কলাবতী চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছে, তখনই ট্রে হাতে অপুর মা, তার পিছনে মুরারি খাওয়ার ঘরে ঢুকল। ট্রে থেকে চিনামাটির বৌলটা টেবলে রেখে অপুর মা বলল, ”এই হল আমার খুল্লা খুল্লা ঘুগনি। কত্তাবাবা, আপনি আগে খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে।”
মুরারি দিস্তা করা রুটির প্লেট টেবলে রেখে বলল, ”এই খুল্লা খুল্লা ঘুগনি অপুর মা অদ্ধেক টিভি থেকে আর অদ্ধেক ওর বাবার কাছ থেকে শেখা রান্না মিশিয়ে নতুন একটা জিনিস বানিয়েছে।”
রাজশেখর বললেন, ”তুই খেয়ে দেখেছিস?”
”খানিকটা চাখতে দিয়েছিল। গন্ধটা শুঁকুন, টেস করে দেখুন।” মুরারির জিভে উৎসাহ ঝরছে। সত্যশেখর ইতিমধ্যেই চোখ বুজিয়ে ফেলেছে। কলাবতী জানে, অত্যন্ত উপাদেয় কিছু খাদ্য খাওয়ার আগে কাকা চোখ বুজে খাদ্যটিকে ঈশ্বরজ্ঞানে ধ্যান করে আধমিনিট (‘বুঝলি কালু, এতে জিভের প্রত্যেকটা কোষ জাগ্রত হয়ে চনমন করে ওঠে’), তারপর গন্ধ শুঁকে চোখ খোলে।
অপুর মা ইতিমধ্যে বাটিতে তার ‘খুল্লা খুল্লা’ তুলে রাজশেখরের সামনে রেখেছে।
”বাবা গন্ধটা কেমন খুলেছে বলো?” সত্যশেখরের নাক ফুলে উঠেছে।
রাজশেখর একচামচ মুখে দিলেন। কপালে ভাঁজ পড়ল। অপুর মা উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে। কপালের ভাঁজ সমান হল। ”এ তো দ্রৌপদীর হাতে রাঁধা ঘুগনি রে সতু, খেয়ে দ্যাখ।” রাজশেখর এই বলে রুটি ছিঁড়লেন।
দশ মিনিট পর শূন্য বৌলটার দিকে তাকিয়ে সত্যশেখর বলল, ”একটু তাড়াতাড়িই মনে হচ্ছে খেলুম।” তারপর গলা নামিয়ে বলল, ”অপুর মা কি আমায় ঘটোৎকচ মনে করছে?”
”না। বরং তোমার খাওয়া দেখে খুশিই হচ্ছে। রান্না নিমেষে উড়ে গেলে রাঁধুনিরা খুশি হয়, কাকা আমার নাটকে ঘটোৎকচকে আনব।”
”সে কী করে! রামায়ণে কিনা মহাভারতের ক্যারেকটার?” রাজশেখর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
”দাদু এটা হবে আধুনিক লক্ষ্মণের শক্তিশেল। পৌরাণিকে আর আধুনিকে মিলেমিশে একাক্কার হয়ে যাবে। চারিদিকে কত ঘটোৎকচ আর কুম্ভকর্ণ টিভিতে আর খবরের কাগজে কিলকিল করছে, তারই দু’টোকে নাটকে ছেড়ে দোব।” বলতে—বলতে সে আনমনা হয়ে আঙুল চাটতে শুরু করল।
তাই দেখে অপুর মা বলল, ‘কালুদি, আর একটু খাবে? এনে দোব?”
”আরও আছে নাকি?” সত্যশেখর অকালে ঘুম ভাঙানো কুম্ভকর্ণের মতো ধড়মড়িয়ে উঠে বলল, ”তা হলে আমাকে আর একটু।”
”আমাকেও।” রাজশেখর বললেন।
কলাবতী অন্যমনস্কের মতো উঠে বেসিনে হাত ধুয়ে ঘরে এসে সাদা ফুলস্ক্যাপ কাগজ নিয়ে টেবলে বসল। মাথা নামিয়ে একমনে লিখে যেতে থাকল। মনের মধ্যে ভেসে ওঠা কথাগুলো চেতনার তলে ডুবে যাওয়ার আগেই সে অক্ষরের জাল দিয়ে তাদের তুলে কাগজের উপর ধরে রাখতে চেয়ে কলমটাকে দ্রুত চালাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর অপুর মা এসে বলল, ”তোমার ফোন, ধূপু করেছে।”
”একমিনিট, ধরে থাকতে বলো।” মুখ না তুলে কলমের গতি বাড়িয়ে সে বাক্যটি সম্পূর্ণ করে বসার ঘরে এসে ফোন ধরল।
”বল।”
”আমার ক্লাস, আর নাইন—এ সেকশনে গিয়ে বললুম কে—কে অভিনয়ে করতে চাও। সবাই হাত তুলল। আমি চাই, আমি চাই, বলে চেঁচামেচি এমন জুড়ে দিল যে, মনে হল যেন পাঠশালায় লজেঞ্জস বিলোতে এসেছি। আমার ক্লাসে বিয়াল্লিশ আর নাইন—এ—তে ছেচল্লিশ মোট অষ্টআশি কিন্তু দরকার তো বানরসেনা সমেত বারো—তেরো জন। আমার ক্লাস থেকে রাবণ পেয়েছি, সঞ্চারী পাল, বেশ লম্বা, মোটা—মোটা হাত, গলাটাও অনেকটা হাড়ির মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে কথা বললে যেমন শোনায়, তেমনি। একজন বলল ক্লাস এইট—এ—তে একটা মেয়ে আছে, রবিনা নাম, রাবণের মতো লম্বা—চওড়া তবে খুব মিনেমিনে গলা, রামের জন্য মানাবে। ওকে বলে দেখব। বিভীষণ, সুগ্রীব ক্লাস নাইনে আছে, শুধু তোর ফর্দমতো হনুমানটাকে পাইনি এখনও। কাল স্কুলে আয়, তোকে রাম—রাবণ দেখাব।”
”ধূপু, মেঘনাদের কী হবে? খুঁজে বের কর। আর শোন, নাটকে থাকবে কুম্ভকর্ণ আর ঘটোৎকচ। দু’টো খুব রোগা মেয়ে বের কর।”
”কালু, ওরা তো রাক্ষস, ভয়ংকর বিরাট চেহারা!”
”সেকালের রাক্ষসরা একালে রোগা—প্যাংলা হয়ে গেছে। যদি তেমন চেহারার না পাওয়া যায় তো, তুই আর আমিই করব। কাল একটু তাড়াতাড়ি স্কুলে আয়, আমি গেটে তোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকব।”
ফোন রেখে কলাবতী ঘরে এসে দেখল, অপুর মা খাটের পাশে মেঝেয় বিছানা পেতে শোওয়ার তোড়জোড় করছে।
”কালুদি, শুয়ে পড়ো কাল ইশকুল আছে।”
”না পিসি, আমার পরীক্ষা সামনে, ভৌতবিজ্ঞানের কিছু তৈরি হয়নি, আজ রাতে এই চ্যাপ্টারটা শেষ করতেই হবে। তুমি ঘুমোও।”
”আবার পরীক্ষা? এই তো সেদিন একটা পরীক্ষা দিলে, আবার? ভূতটুত নিয়ে কি রাত্তিরে না পড়লেই নয়?”
হনুমান খুঁজে পাওয়া গেল
ধূপছায়ার অপেক্ষায় স্কুলগেটে দাঁড়িয়ে কলাবতী। মেয়েরা, শিক্ষিকারা স্কুলে ঢুকছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে দু’টো কথাও বলছে।
”কলাবতীদি তুমি নাকি নাটক লিখছ, জুবিলি ফাংশনের জন্য?”
”হ্যাঁ।”
”আমাকে একটা পার্ট দাও না, দেবে?”
”তুই কাঁদতে পারবি?”
”হ্যাঁ—অ্যা—অ্যা।” মাথাটা হেলিয়ে দিল মেয়েটি।
”ধূপছায়ার কাছে নাম দিয়ে আসিস। চিনিস তো ওকে?”
”হ্যাঁ—অ্যা—অ্যা।”
মেয়েটিকে দেখে কলাবতীর মনে হল, লক্ষ্মণ শক্তিশেলের আঘাতে মূর্চ্ছা যাওয়ার পর তাকে ঘিরে যে সব বানর কান্নাকাটি জুড়বে তাদের একজন হতে পারে।
