গণসঙ্গীত গায়ক সাত সেকেন্ড চুপ। সারা ঘর কৌতূহলে হাবুডুবু। সভাপতি ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে বলে ফেললেন, ”অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন, তাই তো?”
”আরে না না। সটকান দেবে অরুণাচল, তাই কখনও হয়। পঞ্চাশ হাজার লোকের মিটিংয়ে গেয়েছি, আর এ তো…” একটা তুড়ির শব্দ হল। ”খুব সিম্পল। একটা শব্দ বদলে দিলুম, লাথির জায়গায় ঘুঁষি বসিয়ে দিলুম। ঘুঁষি মেরে তালা ভাঙতে গেলে আঙুল ভেঙে যাবে, কেউ আর ভাঙাভাঙিতে গেল না। ওদিকে জেনারেটার চালু হয়ে গেছে। ফাংশনও শুরু হয়ে গেল।”
সত্যশেখর বলল, ”দারুণ উপস্থিত বুদ্ধি তো মশাই আপনার, উকিল হলেন না কেন? হেডমিস্ট্রেসকে অনুরোধ করছি, নোট করুন, চেয়ার রাখতে হবে লোহার আর জেনারেটরের ব্যবস্থা অতি অবশ্য চাই। কাগজে দেখলুম কোলাঘাটের তিনটে ইউনিট বসে গেছে।”
”ভাল সাজেশন দিয়েছেন মিস্টার সিঙ্গি,” মলয়া বলল।
”ধন্যবাদ।” বিনীত স্বরে বলল সত্যশেখর, ”আর একটা প্রস্তাব দোব। যদি সিনেমা দেখাতে চান, তা হলে এমন ফিল্ম বাছুন যা দেখে দর্শকরা উত্তেজনা বোধ করবে না, সফট, টেন্ডার, সেন্টিমেন্টাল এমন ফিল্ম।”
”এবং বাংলা বই।” এম এল এ বলরাম দত্ত এতক্ষণ চুপ করে থেকে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলেন, ”বলিউডের হিন্দি বই আমাদের রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলায় যেভাবে সংস্কৃতিদূষণ ছড়াচ্ছে, একে প্রতিহত করতে হবে। না করলে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে না।”
ব্যবসায়ী শিবশঙ্কর বলল, ”এ ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রের ফিল্ম দেখাতে পারেন, যেমন ‘দেবদাস’। হিন্দি নয়, বাংলা।”
সমাজসেবিকা পল্লবী তীব্র স্বরে আপত্তি জানাল, ”তা কী করে হয়? দেবদাস তো শুধু ড্রিঙ্ক করে, অল্পবয়সি মেয়েরা দেখে কী শিখবে?”
”ইসস, এটা তো মনে ছিল না।” শিবশঙ্করের দাঁত জিভে প্রায় বসে যাচ্ছিল, ”না, না, ‘দেবদাস’ স্কুলে দেখানো যাবে না। তা হলে বরং ‘বামাক্ষ্যাপা’, কী চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করার মতো ফিল্ম দেখানো হোক। আমি ক্যাসেট জোগাড় করে দোব।”
ভারী, গভীর গলায় অরুণাচল বলল, ”কোনও কন্ট্রোভার্সি হবে না যদি সত্যজিৎ রায় দেখান, ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘গুগাবাবা’। এতে প্রেম নেই, মদ খাওয়া নেই, ক্লিন ছবি। ধর্মটর্ম, কি বিপ্লবের আদর্শ এখনকার ছেলেপুলেদের টানে না।”
কলাবতী ধুপুকে কানে—কানে বলল, ”শাহরুখের ‘দেবদাস’ দেখেছিস?”
”দেখেছি।”
”আমাদের কেবল টিভিতে দু’বার দেখিয়েছে, ফ্যান্টাস্টিক।”
মলয়া বলল, ”কী ফিল্ম দেখানো হবে, সেটা পরে ঠিক করা যাবে। তা যাই ঠিক হোক, হিন্দি নয়, আর ভায়োলেন্স থাকা চলবে না।”
”হাসি থাকা চলবে কি?” প্রশ্ন সত্যশেখরের।
”নিশ্চয় চলবে, হাসি অতি উপকারী জিনিস। আমাদের পাড়ায় হাসির ক্লাব খোলা হয়েছে,” গণসঙ্গীতের গলায় প্রচ্ছন্ন গর্ব। ”আমিও লাফিং ক্লাবের মেম্বার। রোজ সকালে মেম্বারদের সঙ্গে পনেরো মিনিট টানা হাসি। বলব কী, শরীর—মন তাজা, ঝরঝরে হয়ে যায়।”
”কীভাবে হাসেন, সেটা একবার দেখাবেন কি?” নিরীহ স্বরে বলল সত্যশেখর।
”না আ—আ—আ।” তীক্ষ্ন, উঁচু গলায় প্রায় ধমকের সুরে মলয়া শব্দটা করে কঠিন চোখে তাকাল সত্যশেখরের দিকে। কাঁচুমাচু ব্যারিস্টার অসহায় চোখে তাকাল ভাইঝির দিকে।
নিজের গলার স্বরে লজ্জা পেয়ে গেল মলয়া। আসলে বহুক্ষণ ধরে আজেবাজে ছেলেমানুষি কথাবার্তায় বিরক্ত বোধ করছিল। সভা ডাকার গুরুত্বটা কারও কথায় প্রকাশ না পাওয়ায় সে বুঝে গেল, পাঁচজনের মত নিয়ে সব কাজ করা যায় না। কিন্তু মাথা যে এতটা গরম হয়ে যাবে, সে বুঝতে পারেনি। লজ্জা ঢাকার জন্য সে নরম স্বরে বলল, ”কলাবতী, ধূপছায়া, তোমরা কিছু বলবে?”
ধূপছায়া দাঁড়িয়ে উঠে বলল, ”বড়দি, মেয়েদের নিজেদের কিছু অনুষ্ঠান থাকা উচিত। বাইরের লোক এনে কিছু করলে লোকের ধারণা হবে এই স্কুলের মেয়েরা পড়া ছাড়া আর কিছুই পারে না। আমরাও যে অনেক কিছু পারি সেটা দেখাবার সুযোগ দেওয়া হোক।”
মলয়া তার হতাশা কাটিয়ে উঠে আগ্রহী স্বরে বলল, ”নিশ্চয় তোমরা অনুষ্ঠান করবে। কী করবে, সেটা ভেবেছ?”
কলাবতী বলল, ”আমরা সায়েন্স এগজিবিশন করব, নাটক করব।”
”শ্রুতিনাটক।” শিক্ষিকাদের একজন বলে উঠল।
কলাবতী বলল, ”নিজেরা নাটক লিখে নিজেদের পরিচালনায় অভিনয় করব।”
”’অবাক জলপান’ আবার করা যায়।” সত্যশেখর বলে উঠল।
”তা কেন! সুকুমার রায়ের তো আরও নাটক আছে, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ করা যায়।”
কলাবতী থামামাত্র মলয়া বলল, ”কিন্তু এই যে বললে, নিজেরা নাটক লিখে অভিনয় করবে?”
অপ্রস্তুত কলাবতী কথাটা শুধরে নেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি বলল, ”’লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ই যে করব এমন কোনও কথা নেই। ওটা তো আশি—নব্বই বছর আগের লেখা, তাকে অবলম্বন করে আর একটা আধুনিক শক্তিশেল তো লেখা যায়।”
”কে লিখবে, তুমি?” মলয়া বলল।
”শুধু আমি কেন, সবাই মিলে লিখব।”
”বেশ। তবে মজাটা যেন থাকে।” মলয়া রাজি হয়ে গেল।
ব্রততী ঘাড় নিচু করে ঘসঘস করে লিখে নিচ্ছে। মলয়া ইশারায় মিশিরকে জানিয়ে দিল সফট ড্রিঙ্কস পরিবেশন করতে। মিশির চাপা গলায় নির্দেশ পাঠাল ফাইভ—এ—ওয়ানে। বোতল হাতে গিরিবালা ঘরে ঢুকতেই মলয়া সভাপতিকে কানে—কানে কী যেন বলল।
”ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলারা,” সভাপতি বলে উঠলেন, ”আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় যোগ দিয়ে সুচিন্তিত পরামর্শদানের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের সুপারিশ অবশ্যই বিবেচনা করবেন প্রধান শিক্ষিকা। প্ল্যাটিনাম জুবিলিকে সফল করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতায় জুবিলি সার্থক হয়ে উঠুক, এই কামনা করে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি। আজকের সভা এখানেই সমাপ্ত হল।”
