এই পদযাত্রার প্রধান বৈশিষ্ট্য আধমিনিটের জন্যও ট্রাফিক জ্যাম করেনি। এ জন্য ট্রাফিক বিভাগের এসি ব্রততী বেদজ্ঞর সবিশেষ প্রশংসা করেন। সারি দিয়ে যাওয়া মেয়েদের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হেঁটে ব্রততী মিছিলকে সরলরেখায় আনতে ”স্ট্রেট লাইন, স্ট্রেট লাইন, স্ট্রেট লাইনে হাঁটো” বলে কাঁধে রূল দিয়ে টোকা মেরে—মেরে ফুটপাথের দিকে সরিয়ে দেয়। পদযাত্রার আগায় যে দুটি মেয়ে স্কুলের নাম ও প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী লেখা ব্যানার টানটান করে দু’ঘণ্টা ধরে হেঁটেছে, ব্যানারটা তারা মুহূর্তের জন্য আলগা করে ঝুলিয়ে ফেলেনি।
পদযাত্রা স্কুল থেকে শুরু হয়ে শেষ মেয়েটি বেরিয়ে যাওয়ার দু’মিনিটের মধ্যে স্কুল বাড়ির পিছনে ছোট্ট ফাঁকা জমিতে খাটানো সামিয়ানার নীচে প্রোমোটার শিবশঙ্কর হালদারের কেটারার শ্যালকের তত্ত্বাবধানে দরবেশ তৈরি এবং লুচির জন্য ময়দা মাখার কাজ শুরু হয়। আর আলুর দমের জন্য আলু সিদ্ধ করতে বড় একটা গ্যাসের বার্নারে কড়াই বসে যায়।
শিবশঙ্কর তিনদিন আগে স্কুলে এসে মলয়াকে বলে যায়, ”প্ল্যাটিনাম জুবিলি তো বছর—বছর হয় না, জীবনে একবারই হয়। মেয়েরা একটু মিষ্টিমুখ করবে না? এই ক’টা তো মেয়ে, কত আর খরচ হবে? দশ হাজার, পনেরো হাজার? আপনাদের এক পয়সাও দিতে হবে না, আমার মেয়ে পুতুল তার বন্ধুদের, দিদিমণিদের খাওয়াবে। মা অভয়ার কৃপায় পুতুলের বাবার এটুকু খরচ করার ক্ষমতা আছে।”
মলয়া বলেছিল, ”কিন্তু খাবারের বাক্সগুলো…”
তাকে থামিয়ে দিয়ে শিবশঙ্কর বলে উঠেছিল, ”পরিবেশদূষণ? ভেবে রেখেছি। দুটো ড্রাম থাকবে, মেয়েরা খেয়ে ড্রামে বাক্স ফেলবে, আমার লোক সেগুলো কর্পোরেশনের জঞ্জালের ভ্যাটে ফেলে দিয়ে আসবে, ব্যস, দূষণের ঝামেলা আর থাকবে না।”
হাঁপ ছেড়েছিল মলয়া। তার ভয় ছিল দূষণ নিয়ে বলরাম দত্ত আবার আন্দোলন না পাকায়। পুতুলের বাবা যে চমকটা মলয়াকে দিয়েছিল, প্রায় সেইরকমই চমক পেল মিশিরজি।
জয়ন্তী পদযাত্রা শুরু হতেই স্কুল ফাঁকা। পাহারা দিতে রয়ে যায় চতুরানন মিশির, দারোয়ান ভোলা দাস আর ঝাড়ুদার গণেশ। হেড ক্লার্ক বৃন্দাবনবাবু ভিয়েনের কাছাকাছি টুলে বসে। বিশাল স্কুল কম্পাউন্ডের একদিকে প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ। প্লাস্টিকের বেত লাগানো লোহার চেয়ার এসে গেছে, সেই সঙ্গে লম্বা—লম্বা তিনটি সোফা, হলুদ আর খয়েরি কাপড়ে প্যান্ডেল মোড়ার কাজ চলছে। মঞ্চে জয়দেব পরদার খোলা—বন্ধ পরীক্ষায় এবং হনুমানকে উড়িয়ে আনার ব্যবস্থায় নিযুক্ত। ইলেকট্রিকের তার বিছানো কালই শেষ হয়েছে। টিউব এবং বালবের ফিটিংস এবার লাগানো হবে।
মিশিরজি দাঁড়িয়েছিল লোহার ফটকে। একটা আপাদমস্তক ঢাকা মোটরভ্যান তার সামনে এসে দাঁড়ায়। ভ্যান থেকে একটি লোক নেমে এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, ”এটা কি কাঁকুড়গাছি উচ্চচ বালিকা স্কুল?”
মিশিরজি বিরক্তমুখে আঙুল তুলে ফটকের উপরের সাইনবোর্ডটা দেখিয়ে বলে, ”বাংলাতেই তো লেখা, পড়তে পারেন না?”
লোকটি মিশিরের কথায় কান না দিয়ে বলল, ”মলয়া মুখার্জি কে? এই চালানে সই করতে হবে, মাল আছে, নামিয়ে কোথায় রাখব?”
মিশির এতগুলো কথা মাথায় সাজিয়ে নিতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল, তারপর বলল, ”মলয়া মুখার্জি এখানে বড়দি। তিনি এখন জলুস নিয়ে বেরিয়েছেন, তিন—চার ঘণ্টা তো লাগবেই ফিরে আসতে। কী মাল আছে? আমি সই করে নিয়ে নিলে হবে?”
”আপনি এখানে কী করেন?”
”আমি বড়দির খাস বেয়ারা।” মিশিরের স্বর গম্ভীর ও নম্র, নিজের গুরুত্ব বোঝাতে। লোকটি ইতস্তত করে বলল, ”এখানে স্কুলের মাস্টার—টাস্টার কেউ আছে?”
মিশির আবার বিরক্ত হয়ে বলল, ”মাস্টার কোথায় পাবেন, সব দিদিমণি। হেড কেলারক বৃন্দাবনবাবু আছেন, চলবে?”
”চলবে, ডেকে আনুন, খুব জরুরি দরকার।”
মিশির ডেকে আনল বৃন্দাবনকে। ততক্ষণে ভ্যানটা ভিতরে ঢুকে স্কুলের কোলাপসিবল গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটি বলল, ”মলয়া মুখার্জি অর্ডার দিয়েছিলেন, সকাল সাতটার মধ্যে মাল রেডি করে ডেলিভারি দিতে। দেখুন সাতটার আগেই নিয়ে এসেছি।” লোকটি চালানের আসল ও কপি, দু’টো ছাপা বিল বুকপকেট থেকে বের করে বিস্মিত বৃন্দাবনের হাতে দিয়ে বলল, ”সই করে দিন আর মাল কোথায় নামিয়ে রাখব সেই ঘরটা একটু দেখিয়ে দিন।”
বৃন্দাবন চালানে চোখ বুলিয়ে দেখল উপরে লেখা ইউনিক এন্টারপ্রাইজ। জেনারেল অর্ডার সাপ্লায়ার্স। হতভম্ব স্বরে বলল, ”তিনশো পচাঁত্তরটা গ্যাস বেলুন। কে আনতে বলল?”
লোকটি বলল, ”মলয়া মুখার্জি অর্ডার দিয়েছেন, তিন হাজার টাকা আগাম পেমেন্টও করে দিয়েছেন। পাঁচটা করে এক—একটা বাঞ্চে পঁচাত্তরটা বাঞ্চ। পঁচিশটার বেশি এই ভ্যানে ধরল না। বাকি পঞ্চাশটা দু’বারে এনে দিচ্ছি, খুব কাছেই বেলেঘাটায় আমাদের অফিস, যাব আর আসব। কী যে ঝামেলার কাজ, হাত ফসকালেই উড়ে যাবে, একটু তাড়াতাড়ি করুন।”
চালানে সই করে আসলটা ফিরিয়ে দিয়ে বৃন্দাবন কৌতূহলী হয়ে বলল, ”দরজাটা খুলুন তো, একবার দেখি।”
”দেখুন আর ঠিকঠাক গুনে নেবেন, এখানে পঁচিশটা বাঞ্চে একশো পঁচিশটা বেলুন আছে।”
লোকটি ভ্যানের পিছনের দুটি পাল্লা সন্তর্পণে খুলে দেখাল। লাল, হলুদ, সবুজ, সাদা ও নীল, পাঁচ রঙের বেলুন নিয়ে সুতোয় বাঁধা এক—একটি তোড়া, দিঘিতে পদ্মফুল বাতাসে যেমন হেলে দোলে, তেমনি গ্যাস বেলুনের তোড়াগুলো ভ্যানের মধ্যে ভাসছে, দুলছে।
