”তিন হাজার টাকার চেক আজই পাঠিয়ে দোব।”
”পাঠাতে হবে না। কালুর নাটকের দলবলকে একদিন পেটপুরে খাইয়ে দিয়ো এবং বলা বাহুল্য, আমাকেও।”
হনুমানের গন্ধমাদন আনার পরিকল্পনা
জয়ন্তীর প্রথম দুটো দিন ভালয়—ভালয় কাটল। উদ্বোধন করেন জীবিত প্রবীণতম শিক্ষিকা মহামায়া মজুমদার, বয়স পঁচাশি। রেকর্ড ঘেঁটে ষাট বছর আগে স্কুলে প্রথম পড়াতে আসা মহামায়ার নামটি বের করে বৃন্দাবন। এখনও তিনি পেনশন তুলছেন।
ডেকরেটর প্রায় চারফুট লম্বা পিতলের একটা প্রদীপের ঝাড় দেয়। তাতে ছিল একশো প্রদীপ। দুটি ছাত্রী কুঁজো হয়ে যাওয়া মহামায়াকে দু’দিক থেকে ধরে দাঁড়ায়। পঁচাত্তরটি প্রদীপে তেল ও সলতে দেওয়া ছিল। মহামায়া কাঁপা—কাঁপা হাতে মোমবাতি দিয়ে দুটি প্রদীপ জ্বালান। বাকি তিয়াত্তরটা জ্বালায় স্কুলের প্রেসিডেন্ট, হেডমিস্ট্রেস ও অন্যান্য শিক্ষিকারা। এরপর বিজ্ঞান প্রদর্শনী ও চিত্র প্রদর্শনীর ফিতে কাটা হয়, বক্তৃতা দেওয়া হয়। লোকনৃত্য দেখায় স্কুলের মেয়েরা, সবশেষে হয় ম্যাজিক শো।
দ্বিতীয়দিন দুপুরে প্যান্ডেল ফাঁকা। তখন পরদা টেনে স্টেজে ফুল রিহার্সাল দিল কলাবতী তার নাটকের। হাঁটুর নীচে ঢলঢল করা লাল ফুলছাপ দেওয়া বারমুডা আর কালো ফুলহাতা গেঞ্জি পরে এবং লোহার তার বাঁকিয়ে ৎ—এর মতো করে তাতে খড় ও কাপড়ের হলুদ পাড় জড়িয়ে তৈরি করা ল্যাজ কোমরে বেঁধে রুকমিনি হনুমানের মুখোশ লাগিয়ে চুল মাথার উপর ঝুঁটি করে বেঁধে স্টেজের উপর দাপিয়ে যেভাবে হাঁটাচলা করল, তাতে জয়দেব পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে বলতে বাধ্য হয়, ”আসল হনুমানও হার মেনে যাবে এর কাছে। সব হাততালি তো এই মেয়েটাই নিয়ে নেবে। কী সাহসী!”
রুকমিনি সমুদ্র লঙ্ঘনের লাফটা তিনবার করে দেখাল। স্টেজের এক প্রান্ত থেকে ‘জয় শ্রীরাম” বলে চিৎকার করে দুড়দাড় শব্দে যখন ছুটল, ল্যাজটা তখন উপর—নীচ করছিল স্প্রিংয়ের মতো। দু’হাত তুলে খড়ি টানা একটা জায়গায় পৌঁছেই টেকঅফ করে। অপর প্রান্তের উইংয়ের বাইরে জমিতে গোটাদশেক পেল্লায় তাকিয়া সাজিয়ে রাখা, তা ছাড়াও সতর্কতা হিসেবে একটা মোটা চাদরের দুটি প্রান্ত তাকিয়াগুলোর হাততিনেক উপরে শক্ত করে ধরে থাকে কলাবতী ও জয়দেব। হনুমানের পড়ার প্রথম ধাক্কাটা নিল ওই ধরে থাকা চাদরটা, তারপর সে চাদর—সমেত পড়ল তাকিয়ার উপর। রুকমিনির তিনটি লাফই নিখুঁত হল। তবে শেষ লাফটা দিতে পায়ের চাপটা একটু জোরেই দেয়, স্টেজের কাঠটা তাইতে মচ করে উঠেছিল।
দারুণ খুশি জয়দেব, হনুমানের ল্যাজের পাটের পুচ্ছটিতে হাত বুলিয়ে বলল, ”ল্যাজটা কে তৈরি করে দিয়েছে?”
”বাবা!” গর্বিত স্বরে বলল রুকমিনি। ”মা পরশু এই প্যান্টটা কিনে দিয়েছে। বলল, এখনকার হনুমানরা এইরকম প্যান্ট পরে। জামাটা দাদার, মানিয়েছে না?”
জয়দেবের কাছে কলাবতী জানতে চায়, হনুমানের গন্ধমাদন নিয়ে উড়ে আসার ব্যাপারটা কতদূর?
জয়দেব বলল, ”তারের উপর যে রোলারটা থাকবে সেটা আজ বিকেলে পাব। উইংয়ের বাইরে থেকে দড়ি ধরে টানলে রোলার থেকে ঝোলা হনুমান দাঁড়িপাল্লার মতো একটা তক্তায় ঝুলতে ঝুলতে সড়সড় করে এদিক থেকে ওদিকে যাবে।”
”কিন্তু ওকে তো মাটিতে নামতে হবে, নাকি ঝুলেই থাকবে?” কলাবতী তার সংশয় জানিয়ে দিল।
জয়দেব দু’হাত তুলে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, ”ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, ঝুলে থাকবে কেন, আস্তে—আস্তে হনুমানকে স্টেজে নামিয়ে দেওয়া হবে ওই দড়িটা আলগা করে। অডিয়েন্স যাতে তারটা দেখতে না পায়, সেজন্য স্টেজের উপর থেকে একহাত একটা কালো কাপড় এধার থেকে ওধার ঝোলাবার ব্যবস্থা করতে হবে। আজকের প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর তারটা খাটিয়ে দোব। রোলার লাগিয়ে ট্রায়ালও কমপ্লিট করব।”
দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান শেষ হল চার্লি চ্যাপলিনের ‘গোল্ড রাশ’ দেখিয়ে। দেখল প্রায় হাজার দেড়েক ছাত্রী, অভিভাবক এবং পাড়ার লোকেরা। দেখে সবাই খুশি। দারুণ মজার তো বটেই, তা ছাড়া ইংরেজি কথা বোঝারও ঝামেলা ছিল না। ছবিটা নির্বাক।
তৃতীয় দিনে বলরাম দত্তর ‘দূষণ এবং ছাত্রীদের কর্তব্য’নামে বক্তৃতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পাঁচমিনিট পর মণ্ডপে ফিসফাস শুরু হয়, তারপর বেশ জোরেই কথাবার্তা এবং গল্পগুজব চলতে থাকে। ছোট মেয়েরা যখন ছোটাছুটি করে খেলতে শুরু করল, ব্রততী আর থাকতে না পেরে শ্রোতাদের ধমক দিয়ে মাইক টেনে নিয়ে বলে, ”অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে মাননীয় বলরাম দত্ত মহাশয় বলছেন, যে বিষয়টা আমাদের জীবন—মরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর আপনারা কিনা তা না শুনে গোলমাল করছেন? চুপ করে বসে শুনুন। নয়তো চুপচাপ চলে যান।”
আগুনে ঘি পড়ল। এক ছাত্রীর বাবা দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, ”আমরা এখানে জয়ন্তী দেখতে এসেছি, উৎসবের আবহাওয়া চাই, উনি আবহাওয়া দূষণ ঘটাচ্ছেন। কোথায় কী বলতে হয় জানেন না।”
ব্যস, শুরু হয়ে গেল ভদ্রলোককে সমর্থন করে হইহই। সামনের সোফায় বিশিষ্টজনের সঙ্গে বসেছিল মলয়া, রাজশেখর, পলাশবরণ, রাজ্যশিক্ষা সচিব, প্রধান স্কুল পরিদর্শক সহ তিনজন কমিটি মেম্বার। হইহইটা যখন রইরই হওয়ার দিকে, তখন মলয়া সোফা থেকে উঠে দ্রুত স্টেজের পিছনে চলে যায়।
