রাজশেখর ছেলে আর নাতনির ঝগড়া শুনতে শুনতে ধীরে—ধীরে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলেন। এবার বললেন, ”সতু, তুই কি সত্যি—সত্যিই বিলেত গেছলি? এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে তোর কথা শুনে ব্যারিস্টারিটা সত্যিই পাস করেছিস কিনা।” কথা শেষ করে তিনি টেবল থেকে উঠে পড়লেন। তখনই লাউঘন্ট নিয়ে এল অপুর মা। সত্যশেখর ফ্যালফ্যাল করে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেখছে।
”ছোটকত্তা, কতটা দোব?”
”সবটা।”
”কাকা, দাদু খুব চটেছে। স্যাবার জেটের পূর্বপুরুষ পুষ্পক রথ, অগ্নিবাণ থেকে আইডিয়া নিয়ে রকেট, এই সব গাঁজাখুরি থিওরি শুনলে আমিও তোমাকে কিন্তু অপুর মা আর বজরংবলীদের সঙ্গে এক দলে ফেলে দোব। দাদু তো অলরেডি ফেলেই দিয়েছে। দেখলে না, কীরকম থমথমে হয়ে গেল মুখটা।”
সত্যশেখরের গৌরবর্ণ মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। বাবাকে যেমন ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে, তেমনি ভয়ও করে। ”তাই তো রে কালু, বাবা আমাকে যা বলল, তার মানে তো আমি অশিক্ষিত। তার মানে…”
টেবলে রাখা সেলফোনটা বেজে উঠল। সত্যশেখর তুলে নিয়ে প্রথমেই কে ফোন করছে তার নম্বরটা দেখে নিয়ে অস্ফুটে বলল, ”মলু, এত রাতে!”
কলাবতীর কান খাড়া হয়ে উঠল। সে খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে বড়দি কেন ফোন করছে।
”হ্যাঁ বলো। …খাচ্ছিলুম। অপুর মা দারুণ একটা লাউঘন্ট করেছে উইথ চিংড়ি। কালু এখন আঙুল চাটছে…য়্যা? না, না, আমার গোটাদশেক হাওয়াই শার্ট আছে, তোমাকে আর কিনে পাঠাতে হবে না…একদম নয়। গেঞ্জি পরে মিটিংয়ে যাওয়াটা সিঙ্গিবাড়ির কালচার নয়, এটা তুমি ভালই জান। রোববার সব ভদ্রলোকই দুপুরে একটু ঘুমোয় … আমি কুম্ভকর্ণের মতো টানা ছ’মাস ঘুমোই তোমাকে কে বলল? ঘুম থেকে উঠেই মিটিংয়ে দৌড়ানো যায় না। একটু বিশ্রাম নিতে হয়, চা খেতে হয়।” এরপর কলাবতী দেখল কাকার মুখ লাল হতে হতে গম্ভীর হয়ে গেল।
”আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। বাবা বলল অশিক্ষিত, কালু বলল বজরং, তুমি বলছ কুম্ভকর্ণ, একমাত্র অপুর মা এখনও কিছু বলেনি। হয়তো বলবে ঘটোৎকচ।” বোতাম টিপে সত্যশেখর সেলফোনটা নামিয়ে রাখল।
”ওর হেডমাস্টারি স্বভাবটা আর বদলাল না।” এই বলে সত্যশেখর উঠে পড়ল, কলাবতীও।
বসার ঘরে কিছুক্ষণ টিভি দেখে কলাবতী শুতে যায়। তার আগে সে একবার দাদুর সঙ্গে দেখা করে। রাজশেখর এখন লাইব্রেরিতে। কলাবতী দরজায় উঁকি দিতেই তিনি বললেন, ”কালু শুনে যা, শেল কথাটার একটা মানে পেয়েছি অভিধানে।”
কলাবতী দেখল টেবলে গোটাতিনেক পাতা খোলা মোটা—মোটা বই। সে বুঝল, দাদু খুব গুরুত্ব দিয়েছে ‘শেল’ শব্দটায়। সে একটা চেয়ার টেনে বসল।
”সংস্কৃত শল্য থেকে শেল। তীক্ষ্নাগ্র দীর্ঘ অস্ত্রবিশেষ। এর থেকে খুব একটা ধারণা করা গেল না জিনিসটা কেমন ছিল।” রাজশেখর আর একটা বই টেনে নিলেন। ”এখানে বলছে, শ্বশুর ময়দানব শক্তিশেল তৈরি করে জামাই রাবণকে সেটা দেন। এতে আটটা ঘণ্টা বাঁধা আছে। বজ্রনিনাদী, মহাবেগবাণ এবং সর্পজিহ্বার মতো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরণকারী শত্রুশোণিতপায়ী অস্ত্র। এর আঘাতে রাবণ লক্ষ্মণকে ভূপাতিত করেন। ওষধি পর্বতের দক্ষিণ শিখর হতে বিশল্যকরণী, সাবর্ণকরণী, সঞ্জীবকরণী আর সন্ধানী এই চার প্রকার মহৌষধি আনতে গেলেন হনুমান, কিন্তু ওষধি খুঁজে না পেয়ে পর্বতের শৃঙ্গটিই উৎপাটন করে নিয়ে আসেন। সেই সব ওষধি আঘ্রাণ করালে লক্ষ্মণ নীরোগ হয়ে পুনর্জীবিত হন।” পড়ার চশমাটা চোখ থেকে সরিয়ে রাজশেখর বললেন, ”এই হল শক্তিশেল আর তার পরের ঘটনা। তুই যদি আরও কিছু জানতে চাস তা হলে বইটা নিয়ে যা। রাত্তিরে ঘুমোবার আগে রোজ একটু—একটু করে পড়িস। নাটক যে বিষয় আর ঘটনা নিয়ে, সেটা আগে ভাল করে জেনে নেওয়া উচিত।” রাজশেখর বইটা ঠেলে দিলেন কলাবতীর দিকে।
”দাদু, রাত্তিরে পড়ায় প্রধান বাধা পিসি। এগারোটা বাজলেই আলো নিভিয়ে দেবে।”
”কিছু একটা বলে ম্যানেজ করবি। আর একটা বই তোকে নাটক লেখার জন্য পড়তে হবে।”
রাজশেখর আলমারি খুলে বের করলেন মাইকেল মধুসূদন গ্রন্থাবলী। ধূসর মলাট, বইয়ের পাতাগুলো হলদেটে। কিছু পাতা খসে পড়েছে। এক সপ্তাহ বয়সি সন্তানকে মা যেভাবে ধরে, কলাবতী দেখল দাদু সেইভাবে দু’হাতে বইটি ধরে তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ”আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলুম। এর একটা ছোট অংশ আমাদের ম্যাট্রিকের বাংলা সিলেবাসে ছিল। ষাট বছর আগে পড়েছি এখনও ভুলিনি, শুনবি? মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করে যুদ্ধে যাবে। মন্দিরে যজ্ঞে বসার আগে তার কাকা বিভীষণ লক্ষ্মণকে গোপনে পথ দেখিয়ে নিয়ে এলেন মন্দিরে। উদ্দেশ্য মেঘনাদকে হত্যা করা। ওই দু’জনকে মন্দিরের মধ্যে দেখে মেঘনাদ বলল …আমাদের বিষ্ণুহরিবাবু ক্লাসে এইভাবে বলেছিলেন …” কলাবতী দেখল দাদু চোখ বুজলেন, ”এতক্ষণে—অরিন্দম কহিলা বিষাদে;—জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল রক্ষঃপুরে। হায় তাতঃ, উচিত কি তব এ কাজ? নিকষা সতী তোমার জননী, সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ শূলিশম্ভুনিভ কুম্ভকর্ণ, ভ্রাতুষ্পুত্র বাসববিজয়ী। নিজগৃহ পথ তাতঃ দেখাও তস্করে? চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?” রাজশেখর চোখ খুলে বললেন, ”কালু, কী গ্রেস, কী ডিগনিটি। বাঙালি জীবনে তখন এটাই দরকার ছিল।”
