”কলাবতী, দাঁড়িয়ে কেন? নাটকের খবর কী? আমরা কিন্তু অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি। কী লেখো দেখার জন্য। আমাদের মেয়ের লেখা, আমাদের মেয়েরাই অভিনেতা—অভিনেত্রী, এই স্কুলের পঁচাত্তর বছরের ইতিহাসে এই প্রথম।”
”ব্রততীদি, অভিনেতা কেউ নেই, সবাই অভিনেত্রী।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা বটে।” ব্রততী ঘড়ি দেখল। ”যাই।” দু’পা গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ”আর শোনো, তোমাদের রিহার্সালের ডেলি অ্যালাউন্সটা বড়দি বলেছেন পনেরো টাকা করে দিতে। কে এক গার্জেন কমপ্লেন করে বলেছেন দশ টাকায় তো দশ মুঠো চানাচুরও হবে না। তুমি কী বলো?”
ঢোঁক গিলে কলাবতী, ব্রততী যাতে অপ্রতিভ না হয়, বলল, ”ছোট—ছোট মুঠো হলে কুড়ি মুঠো তো হবেই। আর যাদের নেব তাদের হাতের চেটো আগে দেখে নেব।”
”গুড। রিহার্সাল শুরু করার আগের দিন আমাকে জানিও, টাকা দিয়ে দোব। তবে ঝালমুড়ি কি ফুচকা খাওয়া চলবে না। গিরিকে টাকা দেবে, ও কলা এনে রেখে দেবে। কলায় ভিটামিন আছে, পুষ্টিকর জিনিস।”
ব্রততী চলে যাওয়ার পর কলাবতীরই ক্লাসের চিত্রা বসু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, তার সঙ্গে বিনতা আর চারুশীলাও।
চিত্রা বলল, ”লক্ষ্মণের শক্তিশেলে কিন্তু অনেক গান আছে। কে গাইবে?”
কলাবতী বলল, ”আমার সময় বাঁধা, একঘণ্টা। আমার নাটকে গান থাকবে না।”
ঠোঁট মুচড়ে চারুশীলা বলল, ”গান ছাড়া লক্ষ্মণের শক্তিশেল, তবেই হয়েছে!”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিনতা বলল, ”এ তো রামকে বাদ দিয়ে রামায়ণ। কেমন হবে কে জানে।”
ওরা তিনজন চলে গেল। কলাবতী ঠোঁট কামড়ে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল। এই তিনজন মিলে একটা দল। পাশাপাশি বসে শুধু নিজেদের মধ্যে ফিসফাস গুজগুজ করে। একসঙ্গে স্কুলে আসে, ছুটির পর একসঙ্গে বেরোয়। কলাবতীকে ওরা দেখতে পারে না যেহেতু সে সবার প্রিয়, বিশেষ করে বড়দির। প্রাক্তন জমিদারবাড়ির নাতনি অথচ একফোঁটাও বড়লোকি চাল নেই। ওই তিনজন বলে, এটাই ওর বড়লোকি চাল। শুনে কলাবতী শুধু হেসেছে। কিন্তু এখন ওদের কথা শুনে মনে—মনে রেগে উঠল। কেন না, খোঁচাটা তার বোধ আর বুদ্ধিকে দেওয়া হয়েছে।
রাগতে—রাগতে সে দেখল ধূপছায়া আসছে, কিন্তু ধুপুর পিছনে ওটা কে?
”দেরি হয়ে গেল, কী করব ইস্ত্রিওলাকে সকালে শাড়িটা দিয়েছিলুম, সাড়ে ন’টার সময়ও দেখি শাড়িটা ফেলে রেখেছে। ইস্ত্রি করিয়ে কাপড় পরে আসতে আসতে…”
ধূপছায়া বলতে—বলতে থেমে গিয়ে কলাবতীর দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে তাকাল। স্কুল ড্রেস পরা একটা মেয়ে, পিঠে বইয়ের ব্যাগ। উচ্চচতা সাড়ে চার ফুটের একটু বেশি, ওজন পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ কেজি, গলাটা আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না, যাকে বলে ঘাড়ে—গর্দানে। কিন্তু হাঁটছে দু’হাত ফাঁক করে দোলাতে—দোলাতে, গটমট করে এবং বেশ দ্রুত। দেখেই বোঝা যায় শরীরটা অত্যন্ত ফিট, তা না হলে অত ওজন নিয়ে অমন চটপটে গতিতে হাঁটা যায় না। মেয়েটির জ্বলজ্বলে চোখের থেকে ঠিকরোচ্ছে মজা পাওয়ার ফুলকি! সারা মুখে হাসিখুশির আভা মাখানো। দেখলেই ভাল লেগে যায়। কলাবতীরও লাগল।
”কী দেখছিস রে কালু?”
”আমার হনুমানকে। খোঁজ নে কোন ক্লাসে পড়ে।”
ধূপছায়া চেঁচিয়ে উঠল। ”এই—এই, এই মেয়েটা।”
মেয়েটি থমকে পড়ল। ”আমায় বলছ?”
”হ্যাঁ, তোমায়। কোন ক্লাস, নাম কী?” ধূপছায়া এগিয়ে গেল, কলাবতীও।
”সেভেন—এ—ওয়ান। রুকমিনি তলওয়ালকর। আমাকে সবাই রুকু বলে ডাকে।”
কলাবতী বলল, ”দেরি হয়ে যাচ্ছে তোমার, ক্লাসে যাও। তোমার সঙ্গে টিফিনে কথা বলব, নিমগাছতলায় এসো, কেমন।”
রুকমিনি একটু অবাকই হল। উঁচু ক্লাসের দুটো দিদি হঠাৎ তাকে গেটের কাছে এমনভাবে ধরল, যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
‘কালু, এই তোর হনুমান! এমন সুন্দর মেয়েটাকে হনুমান বানাতে চাস?” ধূপছায়ার স্বরে ক্ষোভ আর অনুযোগ।
”ওর চেহারাটা খুব ফানি, মজাদার। হনুমানও তো তাই ছিল। এক লাফে সাগর ডিঙিয়ে যাওয়া, লঙ্কায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া, বিশল্যকরণী আনতে গিয়ে গন্ধমাদন পাহাড়ের চুড়োটাই ভেঙে নিয়ে এল। এই সব মজা না থাকলে কি নাটক জমে?”
আতঙ্কিত চোখে ধূপছায়া বলল, ”তোর মতলব কী বল তো? হনুমানের লাফ, লঙ্কায় আগুন, গন্ধমাদন নিয়ে উড়ে আসা—এসব দেখাতে চাস?”
”পাগল! আগুন? ওরে বাব্বা, বড়দি তা হলে হার্টফেল করবেন। এসব দেখাতে পারত ষাট—সত্তর বছর আগের স্টার থিয়েটার। এসবে যা খরচ পড়বে, আমাদের স্কুল তো তা করতে পারবে না, সুতরাং ওসব চিন্তা ছেড়ে দিয়ে যা করা যেতে পারে সেটা নিয়েই ভাবা ভাল। এই রুকমিনিকে দেখে একটা আইডিয়া মাথায় এসেছে। ধুপু, রোববার সকালে আমাদের বাড়িতে আয়, দুপুরে ভাত খাবি।”
টিফিনের সময় রুকমিনি এল নিমগাছতলায়। অপেক্ষা করছিল কলাবতী আর ধূপছায়া।
”রুকু, আমরা নাটক করব প্ল্যাটিনাম জুবিলিতে, তুমি রামায়ণ পড়েছ?” কলাবতী ভূমিকা না করে সোজা বিষয়ে চলে এল।
”হ্যাঁ, ছোটদের রামায়ণ। টিভি—তেও দেখেছি।”
ধূপছায়া উৎসাহিত হয়ে বলল, ”বাঃ তা হলে তো কালুর কাজটা সহজ হয়ে গেল। রুকু তো তা হলে হনুমানকে দেখে ফেলেছে। আচ্ছা, হনুমানকে তোমার কেমন লাগে?”
”খুব ভাল। গায়েও ভীষণ জোর। কীরকম লাফ দিয়ে উড়ে গিয়ে লঙ্কায় পড়ল!” রুকমিনির চোখ গোল হয়ে ঝকমক করে উঠল।
