ব্রততী বলল ”দুজন পেন্টার, দু’জন জার্নালিস্ট, তিনজন মন্ত্রীকে সল্টলেকে পেয়ে গেছি। ওঁরা কথা দিয়েছেন আসবেন। কলাবতী, তোমাদের কীরকম স্টেজ চাই সেটা এনাকে বলো।”
ব্রততী চোখ দিয়ে প্রৌঢ়কে দেখিয়ে বলল, ”আমাদের ফাংশনের জন্য ডেকরেটিংয়ের সব কাজ ইনি করবেন। বগলাবাবু, এই মেয়েটি নাটক করাচ্ছে, কীরকম কী হবে ও বলবে।”
গলা খাঁকারি দিয়ে বগলা ডেকরেটর্সের মালিক ভ্রু কুঁচকে কলাবতীকে দেখে নিয়ে বলল, ”স্টেজ—টেজ করার ব্যাপার আমার চেয়েও ভাল বোঝে আমার ম্যানেজার এই ছেলেটি, বি কম পাস।” বগলাবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে লম্বা নাক যুবকের দিকে তাকাল, ”ও নিজে থিয়েটার—ফিয়েটার করে, এসব ব্যাপার ভাল বোঝে—টোঝে। বরং আমাকে না বলে জয়দেবকেই বলুক। জয় ‘ফুটো বেলুন’ নামে একটা থিয়েটার দলের স্টেজ ম্যানেজার, ওকে বললে সব করে দেবে। হ্যাঁ রে জয়, স্কুলের ছোট—ছোট মেয়েরা নাটক করবে, স্টেজটা কেমন হবে সেটা জেনে নিয়ে তুই করে দে।”
বাধা ছেলের মতো জয়দেব উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করে বলল, ”হ্যাঁ স্যার, ওদের কিছু করতে হবে না, শুধু একবার আমায় বলে দিক নাটকটার সিনপসিস আর কী কী ঘটনা দেখাবে বা দেখাতে চায়।”
কলাবতী বলল, ”সবার জানা কাহিনী, রামায়ণের দু’তিনটে ঘটনা নিয়ে নাটক।”
জয়দেব বলল, ”ব্যস, ব্যস, বুঝে গেছি, সীতাহরণ, শূর্পণখা, জটায়ু…”
তাকে থামিয়ে দিয়ে ধূপছায়া বলল, ”আরও পর থেকে শুরু হবে নাটক। এখন এই ঘরে বসে অত কথা বলা যাবে না। যদি পারেন তা হলে ছুটির পর আমরা স্কুলেই রিহার্সাল করি, আপনি আসুন, কীভাবে করতে চাই, সেজন্য কী দরকার, সেটা আপনাকে বলে দেব।”
মলয়া বলল, ”সেই ভাল। জয়দেববাবু আপনি ছুটির পর এসে দু’জনের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন। আপনি তো নাটকের লোক, ওদের হেল্প করতেও পারবেন।”
বড়দির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ধূপছায়া প্রথমেই বলল, ”নাকখানা দেখেছিস, শ্রীমান লম্বনাসিকা!”
কলাবতী বলল, ”নাটকপাগল। এদের মাথায় অনেক আইডিয়া ঘোরে, আমাদের কাজে লেগে যেতে পারে।”
স্কুল ছুটির পর কলাবতী রিহার্সাল দেওয়ার জন্য টিচার্স রুমের দিকে যাওয়ার সময় দেখল জয়দেব করিডরে দাঁড়িয়ে। প্রথমেই তার মনে হল এই লম্বনাসিকা সত্যিই নাটকপাগল, নইলে মেয়েদের স্কুলের সামান্য একটা নাটকের জন্য তখন থেকে অপেক্ষা করে থাকবে কেন!
কলাবতী ব্যস্ত স্বরে বলল, ”দাদা বাইরে কেন, ঘরে আসুন। রিহার্সাল দেখুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন কীরকম নাটক, কী আমাদের দরকার।”
জয়দেবকে নিয়ে কলাবতী টিচার্স রুমে ঢুকল। তখন রাম হাপুস নয়নে সীতার জন্য বিলাপ করছে। কলাবতী বলল, ”এই জায়গাটা কৃত্তিবাস থেকে নেওয়া, বর্ষায় চারিদিক জলে ডুবে গেছে, কবে জল সরবে, কবে সীতাকে উদ্ধার করা যাবে এই চিন্তায় পাগল হয়ে লক্ষ্মণকে বলছেন—”
রাম তখন মাথা চাপড়ে বলে চলেছে :
ততদিনে সীতা হবে অস্থিচর্মসার।
কী জানি ত্যজে বা প্রাণ বিরহে আমার।।
একাকিনী অনাথিনী শত্রুমধ্যে বাস।
কেমনে বাঁচিবে সীতা এই কয় মাস।।
আমা বিনা জানকীর অন্যে নাহি মন।
এই ক্রোধে পাছে তারে বধে দশানন।।
কান্দিতে কান্দিতে সীতা মরিবে নিশ্চিত।
কী করিবে ভাই তুমি কী করিবে মিত।।
কলাবতী দেখল জয়দেব ড্যাবডেবে চোখে রামের দিকে তাকিয়ে বলল, ”দারুণ মুখস্ত করেছে তো!” তারপরই সে চমকে উঠল লক্ষ্মণের সংলাপ শুনে।
রামের পাশে দাঁড়ানো লক্ষ্মণ ধমকে উঠে বলল, ”ছিঃ দাদা, তুমি মেয়েমানুষের মতো কাঁদছ আর কৃত্তিবাস আওড়াচ্ছ? খোঁজ নাও রাবণ কেন বউদিকে কিডন্যাপ করল? সে ব্যাটা গেল কোথায়, বালিকে মেরে যাকে কিষ্কিন্ধ্যার রাজা করে দিলে?”
রাম।।সুগ্রীবের কথা বলছিস? বলেছিল সীতা উদ্ধারে আমাকে সাহায্য করবে, নইলে কি আমি বালিকে মারি? যেই সিংহাসনে বসল অমনি সব প্রমিস ভুলে মেরে দিল। ব্যাটাকে কিষ্কিন্ধ্যায় না বসিয়ে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো উচিত ছিল।
লক্ষ্মণ।।যাই, হারামজাদাকে মারতে—মারতে নিয়ে আসছি।
লক্ষ্মণ রাগে গরগর করতে—করতে দশ পা হেঁটে গিয়ে একটি মেয়ের ঘাড় ধরে পিঠে মৃদুভাবে চড় মারতে—মারতে ফিরে এল।
লক্ষ্মণ।।দাদা এই সেই ব্যাটা সুগ্রীব। যা বলার এখন দাদাকে বল।
হাতজোড় করে সুগ্রীব।।
হারাইয়া রাজ্য পাই রামের প্রসাদে।
তোমার প্রসাদে আমি বাড়িনু সম্পদে।।
হেরি রঘুনাথ স্বয়ং বিষ্ণু অবতার।
কার শক্তি শোধিবেক শ্রীরামের ধার।।
সীতা উদ্ধারিবে রাম আপন শক্তিতে।
যাইব কেবল আমি তাহার সহিতে।।
না করিয়া রামকার্য বসে আছি ঘরে।
বানর জাতির দোষ লাগে ক্ষমিবারে।।
পশুজাতি কপি আমি কত করি দোষ।
সেবক বৎসল রাম না করেন রোষ।।
লক্ষ্মণ।।খুব হয়েছে, ন্যাকামো করার জায়গা পাসনি? এবার একটু কাজ করে দেখা। বউদিকে রাবণ কোথায় রেখেছে সেই খোঁজটা চটপট এনে দে। দেখছিস না দাদার হাঁড়ির হাল হয়েছে চেহারার।
সুগ্রীব।।আজ্ঞে খোঁজ পেয়েছি। তিনি আছেন লঙ্কায় অশোক কাননে।
ব্যগ্রস্বরে রাম।।পেয়েছ, খোঁজ পেয়েছ? কেমন আছে সীতা?
সুগ্রীব।।বলতে পারব না। রাবণ একটা রাক্ষসকে পাঠিয়েছিল চিঠি দিয়ে। কিষ্কিন্ধ্যায় ওর লোক এসে তোলা তুলবে, আমি যেন কিচ্ছুটি না করি। লোকটি আমাকে বলল।
লক্ষ্মণ।।তোর রাজ্যে এসে রাবণের লোক তোলা আদায় করবে, তুই কিছু বলবি না?
