ব্রততী তাড়াতাড়ি বলল, ”চা নয়, সফট ড্রিঙ্কস আছে। গিরি…।”
গিরিবালা দ্রুত ফাইভ এ—ওয়ানে ফিরে গেল।
পল্লবী গুহর প্রস্তাব শুনে সভা মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিল, তারপর ফিসফাস, তারপর আরতি ঘটক মুখ খোলে। ”ছাত্রীদের বাবা—মায়েরা হলে অবশ্য বলার কিছু নেই। তবে টিচাররা এতে অংশ নেবে না।”
সত্যশেখর বলল, ”কেন নেবেন না? তাঁরা তো নাবালিকা নন!”
”প্ল্যাটিনাম জুবিলিতে প্রত্যেকেরই অংশ নেওয়া উচিত। টিচাররা নিচ্ছেন, আশা করব গার্জেনরাও নেবেন। তাঁদের জন্য এই মহৎ কাজটি যদি বরাদ্দ করা হয় তা হলে তাঁদের মহানুভবতায় ভাগ বসিয়ে টিচারদের রক্ত দেওয়াটা উচিত হবে না। ঠিক কিনা?” অন্নপূর্ণা এই বলে তার সহকর্মীদের দিকে তাকাল, সকলের মাথা একদিকে হেলে পড়ল।
”রক্ত অভিভাবকরাই দেবেন, অবশ্য শিবির যদি স্থাপন করা যায়।” মন্তব্যটি অসীমা দত্তর।
তার স্বামী বলরাম এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার মুখ খুলল, ”রক্ত দান—টান তো শুনলুম, কিন্তু পরিবেশদূষণ নিয়ে কতরকম প্রচার যে এলাকায় এই জুবিলি আর ছাত্রীদের মারফত করা যায়, সেকথা কি আপনারা ভেবেছেন? জুবিলি উৎসবকে স্রেফ নাচগান, নাটক আর জলসায় পর্যবসিত না করে সমাজ উন্নয়ন, সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধির একটা আন্দোলন গড়ার হাতিয়ার করে তোলা উচিত।”
কলাবতী ধূপছায়ার কানে ফিসফিস করে বলল, ”ভদ্রলোককে মনে হচ্ছে পলিউশনে পেয়েছে। আন্দোলন মানে স্কুলের মেয়েদের নিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে পদযাত্রা, নয়তো ঝাঁটা নিয়ে একদিন রাস্তা সাফ করা।”
”দেখি না আর কী বলেন, তারপর দূষণ আর রক্তদান কীভাবে হয় দেখা যাবে।” ধূপছায়া কথা শেষ করে দেখল, গিরিবালা দু’হাতে আঙুলের ফাঁকে কাগজের খড় ঢোকানো চারটে বোতল নিয়ে সেগুলো কাদের দেবে বুঝতে না পেরে ব্রততীর দিকে তাকিয়ে। ব্রততী সন্তর্পণে ডান হাতের তর্জনী তাক করে দেখাল সত্যশেখরকে। গিরিবালা সত্যশেখরের হাতে বোতল তুলে দিল। তর্জনী দু’ইঞ্চি ডাইনে সরল, বোতল পেল বলরাম, আরও দু’ইঞ্চি ডাইনে সরল তর্জনী, গণসঙ্গীত গায়ক অরুণাচল বোতল নিল, এরপর পেল পল্লবী গুহ। ব্যবসায়ী শিবশঙ্কর হালদার আর সভাপতি পলাশবরণ বাকি রয়ে গেছে। ব্রততী ‘ভি’ দেখাল গিরিবালাকে দুটি আঙুল তুলে। গিরিবালা ব্যস্ত পায়ে ফাইভ এ—ওয়ানে ফিরে গিয়ে দুটি—বোতল এনে তর্জনীর নির্দেশমতো শিবশঙ্করকে দিতে গেল।
”না, না, আমাকে নয়। ডায়াবিটিস আছে, ডাক্তারের বারণ।”
গিরিবালা নিরুপায় চোখে ব্রততীর দিকে তাকিয়ে বুদ্ধের বরাভয় দানের মতো ব্রততীর হাতের তালু দেখে বুঝল—থাক, দিতে হবে না। তারপরই সে দেখল তালু থেকে বুড়ো আঙুলটা বাঁ দিকে বেঁকে গেল। বাঁ দিকে বসে মলয়া, তার পাশে সভাপতি। গিরিবালা একটা বোতল মলয়ার সামনে রেখে বলল, ”বড়দি, আপনার।”
কথা ছিল বোতল পাবে শুধু বহিরাগতরা। বিব্রত মলয়া তাড়াতাড়ি বোতলটা পাশে সরিয়ে দিয়ে বলল, ”আপনি নিন। আমি পরে খাব।”
গিরিবালা বাকি বোতলটা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে, সত্যশেখর ডাকল, ”এই যে, ওটা দেখি।” হাত বাড়িয়ে বলল, ”একটা খেয়ে কি তেষ্টা মেটে!”
সফট ড্রিঙ্কস বিতরণ দেখে ধূপছায়া বলল, ”কালু, আমাদের দেবে না?”
”না, আমরা ভিতরের লোক। দেখলি না, বড়দি খেলেন না।”
”তোর কাকা কিন্তু দুটো খেলেন।”
”দুটো কেন, যে ক’টা আনানো হয়েছে সব খেয়ে নেবে যদি অফার করা হয়। তবে এখানে খাবে না, বড়দির ভয়ে। বাইরে নিলুর দোকানে ঠিক আরও গোটাচারেক খাবে।”
সবার বোতল শেষ হয়েছে দেখে মলয়া বলল, ”আমরা দুটো প্রস্তাব পেয়েছি। এবার আর কেউ কিছু বলবেন?”
গলা ঝেড়ে নিয়ে সত্যশেখর বলল, ”প্ল্যাটিনামের আগে নিশ্চয়ই ডায়মন্ড জুবিলি পনেরো বছর আগে হয়েছিল।”
এই স্কুলে তিরিশ বছরের শিক্ষিকা ব্রততী বলল, ”হয়েছিল।”
মলয়া তখন অসুস্থ ছিল, অনুষ্ঠানে আসতে পারেনি। কী হয়েছিল তা সে জানে না। তাই চুপ করে রইল।
সত্যশেখর আবার বলল, ”তখন কী প্রোগ্রাম হয়েছিল, সেটা যদি বলেন।”
”দুদিন ফাংশন হয়েছিল। সব কিছু ব্যবস্থা করেছিলুম আমরা টিচাররা, উঁচু ক্লাসের ছাত্রীরা আর ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজন মেম্বার মিলে। প্রথম দিন উদ্বোধন করেন জ্যোতিবাবু। রাইটার্স থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে এসেছিলেন, সাত মিনিট ছিলেন। ছাত্রীরা নেচেছিল, কয়েকজন টিচার আবৃত্তি করেছিল…”
”বই দেখে না, না—দেখে?” কৌতূহলটা সত্যশেখরের বলাই বাহুল্য।
একটু কঠিন গলায় ব্রততী বলল, ”না দেখে। আমি আবৃত্তি করেছিলুম ‘দুই বিঘা জমি’—না দেখে। আর বক্তৃতা দিয়েছিলেন চব্বিশ বছর ধরে ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান শ্রীঅতুলকৃষ্ণ ঘোষাল। তাঁর বক্তৃতার আধঘণ্টার মাথায় হাততালি শুরু হওয়ায় তিনি বসে পড়েন। তিনদিন পর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। আমরা ঠিক করেছিলুম তিনি পঁচিশ বছর চেয়ারম্যান থেকে সিলভার জুবিলি করলে তাঁকে সংবর্ধনা দেব, আমাদের সেই আশা পূরণ হয়নি।” আশা অপূর্ণ থাকার দুঃখে ব্রততীর গলা ধরে এল।
”অতুলকৃষ্ণবাবুকে তা হলে প্ল্যাটিনাম জুবিলির রিসেপশন কমিটির চেয়ারম্যান করে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হোক।”
সত্যশেখরের প্রস্তাব শোনামাত্র ব্রততী খাতায় লিখে নিল।
”মিস্টার সিনহার কথামতো মাননীয় অতুলকৃষ্ণ ঘোষাল মশাইকে বিশেষ সংবর্ধনা দিতে পারলে আমাদের ভালই লাগত।” মলয়া মন্থর, ভারী গলায় বলল, ”কিন্তু গভীর পরিতাপের কথা, তিনি গতবছর পঁচানব্বই বছর বয়সে মারা গেছেন।”
