এরপর হাততালি। মলয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ব্রততীর সভার কার্যবিবরণী লিখে যাওয়া তখনও চলছে। বাইরের আমন্ত্রিতরা একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন কলাবতী বলল ধূপছায়াকে, ”ধুপু, নিলুর দোকানে চল। কাকা ঠিক হাজির হবে।”
প্রাক্তন বিচারপতিকে গাড়িতে তুলে দিয়ে মলয়া ফিরছিল, কলাবতীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিচুগলায় বলল, ”কাকাকে বোলো, ভদ্রলোকদের মাঝে যেতে হলে একটা জামা অন্তত গায়ে দিতে হয়।”
”বলব,” বাধ্য ছাত্রীর মতো কলাবতী মাথা হেলাল।
”কী বলবি রে কালু?”
”কাকাকে জামা পরতে।” হেসে ফেলে মাথার চুল ঝাঁকিয়ে কলাবতী বলল, ”আমার কাকাটা একটা ব্যোম ভোলানাথ, এটিকেটের ধার ধারে না, দেখলি না অত লোকের মধ্যে নির্বিকারভাবে গিরিমাসির কাছ থেকে কেমন বোতলটা চেয়ে নিল। দোষ শুধু একটাই ভীষণ পেটুক। তাই নিয়ে কম হাসাহাসি হয় বাড়িতে।”
স্কুলের ফটক পেরিয়ে দু’জনে নিলুর দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ধূপছায়া বলল, ”খুব তো বলে দিলি আধুনিক শক্তিশেল লিখব, পারবি? কখনও নাটক লিখেছিস?”
”সেই জন্যই তো লিখব, আমার মধ্যে একজন নাট্যকার লুকিয়ে আছে কি না, সেটা তো জানতে হবে।” দাঁড়িয়ে পড়ল কলাবতী। একটু উত্তেজিত স্বরে সে যোগ করল, ”লেখার চেষ্টা না করলে সে খবরটা পাব কী করে? শুরুটা সবাইকেই তো একসময় করতে হয়, আমিও করব।”
”দারুণ একটা ডায়ালগ দিলি, আমার তো হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে। তোর হবে, নাটক লেখা হবে। ওই দ্যাখ, কাকা নিলুদার দোকানে।”
দু’জনে এগিয়ে গেল সত্যশেখরকে দেখে।
”এসে গেছিস।” সত্যশেখর যেন জানত কলাবতী আসবে, ”নিলু দুটো বোতল দাও, কেমন মিটিং হল বল তো?” তারপর নিজেই উত্তর দিল, ”আরে দূর—দূর, এই নিয়ে কখনও মিটিং করে? মলুটার বুদ্ধিশুদ্ধি কোনওদিন ছিল না। আজও নেই। কী সব লোক ডেকে এনেছে! একজন বলল রক্তদান শিবির করতে, আর একজন বলল পরিবেশ আন্দোলন গড়ার হাতিয়ার করতে, আর একজন লোহার চেয়ার রাখতে আর একজন গুগাবাবা দেখাতে। আমি দেখলুম এভাবে চললে মিটিং আর শেষ হবে না, এটাকে ভণ্ডুল করে দেওয়া দরকার। আর তা করতে হলে চটিয়ে দাও মলুকে। দিলুম চটিয়ে। ব্যস খতম মিটিং।…আর একটা করে খা, আমিও খাই। নিলু, আর তিনটে।”
সত্যশেখরের শক্তিশেল ব্যাখ্যা
রাতে খাওয়ার টেবলে সত্যশেখর রাজশেখরকে বলল, ”জানো বাবা, কালু নাটক লিখবে।”
রাজশেখর রুটি ছিঁড়ে লাউঘন্ট দিয়ে পুঁটলি বানাচ্ছিলেন। চোখ বিস্ফারিত করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ”বটে! কী নিয়ে?”
”সুকুমার রায়ের ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’—এর আধুনিক সংস্করণ। তাই তো রে, কালু?”
কলাবতী চামচে করে শুধুই লাউঘন্ট খাচ্ছিল, রুটি প্লেটেই পড়ে আছে। কাকার কথা যেন কানেই যায়নি, এমনভাবে সে পাশে দাঁড়ানো অপুর মাকে বলল, ”পিসি, ঘন্ট খানিকটা তুলে রেখো, কাল ভাত দিয়ে খেয়ে স্কুলে যাব। দারুণ হয়েছে।”
ঘন্টর পুঁটলিটা মুখে ঢুকিয়ে রাজশেখর বললেন, ”আধুনিক সংস্করণটা আবার কী? নাটকটা হবে কোথায়, করবে কারা?”
কলাবতী চুপচাপ খেয়ে চলেছে। সত্যশেখরই শেষ দুটো কৌতূহলের জবাব দিল, ”হবে কালুদের স্কুলের কম্পাউন্ডে। উপলক্ষ স্কুলের প্ল্যাটিনাম জুবিলি, করবে স্কুলের মেয়েরা। আরও অনেক কিছু তিনদিন ধরে হবে, তারই একটা এই নাটক।”
”ভাল কথা। তা সুকুমার রায়ের লেখাটাই তো করা যায়।”
আচমকাই কলাবতী প্রশ্ন করল, ”আচ্ছা দাদু, শক্তিশেল জিনিসটা কী?”
রাজশেখরকে অপ্রতিভ দেখাল। আমতা—আমতা করে বললেন, ”রামায়ণে অবশ্য এক্সপ্লেন করে বলা নেই। শক্তি মানে তো জানিসই, পাওয়ার, জোর, স্ট্রেংথ, আর শেল মানে…অপুর মা, চট করে বাংলা অভিধানটা নিয়ে এসো তো।”
দমবন্ধ করে বিস্ফারিত চোখে অপুর মা তাকিয়ে রইল।
”আনতে গেলে গোটা লাইব্রেরিটাই গন্ধমাদনের মতো নিয়ে আসবে। হনুমানের বিশল্যকরণী খোঁজা আর অপুর মা’র অভিধান খুঁজে আনা তো একই ব্যাপার,” সত্যশেখর তারিয়ে—তারিয়ে কথাগুলোকে লাউঘন্টর সঙ্গে মিশিয়ে বলল। তারপর যোগ করল, ”অপুর মা, অভিধানের বদলে বরং আর একটু ঘন্ট এনে দাও।”
হাঁপ ছেড়ে অপুর মা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ছদ্ম কোপ দেখিয়ে কলাবতী বলল, ”কাকা, পিসিকে নিয়ে ঠাট্টা করবে না একদম। জানো, সই করে কুরিয়ারের কাছ থেকে চিঠি নিয়েছে। পিসি পূর্ণ সাক্ষর, লিটারেট। আচ্ছা তুমি বলো তো, শেল কথাটার মানে কী?”
সত্যশেখর পিটপিট করে তাকিয়ে বলল, ”কাশিপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরির নাম শুনেছিস?”
”শুনেছি।”
”তা হলে শেল কথাটার মানে জিজ্ঞেস করছিস কেন? শেল মানে কামানের গোলা।”
”রামায়ণে কামানের গোলা।”
”এতে অবাক হওয়ার কী আছে? দু’চার হাজার বছর আগে সায়েন্সে আমরা কত অ্যাডভান্সড ছিলুম জানিস? পুষ্পক রথ, সেটা কী বল তো?” সত্যশেখর চোখ সরু করে রইল। পাঁচ সেকেন্ড পর বলল, ”স্যাবার জেট! অগ্নি বাণ, বরুণ বাণ, শব্দভেদী বাণ, এ সবই তো এখন রকেট, গ্রেনেড, এ কে ফর্টি সেভেন, স্টেনগান। তখনও শেল ছিল, এখনও বোফর্স কামানে সেটা ভরা হয়।”
”কাকা, আমরা যদি এতই অ্যাডভান্সড ছিলুম, তা হলে বিশল্যকরণীর মতো ক্যান্সারের ওষুধ বের করতে পারছি না কেন? হনুমান লাফ দিয়ে ভারত থেকে লঙ্কায় গেল, আর লং জাম্পে একটা অলিম্পিক মেডেল এখনও আমরা আনতে পারিনি।”
