”জানি ঝামেলা একটা পাকাবেই।”
মাইকে মলয়া ঘোষণা করল, ”শারীরিক অসুস্থতার কারণে বলরামবাবু তাঁর বক্তব্য শেষ করতে পারলেন না, এজন্য আমরা দুঃখিত।” মণ্ডপে বুউউউ ধ্বনি উঠল। ”আমাদের পরবর্তী অনুষ্ঠান যোগব্যায়াম ও সঙ্গীতসহ গণব্যায়াম প্রদর্শন এখনই শুরু হবে। পরিচালনায় প্রখ্যাত গণসঙ্গীত গায়ক অরুণাচল সেনগুপ্ত এবং নেতাজি যোগব্যায়াম শিবির। যোগব্যায়ামে ও সঙ্গীতে অংশগ্রহণকারী সবাই আমাদের স্কুলেরই মেয়ে। আবহ সুর রচনায় যাঁরা বাজনা বাজাবেন তাঁরাও আমাদের স্কুলের। অনুগ্রহ করে আপনারা কয়েকমিনিট ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ধন্যবাদ।”
স্টেজ থেকে বেরিয়ে মলয়া এল কাপড় ঘিরে তৈরি সাজঘরে। তাকে দেখেই মেয়েরা কিচিরমিচির বন্ধ করে তটস্থ। ব্যায়ামের দশ বারোটি, বাজনার গুটিদশেক, নাটকের অন্তত পনেরোটি মেয়ে মিলে সাজঘরে পা ফেলার জায়গা নেই। সেই সঙ্গে বেহালা, কেটলড্রাম, সেতার, ঢোল, তবলা, গিটার, হাতে বাঁশি, বিউগল, ঝাঁঝর নিয়ে অপেক্ষমানদের পাশে মেকআপের বাক্স এবং বাচ্চচাদের একটা ট্রাইসাইকেল।
”সব রেডি?” মলয়া গলা তুলে বলল। ”অরুণাচলবাবু, শেফালি, পূর্বা, স্বাগতা, ধূপছায়া, কলাবতী তৈরি? মাইকম্যান, লাইটম্যানদের দেখুন জয়দেববাবু। তা হলে পরদা সরাতে বলি?” মলয়া আরতির দিকে তাকাতেই সে দড়ি টানতে শুরু করল।
পরদা সরে যেতেই বেজে উঠল ভৈরবী রাগ সেতারে ও বাঁশিতে। সুইমিং কস্টিউমের মতো পোশাক পরা ছয়টি মেয়ে প্রায় কুচকাওয়াজ করে স্টেজে এল কেটলড্রাম ও বিউগল ধ্বনি সহকারে। নেপথ্য থেকে প্রণতির (হাতে আসনের নাম লেখা ফর্দ) গলা ভেসে এল, ”এখন শুরু হচ্ছে যোগাসন প্রদর্শন। প্রথমে হলাসন।”
মেয়েরা একের পর এক হলাসন, ভুজঙ্গাসন, শশঙ্গাসন, মৎস্যাসন ইত্যাদি বারোটি আসন দেখাল। প্রতিটির শেষে পেল হাততালি। ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর ‘ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ নেপথ্য থেকে অরুণাচল—সহ তিনজন ছাত্রী গেয়ে উঠল। ছুটে স্টেজে ঢুকল জনাদশেক মেয়ে। স্টেজের এ প্রান্ত, ও প্রান্ত ছুটোছুটি করে তারা ভল্টের এমন কসরত দেখাতে শুরু করল যে, স্টেজের কাঠ মচমচ করে উঠল। সকালে রুকমিনি যেখান থেকে লাফ দিয়েছিল, সেখানকার তক্তাটি ফেটে গিয়ে কোনওরকমে জোড়া লেগে রইল।
‘ঊর্ধ্ব গগনের’ পর শুরু হল ‘উঠো গো ভারতলক্ষ্মী’। মেয়েরা শুরু করল একের কাঁধে আর একজন উঠে পিরামিড গড়া, মন্দির গড়া। বলা ছিল, যতক্ষণ গান চলবে ততক্ষণ তারা কাঁধে চড়ে থাকবে। কিন্তু অরুণাচলের গান আর শেষ হয় না। একবার শেষ হতেই আবার প্রথম থেকে শুরু করল। কাঁধে চড়া মেয়েরা টলমল করতে শুরু করল, যাদের কাঁধে উঠেছে তাদের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তখন দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল, ”মেয়েগুলো যে পড়ে যাবে। গানটা থামান।”
সঙ্গে—সঙ্গে দশ—পনেরোটি গলা চিৎকার শুরু করল, ”থামান, গান থামান।”
গান থামিয়ে গণসঙ্গীতগায়ক ভয়ে—ভয়ে জানতে চাইল, ”চেয়ারগুলো কীসের?”
”লোহার,” প্রণতি জানাল।
মেয়েরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দর্শকদের অভিবাদন জানাবার সঙ্গে সঙ্গে আরতি দড়ি টানল।
প্রচুর হাততালির মধ্যেই প্রণতির ঘোষণা ভেসে এল, ”আমাদের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীর সমাপ্তির অনুষ্ঠান একটি নাটিকা এবার অভিনীত হবে, ‘রাবণের শক্তিশেল।’ রচনা ও পরিচালনায় আমাদেরই ছাত্রী কলাবতী সিংহ। তাকে সহযোগিতা করেছে ধূপছায়া নাগ। মঞ্চাধ্যক্ষ জয়দেব পাল। আলোকসম্পাতে ঋত্বিককুমার। আবহসঙ্গীতে প্রণতি হালদার। এখন শুরু হচ্ছে জয়ন্তীর শেষ অনুষ্ঠান ‘রাবণের শক্তিশেল’।”
ঘোষণা শেষ হতেই লাউডস্পিকারে শোনা গেল ঐকতান। অসীমা দৌড়ে গিয়ে লাউডস্পিকারের শব্দ নিয়ন্ত্রককে বলে এল, ”কমান, পঁয়ষট্টি ডেসিবেলের নীচে রাখুন, নয়তো ঝামেলা বেধে যাবে।”
সোফায় মলয়া পাশে—বসা রাজশেখরকে বলল, ”জ্যাঠামশাই এতকাল লক্ষ্মণের শক্তিশেল কথাটাই তো শুনে এসেছি, রাবণের শক্তিশেল আবার কী?”
”শক্তিশেলটা কার, রাবণেরই তো? ময়দানব ওটা তৈরি করে জামাই রাবণকে যৌতুক দিয়েছিল।”
রাজশেখরের কথা শেষ হওয়া মাত্র ঝপ করে মণ্ডপের আলো নিভে গেল আর ধীরে ধীরে মঞ্চের পরদা সরে যেতে লাগল। প্রায় এক হাজার জোড়া চোখ তাকিয়ে রইল মঞ্চের দিকে উদগ্রীব হয়ে।
.
শুরু হল রাবণের শক্তিশেল
সন্ধ্যাকাল। মঞ্চ প্রায়ান্ধকার। মঞ্চের মাঝামাঝি, থলিতে মাথা রেখে আড়াআড়ি হাত—পা ছড়িয়ে শুয়ে একটি লোক। ছোলাভাজা মুখে ফেলতে—ফেলতে জিনসের প্যান্ট আর ঢলঢলে শার্ট পরা কাকের বাসার মতো চুল মাথায় পাতলা চেহারার এক যুবক প্রবেশ করল। এধার—ওধার তাকিয়ে স্বগতোক্তি করল, ”এ কোথায় এলুম রে, বাবা। চারিদিকে জঙ্গল, ভর সন্ধেবেলা ভূত—টুত বেরোবে না তো! ট্রেকারওলাকে বললুম কিষ্কিন্ধ্যা যাব, ব্যাটা এই জঙ্গলে নামিয়ে দিয়ে বলল এটাই কিষ্কিন্ধ্যা।”
