সুগ্রীব।।বলতে পারি, তবে পরেরদিনই আমার লাশ পড়ে যাবে।
রাম।।কোনও ভয় নেই, আমরা তোমার পাশে থাকব। তুমি শুধু সীতা কেমন আছে সেই খবরটা এনে দাও।
রিহার্সাল এই পর্যন্ত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রইল।
জয়দেবের হতভম্ব ভাবটা এতক্ষণে কেটে গেছে এবং সে বুঝে ফেলেছে এটা কী ধরনের নাটক। হাসতে—হাসতে বলল, ”ড্রেস, মেকআপ, তির ধনুক, গদা এসব নিশ্চয় লাগবে না। স্টেজের পিছনে সাদা কাপড় দিয়ে দোব। স্টেজটা মাটি থেকে চার ফুট উঁচু, দু’দিকে উইং, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে স্টেজে ওঠানামা। আচ্ছা লম্বায় কতটা হলে সুবিধে হয়?”
কলাবতী বলল, ”অনেকটা লম্বা চাই, এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত। কেন না, হনুমান দৌড়ে এসে সমুদ্র লঙ্ঘনের জন্য ঝাঁপ দেবে।”
জয়দেব বলল, ”ওরে বাবা, ঝাঁপও থাকবে! ঝাঁপিয়ে পড়বে কোথায়?”
”উইং দিয়ে স্টেজের বাইরে গিয়ে পড়বে, সেখানে অনেকগুলো বালিশ—তাকিয়া থাকবে। আপনাদের কাছে তো এসব থাকে, এনে রেখে দেবেন। ইনজুরি হলে বিপদে পড়ে যাব।”
”বেশ ভাল বুদ্ধি করেছেন তো।”
”বুদ্ধিটা আমার নয়, কাকার।”
”লঙ্কায় গিয়ে হনুমান তো লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে ছিল। এই নাটকেও তা আছে নাকি?”
”লঙ্কাকাণ্ড মানে অগ্নিকাণ্ড? ওরে বাবা! তা হলে বড়দি তক্ষুনি নাটক বন্ধ করে দেবেন। ধুপুকে আর আমাকে পরদিনই টি সি দিয়ে বলবেন বিদেয় হও।”
জয়দেবের নাট্য—উৎসাহ ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে কথা বলার সঙ্গে। এই অল্পবয়সি নাট্যকার—পরিচালককে উপদেশ দেওয়ার জন্য তার মাথার মধ্যে সৃজনী পোকাটি কুটকুট করে কামড় দিল।
”আচ্ছা আপনার নাটকটা শেষ হবে রামায়ণের কোন জায়গায়?”
”সুকুমার রায় যেখানে শেষ করেছিলেন। শক্তিশেলের ধাক্কায় লক্ষ্মণ পড়ে গেল, হনুমান গন্ধমাদন পাহাড়টা মাথায় করে আনল, লক্ষ্মণ বেঁচে উঠল। ওইখানেই আমার নাটকও শেষ হবে। সময় একঘণ্টা, তার মধ্যেই যা কিছু।”
”শক্তিশেল মারাটা দেখাবেন কী করে? গন্ধমাদন নিয়ে হেঁটে হেঁটে তো হনুমান আসবে না, উড়ে আসবে। সিনেমায় দারা সিং তো তাই করেছিল।”
”এটা নিয়ে এবার ভাবতে হবে। বাইরে চলুন, রিহার্সালের সেকেন্ড পার্ট এবার শুরু হবে।” কলাবতী ঘরের বাইরে করিডরে এল, সঙ্গে জয়দেব। সেকেন্ড পার্ট মানে খাওয়া। দু’ স্লাইস পাউরুটি আর যথেষ্ট ঝাল দেওয়া দমের দু’টুকরো আলু। এটা সম্ভব হয়েছে সত্যশেখর প্রতিদিন কুড়ি টাকা ভর্তুকি দেওয়ায় এবং গিরিবালা বাড়ি থেকে রেঁধে আনায়।
জয়দেব বলল, ”আমি বলি কী, লক্ষ্মণকে রাবণ গুলি করুক। বন্দুক জোগাড় করতে পারবেন? গুলির আওয়াজটা বুড়িমা, কি চকলেট বোমা দিয়ে তৈরি করে দেওয়া যাবে। কিন্তু মুখোমুখি বানর আর রাক্ষস সৈন্যদের যুদ্ধটা কীভাবে হবে?”
”খুব সোজা, ক্যারাটে।” কলাবতী সহজ গলায় বলল, ”তিনটে মেয়ে পেয়েছি, এই পাড়ায় ক্যারাটে স্কুলে শেখে। বাকিরা টিভিতে হিন্দি ফিল্ম দেখে—দেখে সেদিন নকল করে দেখাল উইথ ডায়ালগ, ফ্যান্টাস্টিক। আর যুদ্ধের সময় অবিরাম স্টেজের দু’পাশে কালীপটকা ফেটে চলবে।”
”বড়দি তো তা হলে নাটক বন্ধ করে দেবেন, কালীপটকা ফাটবে তো আগুনে!”
”একটা উপুড় করা হাঁড়ির মধ্যে যদি ফাটে তা হলে তো ওনার আপত্তি করার কিছু থাকবে না।”
জয়দেব কবজি তুলে ঘড়ি দেখল। হঠাৎ যেন মনে পড়ল এমনভাবে বলল, ”অ্যাকাডেমিতে আজ আমাদের নতুন নাটক ‘বাঘের লোমের কাঁথা’—র ফোর্থ শো। আমার অ্যাপিয়ারেন্স অবশ্য শেষের দিকে, দেরিতে গেলেও চলবে।”
কলাবতী বিচলিত স্বরে বলল, ”আপনাকে দেরি করিয়ে দিলুম, লজ্জা করছে।”
”আরে না না, এতে লজ্জা পাওয়ার কী আছে। আমি ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব। একটা সাজেশন দিতে ইচ্ছে করছে, বুঝতে পারছি না দেওয়া ঠিক হবে কিনা।”
”কেন ঠিক হবে না?” কলাবতী ব্যগ্র হয়ে বলল, ”আমি তো নতুন, কাঁচা, পরামর্শ চাই।”
”এই যে পদ্যে ডায়ালগ, এটা একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে। দর্শকরা তো রামায়ণ মহাভারত নামটাই শুনেছে, পড়ে—টড়ে তো দেখেনি। ওদের কাছে বোরিং মনে হতে পারে। একটু ছেঁটে দিন, নয়তো গদ্যে বলা হোক।” জয়দেব এই বলে কলাবতীর মুখভাব লক্ষ করল। মুখে বিরূপতা বা অপ্রসন্নতার ছায়া দেখতে না পেয়ে সে বলল, ”আমি একটা ব্যাপার করতে চাই, সেটা হল হনুমান গন্ধমাদন নিয়ে স্টেজে উড়ে আসবে।”
”সে কী! কীভাবে?” বিস্মিত কলাবতীর চোখের মণি বড় হয়ে উঠল।
”একটু ভেবে নিতে হবে। হনুমানের সাইজটা দেখতে হবে আর সাহস আছে কেমন, সেটা জানতে হবে। উড়ে আসাটা কিন্তু চেষ্টা করলে করা যায়। রোপওয়ে দেখেছেন? তারের উপর দিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ট্রলিতে মানুষ যায়। হনুমান যদি সেইভাবে যায়?” জয়দেব এমনভাবে তাকাল যেন মহাকাশে ব্ল্যাক হোল হারিকেন হাতে খুঁজতে—খুঁজতে পেয়ে গেছে।
কলাবতী তো তাজ্জব। চোখ পিটপিট করে বলল, ”বলেন কী! এমন আইডিয়া তো আমার কাকার মাথাতেও আসেনি!”
”উনি নিশ্চয় নাটক করেন না।”
”হাইকোর্টের উকিল। ছোটবেলায় খুব যাত্রা দেখেছেন।”
”হায়ার না হয়ে লোয়ার কোর্টের উকিল হলে মাথায় ঠিক আইডিয়া গজিয়ে যেত। যাই হোক, যা বললুম এটা কাউকে বলবেন না। তা হলে কিন্তু সারপ্রাইজটা মাটি হয়ে যাবে। আমি গন্ধমাদনটা করে দেখাব।” জয়দেব আবার ঘড়ি দেখল, ”অ্যাকাডেমিতে বেল বেজেছে, স্ক্রিন এইবার সরবে। আমি যাই।”
খাবারের বাক্স ও গ্যাস বেলুন : ঝামেলাবাজদের চমক
তিনদিনের প্ল্যাটিনাম জুবিলি শুরু হয়েছিল মাথায় হলুদ ক্যাপ ও স্কুল ড্রেস পরা প্রায় হাজার ছাত্রীর পদযাত্রা দিয়ে। কাঁকুড়গাছি থেকে দক্ষিণে ফুলবাগান ঘুরে পুবে কাদাপাড়া হয়ে ই এম বাইপাস ধরে উত্তরদিকে গিয়ে মানিকতলা মেন রোড ধরে পশ্চিমে এসে আবার কাঁকুড়গাছিতে। এক সারি দিয়ে এই পদযাত্রার আগায় চিত্রবিচিত্র করা কলসি মাথায় নিয়ে সকাল ছ’টায় প্রথম হাঁটতে শুরু করে হেডমিস্ট্রেস মলয়া। প্রতি দশ মিনিট অন্তর মাথা বদল হয়। প্রোগ্রামে লেখা ছিল ‘পূর্ণমঙ্গলঘট মস্তকে ধারণ করে শিক্ষিকাদের এলাকা প্রদক্ষিণ’। কিন্তু ঘট বা কলসির আকার দেখে চারজন শিক্ষিকা জানিয়ে দেয় তাদের ঘাড়ে স্পন্ডিলোসিস, পূর্ণ নয়, কলসিটা শূন্য করা হোক। কেউ টের পাবে না ওটা খালি না ভর্তি। কিন্তু এগারোজন শিক্ষিকা এর তীব্র প্রতিবাদ করে বলে, ”স্কুলের মঙ্গলামঙ্গলের ব্যাপার এর সঙ্গে জড়িয়ে, মঙ্গলঘট পূর্ণ রাখতেই হবে। ওই চারজনকে বাদ দিয়ে আমরাই ঘট বইব।” তাই হয় শেষ পর্যন্ত। দু’ঘণ্টায় প্রায় চার মাইল পথ পরিক্রমা করে এই পদযাত্রা। প্রসঙ্গ বলে রাখা ভাল, শেষ পঁয়তাল্লিশ মিনিট মঙ্গলঘট বহন করেছিল গিরিবালা ঢালি।
