রাজশেখরকে যেন ভূতে পেয়েছে। তিনি ষাট বছর আগে ফিরে গেছেন তাঁর কৈশোর জীবনে। সারাঘর গমগম করে উঠেছিল তাঁর গম্ভীর স্বরে। দরজায় এসে দাঁড়াল অপুর মা।
”কালুদি, কাল ইশকুল আছে, শোবে এসো।”
”কালু, শক্তিশেলের আগের ঘটনা জানা দরকার নাটক লেখার জন্য। কেন রাবণ শেল ছুড়েছিল সেটা পাবি এই মেঘনাদবধে। এখন শুতে যা।”
অ্যাক্টর সন্ধানে কলাবতী ও ধূপছায়া
ক্লাস টেন এ—ওয়ান সেকশনের দরজায় দাঁড়িয়ে কলাবতী অপেক্ষা করছিল ধূপছায়ার জন্য। ঠিক দশটা বাজতে দশে পিঠে বইয়ের বস্তা নিয়ে তাকে আসতে দেখে কলাবতী এগিয়ে গেল।
”পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে আছি তোর জন্য, কথা আছে। এখন কার ক্লাস?”
”আরতিদির। জিওগ্রাফি!”
”ওঁকে তো বড়দি ভূগোল নিয়ে কী যেন ডিমনস্ট্রেট করে দেখাতে বলেছেন?”
”দেখাবেন নাকি চাঁদে মানুষের হাঁটা আর মাটির তলা থেকে কীভাবে কয়লা তোলা হয়। বি—টু থেকে সাত—আট জন লেগে পড়েছে। ল্যাবরেটরিতে টিফিনের সময় ওরা আরতিদির সঙ্গে কাজ শুরু করে দিয়েছে। কেমিস্ট্রির আর ফিজিক্সের কী সব এক্সপেরিমেন্ট দেখানো হবে। কিন্তু আমাদের নাটকের কদ্দূর?”
”অনেক দূর, নাটক তো হবে, কিন্তু অ্যাকটিং করবে কারা? সেটা আগে ঠিক করতে হবে তো? তুই ঠিক করার কাজটা নে।” কলাবতী হাতের খাতাটা খুলে একটা কাগজ বের করে ধূপছায়ার হাতে দিয়ে বলল, ”এতে সব লিখে দিয়েছি। চরিত্রের নাম আর কেমন মেয়ে চাই। তুই পড়ে নে আর টিফিনে কথা হবে।” কলাবতী এই বলে দ্রুত নিজের ক্লাসে চলে গেল।
টিফিনে ওরা দু’জন বসল কম্পাউন্ডে নিমগাছের নীচে সিমেন্টের বেদিতে। ধূপছায়ার হাতে কলাবতীর দেওয়া কাগজটা।
”রাম পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি, ছিপছিপে, কণ্ঠস্বর মিষ্টি এবং ভরাট, একে কোথায় পাব এই স্কুলে?” ধূপছায়া অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। ”ছিপছিপে তো সবাই, কিন্তু ভরাট গলা আর পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি আমাদের ক্লাসে একটাও নেই। সব আমার মতো পাঁচ—দুই আর মিহি গলা, তুই রামটাকে একটু অন্যরকম করে দে, আর নয়তো নিজে কর।”
”আমি লিখব, ডিরেকশন দোব আবার অভিনয়ও করব, অত হয় না।”
”কেন হয় না? উৎপল দত্ত কি করতেন না?”
”সে উনি পারতেন।” কয়েক সেকেন্ড ভেবে কলাবতী বলল, ”রাম শেষ পর্যন্ত না পাওয়া গেলে তখন ভেবে দেখা যাবে। লক্ষ্মণকে খুঁজে বের কর। আর বাকি সব বোধহয় ক্লাসেই পেয়ে যাবি। একটা ঢ্যাঙা আছে তোদের ক্লাসে, ওকে বল।”
”সুগ্রীবের জন্য?”
”না, বিভীষণের জন্য। আমার নাটক হবে মেঘনাদবধ কাব্য অবলম্বনে। কীভাবে বধ হল সেটা জানিস? তবে শোন, লক্ষ্মণকে নিয়ে বিভীষণ চুপিচুপি পথ দেখিয়ে নিকুম্ভিলা উপবনে যাবে। সেখানে মেঘনাদ তখন যজ্ঞের জন্য মন্দিরে সবেমাত্র বসেছে। তার আগে একটা ব্যাপার তোর জেনে রাখা দরকার, মেঘনাদের নাম ইন্দ্রজিৎ হল কেন? জানিস কেন হল?”
”ইন্দ্রকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছিল বলে।” ধূপছায়া বুঝিয়ে দিল রামায়ণ তার পড়া আছে।
”হারিয়ে দিয়ে ইন্দ্রজিৎ কী করল তারপর?” উত্তরের অপেক্ষা না করে কলাবতী নিজেই বলল, ”ইন্দ্রকে বেঁধে লঙ্কায় নিয়ে আসে। দেবরাজের এরকম হেনস্থা দেখে দেবতারা ব্রহ্মাকে লিডার করে একটা ডেলিগেশন নিয়ে ইন্দ্রের মুক্তিভিক্ষা করতে আসে। ইন্দ্রজিৎ বলল আমাকে অমরত্ব বর দাও, তবেই ইন্দ্রকে ছাড়ব। ব্রহ্মা তাতে রাজি নন। বললেন অন্য বর চাও। তখন ইন্দ্রজিৎ বলল, যখন আমি অগ্নির পুজো করে যুদ্ধ করতে যাব তখন আমার জন্য অগ্নি থেকে ঘোড়াসমেত রথ উঠে আসবে, সেই রথে যতক্ষণ থাকব ততক্ষণ আমি যেন অমর হই। অগ্নিপুজোর জপ আর হোম আনফিনিশড রেখে যুদ্ধে গেলে তবেই আমাকে মারা যাবে, রাজি? ব্রহ্মা আর কী করেন, ইন্দ্রকে ছাড়িয়ে আনার জন্য তথাস্তু বলে তাতেই রাজি হয়ে গেলেন।”
”কী অবাস্তব আর গাঁজাখুরি ব্যাপার,” ধূপছায়া হেসে উঠল।
”আর হ্যারি পটারে এসব থাকলেই সেটা হয় দারুণ কল্পনা।” কলাবতীর স্বরে চাপা ব্যঙ্গ।
”তারপর কী হল বল।” ধূপছায়া তর্কে আর গেল না।
”কী আর হবে। মেঘনাদের আর যজ্ঞ করা হল না। অস্ত্র হাতে তো আর পুজো করতে আসেনি, তাই নিরস্ত্র লোককে লক্ষ্মণ খুন করে দিল। ছেলের এভাবে মৃত্যু হওয়ায় রাবণ খেপে গিয়ে যুদ্ধ করতে গেল। এলোপাতাড়ি রামের চ্যালাদের পিটিয়ে ছাতু করে হনুমানকে আর সুগ্রীবকে এমন ঠ্যাঙানি দিল যে, দু’জনই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পড়িমরি পালিয়ে বাঁচল। রাবণ তারপরই শক্তিশেল মেরে লক্ষ্মণকে শুইয়ে দিল। তারপর তো বানরদের কবিরাজ সুষেণ শেকড়বাকড় আনতে হনুমানকে পাঠাল গন্ধমাদন পাহাড়ে। হনুমান গাছপালা হাতড়ে চিনতে না পেরে পাহাড়ের মাথাটাই ভেঙে নিয়ে এল। তারপর…।”
টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়ল। কলাবতী উঠে দাঁড়াল, ”এখন এই পর্যন্ত। তুই বরং রাতে টেলিফোন করিস। আমার ফর্দমতো এখন মেয়েদের পাস কিনা দ্যাখ।”
অন্নপূর্ণাকে টিচার্স রুম থেকে বেরোতে দেখে কলাবতী দোতলার সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল।
”এই যে কলাবতী,” অন্নপূর্ণা পিছু ডাকল। ”তোমার নাটকের কদ্দূর? কারা—কারা অভিনয় করবে সিলেক্ট করে ফেলেছ? অনামিকা কিন্তু ভাল অভিনয় করে, ওর দেবযানী তুমি তো শোননি?”
”অন্নপূর্ণাদি, এ নাটকে পাত্রপাত্রীরা সব রাক্ষস আর বানর, শুধু রাম লক্ষ্মণই মানুষ। এই দুটো ভূমিকায় একটু বড়, মানে লম্বা মেয়ে চাই।”
