কলাবতী বলল, ”আমাদের নাটকে হনুমান থাকবে, তুমি করবে হনুমান?”
”লাফিয়ে সাগর পার হবে?” রুকমিনি পালটা প্রশ্ন করল, ”আমি কিন্তু লাফাতে পারি?”
ধূপছায়া বলল, ”কতটা পার?”
”দেখবে?” এই বলে রুকমিনি নিমগাছতলা থেকে দশ—বারো হাত হেঁটে গেল। তারপর ঠোঁট কামড়ে এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো ছুটে এসে জোড়পায়ে লাফ দিয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ল। সেখানে যত মেয়ে ছিল অবাক হয়ে তারা রুকমিনির দিকে তাকাল। জমিটা শক্ত। রুকমিনির লেগেছে। কলাবতী ছুটে গিয়ে হাত ধরে টেনে তুলল। স্কার্টের ধুলো ঝাড়তে—ঝাড়তে রুকমিনি একগাল হেসে বলল, ”দেখলে?”
”দেখলুম।” কলাবতী বলল, ”রুকু, আমার নাটকে কিন্তু সাগর লাফিয়ে পার হবে না হনুমান, তা করতে হলে নাটকটা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমাকে মাত্র একঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে।” রুকমিনির মুখ ক্রমশ ম্লান হয়ে যেতে দেখে কলাবতী বলল, ”না—ই বা লাফাল, অনেক মজার—মজার কথা বলতে আর কাণ্ড করতে তো হনুমান পারে। পারে না ধুপু?”
ধূপছায়া সঙ্গে—সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, ”অবশ্যই পারে। হনুমানের জন্য কালু স্পেশ্যাল অ্যাকশন আর ডায়ালগ দেবে। রুকু, তুমি একটুও দুখ্যু কোরো না। তা হলে তুমি রাজি?
রুকমিনি নিমরাজি ভঙ্গিতে মাথায় হেলিয়ে দিতেই কলাবতী বলল, ”এই তো হনুমানের মতো লক্ষ্মী মেয়ে। হনুমানকে যা করতে বলা হত, মুখটি বুজে সেই কাজটি করত।”
”আমার মুখে কিন্তু মুখোশ দিতে হবে আর একটা ল্যাজ। টিভিতে ঠিক যে রকম দেখেছি।”
”অবশ্যই। এবার তুমি ক্লাসে যাও। রিহার্সালের সময় তোমাকে জানাব। আর একটা কথা, তুমি যে হনুমান করছ এ কথা কাউকে কিন্তু বলবে না।”
রুকমিনি চলে যেতে কলাবতী বলল, ”চমৎকার মেয়ে। দেখবি ও দারুণ হনুমান করবে।”
”সে ওর লাফ দেওয়া দেখেই বুঝেছি। ওই চেহারা নিয়ে যেভাবে ছুটে এসে লাফাল। কোনও জড়তা নেই!” ধূপছায়া মুগ্ধ কণ্ঠে বলল।
”কতটা লাফাল বল তো?”
”ছ—সাত ফুট তো হবেই, ওই ওজন নিয়ে! বাপস!”
”তা হলে রোববার আসছিস। যতটা লেখা হয়েছে, তোকে পড়ে শোনাব।”
রবিবারের মধ্যেই কলাবতী নাটকের শেষটুকু বাদে সবটাই লিখে ফেলল। পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো একটা ফ্ল্যাট ফাইলে গেঁথে রেখেছে ধুপুকে পড়াবার জন্য। সত্যশেখর রবিবার আড্ডা দিতে যায় বন্ধুর বাড়িতে। বেলা বারোটা নাগাদ সে ফিরছে, হাতে একটা পলিথিন থলি। ধূপছায়া তখন ফটক দিয়ে ঢুকছে। দু’জনের দেখা হয়ে গেল।
”এই যে ধুপু, এত দেরি করে এলে যে? ভালই হল, আজ তোমাকে কাঁকড়ার ঝাল খাওয়াব। ঝাল খাও তো?” উদ্বিগ্ন চোখে সত্যশেখর তাকাল এবং আশ্বস্ত হল ‘খাই এবং ভালই খাই’ শুনে, তারপর সে বকবক করতে—করতে বাড়ির সদর দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
”এই পলিথিন থলিটা পকেটে নিয়ে রোববারে বেরোই। রোববারে গাড়ি চড়ি না, হাঁটি, রাস্তায় কত রকমের যে জিনিস পাওয়া যায়। এই দ্যাখো না, আজ একজন ঝুড়িতে কাঁকড়া নিয়ে বসেছিল মানিকতলা ব্রিজের উপর। কুড়ি টাকা জোড়া। কতদিন যে খাই না। নিলুম গোটাদশেক, লোকটার কাছে এই ক’টাই ছিল।” বাড়ির ভিতর ঢুকে সে মুরারিকে দেখে থলিটা তার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ”অপুর মাকে দাও আর বোলো কড়া ঝাল দিয়ে যেন বানায়। প্রথমে গজগজ করবে, তুমি বলে দিও ধুপুকে কথা দিয়েছিল কালু তোমার হাতে রাঁধা কাঁকড়া খাওয়াবে। সেই জন্য ছোটকত্তা কাঁকড়া খুঁজতে খুঁজতে সেই হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত—না টালিগঞ্জ পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কালুদি কথা দিয়েছিল বলেই তো, তাই না ধুপু?”
হাসি চেপে ধুপু ঘাড় হেলিয়ে বলল, ”হ্যাঁ, কালু বলেছিলই তো।”
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে—উঠতে সত্যশেখর বলল, ”কালুর নাম করলেই জোঁকের মুখে নুন, অপুর মা স্পিকটি নট। ভীষণ ভালবাসে। দ্যাখো, আধঘণ্টার মধ্যে কাঁকড়া তৈরি হয়ে যাবে।”
দোতলায় চওড়া দরদালানটাই বসার ঘর। সোফা, ইজিচেয়ার আর টেবলে সাজানো। কলাবতী টিভি দেখছিল। ধুপুকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, ”আর একটু আগে এলি না কেন, কুইজের প্রোগ্রামটা শেষ হয়ে গেল,” রেফ্রিজারেটর থেকে দু’লিটারের সফট ড্রিঙ্কসের বোতল বের করে দুটো গ্লাসে ঢেলে বোতলটা সত্যশেখরের হাতে দিয়ে বলল, ”পিসি কখন রান্না শেষ করে বসে আছে তোকে পোস্ত চিংড়ি খাওয়াবে বলে। আমি শুধু বলেছি, পিসি ধুপু চিংড়ি ভালবাসে। বাস সক্কালবেলায় মুরারিদাকে পাঠাল বাজারে। তারপর যা শুরু হল, যেন এটা যজ্ঞিবাড়ি।”
শুনতে—শুনতে সত্যশেখরের চোখের পাতা পড়া বন্ধ। ধুপুর বুকের মধ্যে শুরু হল ধুকপুকুনি। শুকনো গলায় সত্যশেখর বলল, ”কালু, তুই ঠিক জানিস ধুপু চিংড়িই ভালবাসে, কাঁকড়া নয়? কিন্তু আমি যে কাঁকড়া নিয়ে এলুম। এখন কী হবে।”
”কী আর হবে, দুটোর কোনওটাই মাছ নয়। ধুপু পোস্ত চিংড়িটা খাবে, আর তুমি কাঁকড়াটা।”
একতলা থেকে উঠে এল মুরারি। বলল, ”ছোটকত্তা, অপুর মা জানতে চাইল সব’ক—টাই কি রাঁধবে?”
গম্ভীর স্বরে সত্যশেখর বলল, ”একটাও নয়। অ্যালার্জি আছে ধুপুর, দিনেরবেলায় কাঁকড়া খেলে ওর গায়ে র্যাশ বেরোয়, গা চুলকোয়। কালু এটা জানত না, আমিও নয়, আর ধুপুও ভুলে গেছল বলতে। ওকে বলো সবক’টা তুলে রাখতে।”
মুরারি চলে যাওয়ার পর কলাবতী বলল, ”বেশ সামলে দিলে তো!”
