সত্যশেখর বলল, ”কারও ক্ষতি না করে ছোট্ট একটা—দুটো মিথ্যে কথা তো বলাই যায় পরিস্থিতি সামলাতে। অবশ্য পরিস্থিতিটা যদি নাটকীয় হয়, এই যেমন এখন হল, কালু, তোর নাটকে নিশ্চয় নাটকীয় পরিস্থিতি থাকবে।” থাকবেই ধরে নিয়ে সত্যশেখর বোতল থেকে ঢকঢক করে আধলিটার গলায় ঢেলে নিল।
কলাবতী বলল ”নাটকীয় আবার কী! রামায়ণে ইন্টারেস্টিং ইনসিডেন্ট যা—যা আছে, তেমন দু’তিনটে ঘটনাই থাকবে। একঘণ্টায় কি গোটা মহাকাব্য দেখানো যায়?”
এই সময় স্নান সেরে ফতুয়া—পাজামা পরে রাজশেখর এসে তাঁর ইজিচেয়ারে বসে বললেন, ”কালুকে অত করে বললুম নাটকটা আমাকে একবার পড়তে দে, কিছুতেই দিল না।”
সত্যশেখর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ”আমাকেও নয়, যেন অর্থমন্ত্রীর বাজেট। একেবারে পার্লামেন্টে মানে স্টেজে করে দেখাবে। রামায়ণের দু’তিনটে ইন্টারেস্টিং ইনসিডেন্ট নাকি ওর নাটকে থাকবে।”
রাজশেখর বললেন, ”তা হলেই হবে। দেখবে তো স্কুলের মেয়েরা, ওরা যাতে মজা পায় তেমন ঘটনা থাকলেই হল। এ ব্যাপারে সেরা কিন্তু হচ্ছে হনুমান। স্টেজে একটা ল্যাজওলা হনুমান ছেড়ে দে, দেখবি নাটক জমে গেছে।”
ধূপছায়া প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, ”দাদু, আমরা একজনকে পেয়ে গেছি, রুকমিনি তলওয়ালকর। একেবারে আইডিয়াল হনুমান, বেঁটেখাটো, গাট্টাগোট্টা, দারুণ ফিট। ও রাজি হনুমান হতে।”
সত্যশেখর কৌতূহলী হয়ে বলল, ”কী বললে, তলওয়ালকর? মলয়া যখন প্রেসিডেন্সিতে পড়ত তখন ওর সঙ্গে পড়ত ভারতী বোস। পরে এক জার্নালিস্টকে বিয়ে করে, নাম বিনায়ক তলওয়ালকর। আমি দু’জনকেই চিনি, মলুই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। বিনায়কও বেঁটে, গাট্টাগোট্টা, একসময় ওয়েটলিফটিং করত। এই রুকমিনি বোধহয় ভারতীরই মেয়ে, জিজ্ঞেস করিস তো।”
কলাবতী বলল, ”রুকুর একটাই দুখ্যু, তার লাফ দেখাবার কোনও সুযোগ থাকছে না নাটকে।”
”না, না, এটা ঘোরতর অন্যায় হবে, বাল্মীকিকেও অপমান করা হবে যদি হনুমান লাফিয়ে সাগর পার না হয়।” সত্যশেখর প্রায় হাতজোড় করেই ফেলেছিল, ”ভেবে দ্যাখ রামায়ণের ওটা একটা টার্নিং পয়েন্ট, রাহুল দ্রাবিড়ের আউট হওয়ার মতো। এটা বাদ দিলে বলব তোর ড্রামাটিক সেন্স নেই। আরে হনুমানই তো প্রথম কম্যান্ডো অ্যাটাক করে লঙ্কায়। আগুন লাগিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দেয়।”
ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে কলাবতী বলল, ”কিন্তু কাকা, পক প্রণালী পেরোবার মতো লাফ কি রুকু দিতে পারবে? বড়জোর আট—দশ ফুট পারবে, তাতে কি চলবে?”
”বলিস কী, আট—দ—অ—শ ফুট দারুণ চলবে, পাঁচ হাত হলেও চলবে, তবে স্পোর্টসের লংজাম্প করার মতো নয়। স্টেজের এপাশ থেকে দৌড়ে এসে দারা সিংয়ের মতো ‘জয় শ্রীরামজি’ বলে দু’হাত তুলে আকাশে ওড়ার মতো একটা লাফ দিয়ে ওপাশের উইংসের বাইরে গিয়ে পড়বে।”
ধুপু আঁতকে উঠল, ”সব্বোনাশ, তা হলে তো হাড়গোড় ভেঙে যাবে।”
”আমি ওমনি—ওমনি হাইকোর্টের উকিল হইনি ধুপু। অবশ্য অনেক পণ্ডিত—ডক্টরেট মনে করে, আমার মাথার মধ্যে গুবরে পোকার বাসা ছাড়া আর কিছুই নেই।”
কলাবতী ফিসফিস করে ধুপুকে বলল, ”ডক্টরেট মানে বড়দি।”
‘কালু, স্টেজ তৈরি করবে যে ডেকরেটর তাকে বলবি উইংসের ওদিকে, মানে যেদিকে হনুমান ঝাঁপ দেবে, প্যান্ডেল তৈরির কাপড় এনতার যেন ডাঁই করে রেখে দেয়। রুকু উড়ে গিয়ে তার উপর পড়বে। সেই সময় মিউজিক মানে ঝাঁঝর ঝম করে উঠবে। ভাল কথা, তোর মিউজিক হ্যান্ড থাকবে তো?”
কলাবতী বিপন্ন চোখে তাকাল ধূপছায়ার দিকে। নাটকের এই দিক অর্থাৎ আবহসঙ্গীতের কথা তো সে ভাবেনি।
রাজশেখর এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন। বললেন, ”কালু ঘাবড়াসনি। খুঁজে দ্যাখ, স্কুলে অনেক মেয়ে নানারকম বাজনা শেখে—গিটার, বেহালা, সেতার, বাঁশি হারমোনিয়াম তো আছেই, তবলা ঢোলও এখন মেয়েরা শিখছে। এসব নাটকে মিউজিকের একটা বড় ভূমিকা থাকে।”
”ধূপু, তোর কাজ বেড়ে গেল।” কলাবতী অসহায় স্বরে বলল, ”দাদু, আমি তো নাট্যকার আর নির্দেশক। বাকি যা কিছু জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সব এই ধুপুর ঘাড়ে। সব ওকে সামলাতে হচ্ছে।”
ধূপছায়া গম্ভীর হয়ে বলল, ”আমাকে এখন সামলাতে হবে বড়দি আর ব্রততীদিকে। কালু, তোকে বলে দিচ্ছি এত কম টাকার বাজেটে পাড়ার বাচ্চচাদের নাটকও করা যায় না। লাইট, মেকআপ, মিউজিক এগুলো তো মিনিমাম দরকার…”
ধুপুকে থামিয়ে সত্যশেখর বলল, ”এগুলোর খরচ দেবে না, তার মানে যতটা না দিলে নয় তাই দেবে। তোমাদের বড়দিকে তো চিনি, হাড়কেপ্পন। তোদের রিহার্সালে পাঁচটাকা শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।”
”হ্যাঁ। একজন গার্জেন নাকি বড়দিকে কমপ্লেন করে বলেছেন, দশ টাকায় তো দশ মুঠো চানাচুরও হবে না।”
”দশ মুঠো!” সত্যশেখর আকাশ থেকে যেন পড়ল, ”আমি তো বলেছি পাঁচ মুঠো, অবশ্য আমার হাতের মুঠো। তবে মেকআপ, ড্রেস একটা প্রধান ব্যাপার মাইথোলজিক্যাল নাটকে, আমার এক ক্লায়েন্ট আছে পীতাম্বর অপেরার মালিক পীতাম্বর ঢোল। ওকে বলে দোব তোদের সাজিয়ে দেবে, পয়সা—টয়সা নেবে না। লাইটের কি খুব দরকার হবে?”
কলাবতী বলল, ”না কাকা, তোমাকে ভাবতে হবে না, ফাংশনে যারা আলো দেবে তাদেরই বলে দোব স্টেজ অন্ধকার করে দেওয়া, আলো বাড়ানো—কমানো আর একটা জোরালো আলো মুখে ফেলার ব্যবস্থা যেন করে।”
