মুরারি এসে বলল, ”ছোটকত্তা, চান করে নাও। রান্না হয়ে গেছে।”
সবাই খাওয়ার ঘরে এসে দেখল, টেবলে সাজানো খালি প্লেট, ট্রে—তে ধোঁয়া ওঠা ভাত, বৌলে মুগের ডাল, পোস্ত চিংড়ি, ছোট—ছোট প্লেটে পারশে মাছের ঝাল আর বেগুনভাজা। আর টেবলের মধ্যিখানে একটা বড় অ্যালুমিনিয়াম গামলা, তাতে জলে ডুবে রয়েছে কয়েকটা কাঁকড়া। টেবলের একধারে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে অপুর মা ও মুরারি।
রাজশেখর একটু অবাক হয়ে গামলাটা দেখিয়ে বললেন, ”এটা কী?”
গম্ভীর স্বরে অপুর মা বলল, ”ছোটকত্তার আনা ক্যাঁকড়া।”
”আমি তো তুলে রাখতে বললুম, কাল রান্না কোরো।” সত্যশেখরের স্বরে কিঞ্চিৎ বিরক্তি।
”ফ্রিজে তুলে রাখলে আর কিছু সেখানে রাখা যাবে না। সব ফেলে দিতে হবে।”
”কেন?” উদ্বিগ্ন চোখে বলল সত্যশেখর।
অপুর মা হাতায় করে একটা কাঁকড়া তুলে সত্যশেখরের নাকের কাছে ধরে বলল, ”শুঁকুন।”
কাঁকড়ার গন্ধ নাকে টেনেই সত্যশেখর মাথাটা পিছিয়ে নিয়ে প্রায় আঁতকে উঠে বলল, ”ফেলে দাও, ফেলে দাও।”
”অন্তত সাতদিনের মরা। এই কিনতে টালিগঞ্জ গেছলেন। খোলা ভাঙতেই পচা গন্ধে ম—ম করে উঠল রান্নাঘর। ধুপু দিদিমণির তো সকালে ক্যাঁকড়া খাওয়া চলবে না, অ্যালাজ্যি না কী যেন গায়ে বেরোয়। মুরারিদা, বাজারে জ্যান্ত ক্যাঁকড়া পেলে নিয়ে এসো তো। লাউ দিয়ে রাঁধব। বিকেলে কালুদি দিয়ে আসবে, রাত্তিরে ধুপু দিদিমণি খাবে।”
গামলাটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে—যেতে অপুর মা বলে গেল, ‘টমটমের চাটনি আনছি।”
প্লেটে ভাত তুলে, বৌল থেকে দু’হাতা ডাল ঢেলে নিয়ে রাজশেখর সেটা ধুপুর সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ”জ্যান্ত কি মরা সেটা দেখে কিনবি তো?”
লজ্জিত, বিব্রত স্বরে সত্যশেখর বলল, ”দেখলুম শান্তশিষ্ট হয়ে রয়েছে তাই আর বিরক্ত করিনি। সামনের রোববার ব্যাটাকে গিয়ে ধরব, অ্যায়সা থাপ্পড় কষাব, বাছাধন বুঝে যাবে কাকে পচা কাঁকড়া গছিয়েছে।”
কলাবতী বলল, ”কাকা সামনের রোববার তুমি কি ভেবেছ লোকটা মানিকতলা ব্রিজের উপর বসবে?”
”তা নয়তো কোথায় বসবে?”
”টালিগঞ্জ রেল ব্রিজের নীচে। ঠকানোর জায়গায় দ্বিতীয়বার কেউ বসে না।”
খাওয়ার পর ধুপুকে নিয়ে কলাবতী শোওয়ার ঘরে এল। পাণ্ডুলিপির ফাইলটা ধুপুর হাতে দিয়ে বলল, ”আগে পড়ে নে, তারপর যা জিজ্ঞেস করার করবি। শুধু মনে রাখিস এটা আধুনিক লক্ষ্মণের শক্তিশেল, সুকুমার রায়ের নয়, কলাবতী সিংহর লেখা, ত্রেতা নয় কলিযুগে ঘটছে। অভিনয়ের সময় একঘণ্টা।”
.
রিহার্সালে প্রবল উৎসাহ মেয়েদের। ছুটির ঘণ্টা পড়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারা টিচার্স রুমের দরজায় এসে জড়ো হয়ে দিদিদের বেরিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। অধৈর্য হয়ে কেউ—কেউ ঘরে ঢুকে গিয়ে চেয়ার সরাতে শুরু করে। রাম লক্ষ্মণকে নিয়ে নাটক, হনুমানজিও আছেন, তাই শুনে চতুরানন মিশির টুল নিয়ে বসে গেছল ঘরের একধারে। কিন্তু সংলাপের ভাষার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে বিরক্ত হয়ে রিহার্সাল দেখা বন্ধ করে দেয়। যার যা সংলাপ কলাবতী আলাদা—আলাদা কাগজে লিখে মুখস্থ করতে দিয়েছিল এবং তারা এমন মুখস্থ করে ফেলেছে যে, অভিনয় করে বলার বদলে কবিতা আবৃত্তির মতো গড়গড়িয়ে বলে ফেলছে। এটা সামাল দিতে কলাবতীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মহা খুশি রুকমিনি। হনুমান লঙ্কার উদ্দেশ্যে লাফ দেবে এটা থাকছে। ধুপুদির কাছ থেকে এটা শোনার পর সে বাড়িতে লাফ বা ঝাঁপ দেওয়া প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছে। শোওয়ার খাটে কয়েকটা বালিশ রেখে সে বারান্দা থেকে ছুটে এসে ঘরের দরজার চৌকাঠ থেকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে চেঁচিয়ে দু’হাত তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বালিশের উপর। চৌকাঠ আর খাটের মধ্যে দূরত্বটা সাত ফুট। ঝাঁপাতে গিয়ে একদিন পা পিছলে ডান হাঁটু খাটের কাঠে লেগে জখম হয়। তাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে ধূপছায়ার মাথায় হাত। দিনে তিনবার ঠান্ডা—গরম জল দু’দিন ধরে ঢেলে রুকমিনিকে ফিট করে দেয় তার মা। ক্লাস সিক্স—এর জ্যোতির মা মুখোশ বানাতে পারেন, এই খবরটা পেয়ে ধূপছায়া চলে গেল জ্যোতিদের বাড়িতে। বানরসেনাদের জন্য মুখোশ তৈরি করে দিতে হবে গোটা পনেরো। জ্যোতির মা রাজি, যদি কাগজ আর রং তাঁকে কিনে দেওয়া হয়। এরপর ব্রততীর সঙ্গে ধূপছায়ার টাগ অফ ওয়ার কাগজ আর রং কেনার টাকা নিয়ে। ব্রততীর হিসেব অনুযায়ী মুখোশ পিছু একটাকার কাগজ এবং পঞ্চাশ পয়সার রং, মোট দেড় টাকার বেশি অনুমোদন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। অবশেষে রফা হয় একটাকা সত্তর পয়সায়।
একদিন মলয়া টিফিনের সময় তার ঘরে ডেকে পাঠাল কলাবতী ও ধূপছায়াকে। দু’জনে এসে দেখল বড়দির টেবলের উলটোদিকে বসে ব্রততী আর ধুতি—শার্ট পরা এক প্রৌঢ় আর দেওয়াল ঘেঁষে চেয়ারে বসা বছর পঁচিশের এক তরুণ, যার মুখের একমাত্র দ্রষ্টব্য বস্তুটি হল নাক। কলাবতীর মনে হল বাঁশির মতো নাক বোধ হয় একেই বলে। নাকের ডগা গোঁফ ছাড়িয়ে উপরের ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। চোখ দুটি গোল—গোল এবং ছটফটে।
মলয়া বলল, ‘কালু, তোমাদের নাটকের খবর কী? শ্রীলা বলল তাদের অর্কেস্ট্রা রেডি, অর্চনারা এগজিবিশনের জন্য মেয়েদের আঁকা গোটা চল্লিশ ছবি জোগাড় করে ফেলেছে, আরতি তার মেয়েদের নিয়ে যা—যা তৈরি করে দেখাবে বলেছিল তার থ্রি—ফোর্থ রেডি, প্রণতি বলেছে নানান রাজ্যের ফোক ডান্সের একটা প্রোগ্রাম করবে। অন্নপূর্ণার ‘কচ ও দেবযানী’টা নিয়ে আমাদের আলোচনায় বসতে হবে। কচ ও নিজে হতে চায়। সেটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।”
