”খুবই দুঃখের কথা। ওনার এই অকালমৃত্যুর কথা কালো, মোটা, চৌকো বর্ডার দিয়ে আপনারা যে সুভেনির নিশ্চয়ই বের করবেন, তাতে যেন ছাপা হয়। আর একটা কথা ম্যাডাম, আমি সিনহা নই, সত্যশেখর সিংহ, সিঙ্গিও বলতে পারেন।”
মলয়া কটমটে চোখে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ”ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য সিঙ্গিমশাইকে ধন্যবাদ।”
”হেডমিস্ট্রেস বক্তৃতা দেননি?” আবার সত্যশেখর।
মলয়া ফিসফিস করে ব্রততীকে, ”বলেছিলুম ঝামেলাবাজ।”
”বড়দি তখন সদ্য স্কুলে জয়েন করেছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জায় শয্যাশায়ী, না হলে নিশ্চয় বক্তৃতা দিতেন। তবে এবার দেবেন।” ব্রততী জানিয়ে দিল।
”ক’মিনিট দেবেন, সেটা যেন ঠিক করে রাখেন।” বলল বলরাম দত্ত। তারপর যোগ করল, ”গার্জেনদের তরফে একজনকে যেন বলতে দেওয়া হয়।”
ব্রততী লিখে নিল। কলাবতীর ফিসফিস ধুপুর কানে, ”রেডি থাক, একটা পরিবেশরক্ষার ভাষণ শুনতে হবে।”
”হাততালি দেওয়ার রিহার্সালটা তা হলে তুইই অ্যারেঞ্জ করিস।” বলেই ধূপছায়া কাঠ হয়ে গেল, ব্রততী একদৃষ্টে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে।
”আর কী—কী হয়েছিল?” পল্লবী গুহ জানতে চাইল।
”অনেক কিছুই হয়েছিল। এখন আর সব মনে নেই।” ব্রততী মনে করার চেষ্টায় ভ্রূ কুঁচকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ”মেয়েরা নাটক করেছিল ‘অবাক জলপান’। সুকুমার রায়ের লেখা। আর ফাইভের মেয়েরা সাঁওতালি নাচ নেচেছিল, খুব হাততালি পেয়েছিল। আলপনা দেওয়ার প্রতিযোগিতা হয়েছিল। ইলেভেন বি—র মেয়েরা ফার্স্ট হয়েছিল। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মাঝখান দিয়ে ওদের আঁকা আলপনা এক হপ্তা কেউ মাড়ায়নি,” ব্রততীর গলায় প্রচ্ছন্ন গর্ব।
গণসঙ্গীত গায়ক অরুণাচল মন্তব্য করল, ”আর্টের রিয়েল সমঝদারি একেই বলে।”
”ও হো হো, আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি,” ব্রততী মাপ চাওয়ার ভঙ্গিতে তার লম্বা শরীরটা নুইয়ে জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো করে ফেলল, ”শেষ অনুষ্ঠান ছিল স্কুলের কম্পাউন্ডে সিনেমা শো। ‘শোলে’ দেখানো হয়। সে যে কী ভিড় হয়েছিল কী বলব, ছাত্রী আর গার্জেনরা মিলে হাজারখানেক তো হবেই, দাঁড়াবার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। একটা মাত্র অঘটন দু’দিনের একেবারে শেষের এই অনুষ্ঠানে ঘটেছিল।” ব্রততী জল খাওয়ার জন্য সভাপতির সামনে রাখা জলের গ্লাসটা টেনে নিল। পনেরো বছর আগের ঘটনা মনে পড়াতেই বোধহয় গলা শুকিয়ে গেছে। এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে সে রুমালে মুখ মুছল।
”বাসন্তী যখন টাঙ্গা চালিয়ে গব্বরের লোকেদের হাত থেকে পালাচ্ছে, সবাই তখন টানটান কী হয়—কী হয়, আর ঠিক সেই সময়…” বাচ্চচাদের ভূতের গল্প বলার মতো গলায় ছমছমে ভাব এনে চার সেকেন্ড থেমে ব্রততী বলল, ”লোডশেডিং!”
”কী সব্বোনাশ!” আঁতকে উঠল অরুণাচল।
”আপনারা তখন কী করলেন?” সত্যশেখর উদগ্রীব পরের ঘটনা শোনার জন্য।
”আমরা সবাই দৌড়ে এই টিচার্সরুমে এসে দরজায় খিল আর ছিটকিনি তুলে দিলুম। মিশির আর দু’তিনজন টিচার বাইরে রয়ে গেছে, তারা দুমদুম করে দরজা ধাক্কাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে। অন্নপূর্ণা ঘরের মধ্যে ‘হে মধুসূদন রক্ষা করো, ব্রততীদি দরজা খুলো না, পাবলিক ঢুকে পড়বে,’ বলে চেঁচাচ্ছে।”
অন্নপূর্ণা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, ”মোটেই আমি ‘দরজা খুলো না’ বলিনি। বাইরে কলিগরা বিপন্ন, তখন কি ওরকম কথা বলা যায়?”
”আপনি কি তখন দরজা খুলে দিয়েছিলেন?” ব্যারিস্টার জেরা শুরু করল।
”কী করে খুলব? অসীমা তো তখন দু’হাতে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে। ওর গায়ে তো জোর বেশি। অসীমা উঠে দাঁড়াও তো।”
অসীমা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”পনেরো বছরে দশ কেজি ওজন বেড়েছে। এখন দেখে মনে হবে আমার গায়ের জোর ওর চেয়ে বেশি। কিন্তু তখন ইচ্ছে করলেই অন্নপূর্ণা আমায় ঠেলে সরিয়ে দিতে পারত।”
অন্নপূর্ণা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে গণসঙ্গীত বলে উঠল, ”থাক এখন ওসব কথা, এবার বলুন লোডশেডিং হওয়ার পর পাবলিক কী করল।”
ব্রততী বলল, ”কী করবে আবার, চেয়ার ভাঙতে শুরু করল, সে কী আওয়াজ!”
সত্যশেখরের জেরা অব্যাহত বলল, ”ভাঙল মানে? নিশ্চয় কাঠের চেয়ার ছিল।”
ব্রততী বলল, ”স্টিলের চেয়ারের ভাড়া বেশি, তাই কাঠের…”
”ওইখানেই তো ভুল করেছিলেন।” গণসঙ্গীত বলে উঠল, ”বিয়ে কি বউভাত হলে কাঠের চেয়ার ঠিক আছে, কিন্তু বিনিপয়সায় সিনেমা দেখতে কি গান শুনতে আসে যখন, পাবলিকের মেজাজ তখন স্টিলের হয়ে যায়। দুটো পয়সা বাঁচাবার চিন্তা যদি মাথায় না রাখতেন, তা হলে ভাঙচুরটা হতে পারত না। গত মাসে ধপধপিতে শীতলাপুজোর একটা ফাংশনে গেছলুম। ঠিক আমারই প্রোগ্রামের সময় হল লোডশেডিং।”
”চেয়ার ভাঙাভাঙি হল তো?” বলরাম এবং পল্লবী প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল।
”ভাঙবে কী করে! সব তো লোহার চেয়ার। ওরা তো জানত লোডশেডিং হবেই। তখন কী কাণ্ড ঘটবে সেটা ওরাও যেমন জানত, আমিও তেমনি জানতুম। গাইছিলুম ‘ও আমার দেশের মাটি’, যেই না অন্ধকার হয়ে মাইক বন্ধ হল, সঙ্গে—সঙ্গে গলা ছেড়ে ফুলভলিউমে শুরু করলুম ‘কারার ওই লৌহকপাট।’ আড়াই—তিনহাজার লোক পিনড্রপ সাইলেন্ট। তবলচি চণ্ডী কাহারবা বাজাচ্ছিল, এবার যুদ্ধের ড্রামের মতো বাজাতে শুরু করল, জমে গেল আসর। শুধু ভয় ছিল ওই ‘লাথি মার ভাঙ রে তালা’ লাইনটা নিয়ে। ভাঙাভাঙির কথা শুনে জনগণের মনে বিদ্রোহের সুপ্ত বাসনা যদি সত্যি—সত্যি জেগে ওঠে, তা হলে তো লাথি মেরে চেয়ার ভাঙতে শুরু করবে। তখন কী করলুম বলুন তো?”
