”একটা ঘর দিন, সেখানে বেলুনগুলো ছেড়ে দোব।”
বৃন্দাবন তাকাল মিশিরের দিকে। মিশির বলল, ”ফাইভ বি—টু—তে ছেড়ে দিক।”
লোকটি, মিশির ও বৃন্দাবন দু’হাতে দুটো করে বেলুনের তোড়া ধরে ভ্যান থেকে বেলুনগুলো নিয়ে গেল ফাইভ বি—টু—তে। ছেড়ে দেওয়া মাত্র সেগুলো বুদ্ধুদের মতো উঠে ঘরের সিলিং—এ ঠেকে রইল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই বাকি পঞ্চাশটা তোড়া এসে গেল। ঘরের দরজায় তালা দিয়ে চাবিটা পকেটে রেখে বৃন্দাবন বলল ”পঁচাত্তরটা তোড়া মানে পঁচাত্তর বছর। দেখেছ মিশির, বেলুনগুলোর গায়ে আমাদের স্কুলের নাম আর প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী লেখা আছে। আইডিয়া আছে বটে বড়দির!”
মিশির বলল, ”এগুলো আকাশে ছাড়া হলে যাবে কোথায়?”
বৃন্দাবন বলল, ”যেদিকে হাওয়া দেবে সেদিকে যাবে। এখন পুবদিকে হাওয়া দিচ্ছে, যাবে সল্ট লেকে।”
ঘট মাথায় ফটক দিয়ে প্রথম ঢুকল গিরিবালা। তার পিছনে ব্যানার ধরে দুটি মেয়ে। ব্রততীর নির্দেশে স্কুল কম্পাউন্ডে পূর্বনির্ধারিত ছক অনুযায়ী পাঁচ সারিতে দাঁড়াল মেয়েরা। প্রতি সারির মাথায় একটি টেবল, ঝুড়িতে করে খাবারের বাক্স এনে তার উপর থাক দিয়ে রাখা হচ্ছে। ভোরে উঠে স্কুলে এসে চার মাইল হেঁটে মেয়েদের পেটের মধ্যে আগুন জ্বলছে।
মঙ্গলকলস মাথায় নিয়ে গিরিবালা সেটা কোথায় নামিয়ে রাখবে বুঝতে পারছে না। আরতি ঘটককে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ”আরতিদি, কলসিটা কোথায় রাখব? যেখানে—সেখানে তো রাখা ঠিক হবে না।”
আরতি এদিক—ওদিক তাকিয়ে বলল, ”তাই তো।” তারপর দৌড়ে গিয়ে অন্নপূর্ণা পাইনকে ধরল, ”কলসিটা কোথায় রাখা যায় বলো তো, অন্নপূর্ণাদি?”
অন্নপূর্ণা বলল, ”ব্রততীদি গিরিকে বলে দেয়নি কোথায় রাখতে হবে?”
আরতি বলল, ”গিরিই তো জিজ্ঞেস করল কোথায় রাখবে। আমি বলি কী, আমাদের টিচার্স রুমে এখন রাখুক।”
সেই সময় বৃন্দাবন মলয়ার হাতে বেলুনের চালানটা তুলে দিয়ে বলল, ”আগে বলেননি, সারপ্রাইজটা কিন্তু দারুণ দিলেন।”
অবাক মলয়ার ভ্রু চালানে রেখে কুঁচকে উঠল, ”এটা কী? আমি গ্যাস বেলুনের অর্ডার দিয়েছি।” ভ্রুর সঙ্গে কপালে বিস্ময়ের কুঞ্চন ফুটল।
”দিয়েছেন কী, মাল এসেও গেছে। আসুন, দেখে যান।”
মলয়াকে নিয়ে বৃন্দাবন ফাইভ বি—টু—র ঘরের তালা খুলে দরজার একটা পাল্লা সবেমাত্র টেনেছে, বেলুনের একটা তোড়া বেরিয়ে এল। বৃন্দাবন হাঁই—হাঁই করে উঠে সেটা দু’হাতে ধরতেই একটা বেলুন ফেটে গেল। তোড়াটাকে তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিয়ে বৃন্দাবন বলল, ”জানলা দিয়ে দেখুন।”
জানলায় গিয়ে মলয়া ঘরের মধ্যে তাকিয়ে দেখল নানান রঙের বেলুন উপরে ওঠার জন্য বেঞ্চ ও ডেস্কের উপর এক অপরের ঘাড়ে চেপে অপেক্ষা করছে।
বেলুন ফাটার আওয়াজে কৌতূহলী হয়ে অসীমা, অন্নপূর্ণা এবং পাশের টিচার্স রুম থেকে গিরিবালা এসে হাজির। জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে তারা তাকাল বৃন্দাবনের আঙুলের নির্দেশ অনুসরণ করে এবং একই সঙ্গে ‘ওমমা’ বলে উঠল।
বৃন্দাবন বলল, ”’ওমমা’ কী বলছেন, এগুলো ওড়াতে হবে, মেয়েদের ডেকে আনুন। পঁচাত্তরটা তোড়া, এক—একটায় পাঁচটা করে, তার মানে তিনশো পঁচাত্তর। এইমাত্র একটা ফেটে গেল, এখন তিনশো চুয়াত্তর। এ সব কার কল্যাণে বলুন তো?”
বৃন্দাবন ঠোঁট আকর্ষণ টেনে ধরে মলয়ার দিকে তাকাল এবং বলল, ”আমাদের স্কুলের নাম আকাশে উড়ে—উড়ে ঘুরে বেড়াবে, দূর—দূরান্তের কত লোক জানবে…”
”জানবে, যখন গ্যাস ফুরিয়ে মাটিতে নেমে আসবে।” অসীমা বলল।
”গ্যাস সবারই একদিন না—একদিন ফুরোয়, তাই বলে কি বেলুন ওড়ার আনন্দ করবে না?” অন্নপূর্ণা হালকা স্বরে কথাটা বলে মেয়েদের খবর দিতে ছুটে গেল।
ব্রততীর তত্ত্বাবধানে খাবারের বাক্স পাঁচটি টেবল থেকে দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। অন্নপূর্ণা ছুটে এসে চেঁচিয়ে উঠল, ”বেলুন বেলুন, বড়দি বেলুন এনেছেন ওড়াবার জন্য। যারা বেলুন ওড়াতে চাও, তারা ফাইভ বি—টু—তে চলে এসো।”
অন্নপূর্ণার কথা শেষ হতে না—হতেই লাইন ছেড়ে হুড়মুড় করে মেয়েরা ছুটে গেল স্কুলবাড়ির দিকে।
ব্রততী বিরক্ত স্বরে অন্নপূর্ণাকে বলল, ”আগে আমাকে বলবে তো, তা নয় সর্দারি করে নিজে বললে, দ্যাখো তো একটা কেওস তৈরি করে দিলে।”
ফাইভ বি—টু—র দরজায় হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। বৃন্দাবন দরজার একটা পাল্লা ফাঁক করে হাত গলিয়ে একটা তোড়ার গলার সুতো ধরে বেলুন টেনে বের করে সামনে যে মেয়েকে পাচ্ছে, তার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটি উঁচু করে তোড়াটি ধরে ছুটে গেল কম্পাউন্ডে। সেখানে ব্রততী তাকে পাকড়াও করল।
”অ্যাই, অ্যাই, এখন বেলুন ছাড়বে না। আগে লাইন করে দাঁড়াও। সবাই একসঙ্গে মিলে ছাড়বে।”
পঁচাত্তরটি মেয়ের হাতে বেলুন দেওয়ার কাজ যখন চলছে, মলয়া তখন বিধ্বস্ত অবস্থায় তার খাস কামরায় মাথায় হাত দিয়ে বসে। হাত ব্যাগের মধ্যে রাখা সেল ফোনটা বেজে উঠতে সে ক্লান্ত হাতে ব্যাগ থেকে বের করে কানে ধরে বলল, ”হ্যালো, কে বলছেন?”
”ঝামেলাবাজ বলছি। লাগছে কেমন?”
”আন্দাজ ঠিকই করেছিলুম। সিঙ্গি না হলে আমাকে এমব্যারাস করার মতো বুদ্ধি আর কার মাথা থেকে বেরোবো।”
”এমব্যারাসড হয়েছ শুনে খুব আনন্দ হচ্ছে।”
