”ওমা, অনামিকা তো বেঁটে নয়। ও তো চার ফুট দশ ইঞ্চি। এই তোমার কাঁধের সমান।”
”অন্নপূর্ণাদি, আমি এখন যাই। অসীমাদির ক্লাস, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। লেখাটা হোক, তখন দেখা যাবে।”
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে কলাবতী লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে গেল।
কলাবতীর মাথায় এল আধুনিক শক্তিশেল
”কালু, নাটকের কোন অঙ্কে পৌঁছলি?” রাজশেখর খাওয়ার টেবলে জানতে চাইলেন।
”অঙ্ক একটাই। পরদা টেনে শুরু, পরদা টেনে শেষ। বড়দি বলে দিয়েছেন এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ করতে হবে। ওটাই শেষ প্রোগ্রাম।”
সত্যশেখর বলল, ”আধুনিক শক্তিশেল বলেছিলিস, মনে আছে? আধুনিক মানে এখনকার ব্যাপার। করবে তো স্কুলের মেয়েরা। সবারই এই প্রথম অভিনয়, তোরও। ভাল করে রিহার্সাল দিয়ে তৈরি না করালে কিন্তু গুবলেট হয়ে যাবে।”
”দাদু, আমি ভাবছি রিহার্সালটা স্কুল ছুটির পর আমাদের ছাদে করব।”
সত্যশেখর বলল, ”আমাদের ছাদে কেন? স্কুল থেকে এতদূর এসে করার চেয়ে স্কুলেরই একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে তো করা যায়। তোদের টিচার্স রুমটা তো বেশ বড়। তাছাড়া রিহার্সালের একটা খরচ আছে। সেটা তো স্কুলকেই দিতে হবে।”
”ব্রততীদি বলে দিয়েছেন প্রতিদিনের জন্য দশ টাকা। তার বেশি দরকার হলে নিজেরা চাঁদা তোলো।”
ভুরু কপালে তুলে সত্যশেখর বলল ”দ—অ—অ—শ টাকা, বলিস কী রে! বনধ ডাক, অবরোধ কর। অতগুলো মেয়ে, স্কুলের ছুটির পর খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করবে, তখন চেঁচিয়ে পার্ট বলবে? কালু, বলে রাখছি খাবার ব্যবস্থা কর, নয়তো দেখবি একটা—দুটো করে রোজ মেয়ে কমে যাবে। আচ্ছা, কখন থেকে বসে আছি অপুর মা তো খেতে—টেতে দিল না। ব্যাপার কী!”
মৃদু হেসে রাজশেখর বললেন, ”দুপুরে টিভি—তে রান্না শেখাচ্ছিল। অপুর মা আর মুরারি বসে—বসে দেখেছে। ‘বাদশাহি চানা গোস্ত কা খুল্লাম খুল্লা’। দেখে অপুর মা বলল ‘হেঃ, এই রান্নার জন্য এত বাসনকোসন, কায়দাকানুন আর বকবক? মুরারিদা বাজার থেকে মাংস, টকদই, কিসমিস, গরম মশলা আর কাবলে ছোলা এনে দাও তো। ওর চেয়ে ভাল খুল্লা খুল্লা ঘুগনি আমি রেঁধে দোব।’ মুরারি বাজার থেকে ফিরল সন্ধেবেলায়। বাগমারিতে বিকেলে বাস চাপা, তারপর বাসে আগুন, রাস্তা অবরোধ, পুলিশ, লাঠি আর গুলিও। মুরারি আটকে পড়েছিল, তাই রাঁধতে দেরি হচ্ছে, একটু অপেক্ষা কর। কালু ততক্ষণে কাকাকে কিছু খেতে দে। কোর্ট থেকে ফিরে তো খানকয়েক পরোটা আর আলুর দম ছাড়া আর কিছু পেটে পড়েনি।”
সত্যশেখর ব্যস্ত হয়ে বলল, ”না, না, এখন আমাকে কিছু খেতে দিতে হবে না, কালু তুই বোস। বরং বল তোর আধুনিক নাটকে কী কী থাকবে? রামায়ণের গল্প, রাম—রাবণের একটা যুদ্ধু দেখিয়ে দে। মালোপাড়ায় শেতলাপুজোয় যাত্রা হত। মুরারির সঙ্গে চুপিচুপি একবার দেখতে গেছলুম। বর্গী ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে জমিদার ভৈরব রায়ের সে কী তরোয়ালের লড়াই। বাঁয়াটা ড্রামের মতো বাজছে, ক্ল্যারিওনেটে মার্চের সুর আর ঝাঁঝরটা ঝম করে উঠছে মাঝে—মাঝে। এই দ্যাখ, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।” সত্যশেখর বাঁ হাত বাড়িয়ে দিল কলাবতীর দিকে। ”তুই বরং একটা তরোয়ালের লড়াই রাখ। লক্ষ্মণ ভার্সাস রাবণ কিংবা কুম্ভকর্ণের সঙ্গে সুগ্রীবের।”
”কাকা, রামায়ণে মেজর লড়াইগুলো হয়েছিল তির—ধনুকে আর শক্তিশেলটা তরোয়াল নয়। দাদু, পৌরাণিক কাহিনীতে গদা আর তিরই তো প্রধান অস্ত্র ছিল?”
”তা বলতে পারিস। তবে সতু যা বলল, রোমহর্ষক কিছু রাখলে নাটক জমে যায়। বছর ষাটেক আগে আমার ছোটবেলায় স্টার থিয়েটারে নাটক দেখেছি পৌরাণিক কাহিনি। তাতে শনির দৃষ্টিতে ভস করে গণেশের মুণ্ডু ভস্ম হয়ে যাওয়া দেখায়। স্টেজের পিছনে একটা পরদায় ফুটে উঠল বিশাল দুটো চোখ আর সঙ্গে সঙ্গে গণেশের মুণ্ডুটা ভ্যানিশ হয়ে ধোঁয়া উঠল। পার্বতী তো কান্নাকাটি শুরু করলেন। বিষ্ণু তখন স্টেজের মধ্যিখান থেকে সুদর্শন চক্রটা ছুড়লেন, সেটাই উইংস দিয়ে উড়ে গেল। তারপর একটা হাতির মাথা ভেসে এল। বিষ্ণু সেটাই শিশু গণেশের গলায় জুড়ে দিলেন।”
কলাবতী অবাক হয়ে বলল, ”দাদু, এ তো ম্যাজিক!”
রাজশেখর বললেন, ”আমার এখনও মনে আছে সমুদ্র মন্থন দেখেছিলুম। ঠিক ওইভাবে স্টেজের পিছনে পরদায় দড়ির মতো বাসুকিকে মন্দার পর্বতে পেঁচিয়ে টানাটানি করায় তার মুখ থেকে বেরোল কালকূট বিষ। তার গন্ধে ত্রিলোক মূর্ছিত হলে ব্রহ্মা অনুরোধ করলেন মহাদেবকে সেই বিষ পান করার জন্য। তারপর কী দেখলুম জানিস? স্টেজ অন্ধকার হয়ে গেল আর মহাদেব নিচু হয়ে আঁজলা ভরে সেই বিষ তুললেন, দেখলুম তাঁর দু’হাতের আঁজলার মধ্যে দপদপ করছে একটা নীল আলো। সেটা মুখে দিলেন, গলাটা নীল হয়ে গেল। বিষটা ওখানেই রইল, তার মানে নীল আলোটা গলায় আটকে রইল। মহাদেব হলেন নীলকণ্ঠ। সে যে কী অবাক কাণ্ড, থ্রিলিং! এইরকম কিছু যদি তোর আধুনিক নাটকে রাখতে পারিস, তা হলে লোকে তোকে মনে রাখবে। তবে এসব দেখাতে হলে টাকার দরকার। পাবলিক স্টেজে ষাট—পঁয়ষটি বছর আগে হাউসফুল হয়ে যেত প্রতি শো—এ। গ্রাম থেকে দল বেঁধে লোকেরা আসত থিয়েটার দেখতে, থিয়েটারের তখন টাকা ছিল।” রাজশেখরের কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
সত্যশেখর বলল, ”রিহার্সালের জন্য দশ টাকা যেখানে বরাদ্দ সেখানে আর কী আশা করো, কালু কি সমুদ্র মন্থনের মতো হনুমানের সমুদ্র লঙ্ঘন দেখাতে পারবে? কালু একবার দ্যাখ না, অপুর মা—র খুল্লা খুল্লা ঘুগনির কতদূর।”
