ঠিক এই সময়েই কোমরে প্যান্টের বেল্ট আঁটতে—আঁটতে সাদা গেঞ্জি পরা, চোখে চশমা, আলুথালু চুলে, চটি পায়ে হাঁপাতে হাঁপাতে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল সত্যশেখর।
মলয়া ভাষণ থামিয়ে তাকিয়ে রইল, সারাঘর হতভম্ব। আচমকা দীর্ঘদেহী, মোটাসোটা একটি লোক হঠাৎ ঘরের মধ্যে এসে পড়ায় সভা নির্বাক। সত্যশেখর বুঝতে পেরেছে সে বিদঘুটে একটা অবস্থা তৈরি করে ফেলেছে তাই বোকার মতো লাজুক হেসে বলল, ”একটু দেরি হয়ে গেল।”
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলরাম দত্ত বলল, ”তিন মিনিট দেরি হয়েছে।”
”তা হলে তো প্রায় ঠিক সময়েই এসে গেছি।” সত্যশেখরকে আশ্বস্ত দেখাল, ”নিন, এবার শুরু করুন।” খালি চেয়ারটা দেখে সে সেটায় বসল।
মলয়ার মুখ থমথমে। বক্তব্য পেশ করার মুখেই এমন একটা বাধা পেয়ে তার মেজাজ বিগড়ে গেছে। ভূমিকা বাদ দিয়ে সে সরাসরি বিষয়ে চলে গেল। ”আমরা ঠিক করেছি প্ল্যাটিনাম জুবিলি উৎসব তিনদিন ধরে করব। তিনদিন দীর্ঘ সময় আর তাতে খরচও বেড়ে যাবে।”
সমাজসেবিকা পল্লবী গুহ বলল, ”কত বাড়বে সেটা কি হিসেব করেছেন?”
”করিনি। তবে মোট কত খরচ করতে পারব তার একটা অ্যামাউন্ট আমরা আনুমানিক ধরেছি—পঞ্চাশ হাজার টাকা। স্কুল থেকে দিতে পারব তিরিশ হাজার, ছাত্রীদের কাছ থেকে দশ টাকা করে নিয়ে এগারো হাজার আর ডোনেশন—বিজ্ঞাপন থেকে দশ হাজার। এই টাকায় তিনদিন ধরে ফাংশন করা আমার মনে হয় সম্ভব নয়।”
জমি ও বাড়ির প্রোমোটার, সিমেন্ট ব্যবসায়ী শিবশঙ্কর হালদার বলল, ”পঞ্চাশ হাজারে তিনদিন?” হতাশায় মাথা নাড়ল। ”মেয়েদের একদিন তো ভাল করে খাওয়াবেন, তাতেই তো অর্ধেক টাকা চলে যাবে, তারপর আর্টিস্ট এনে জলসা, সিনেমা, থিয়েটার এসব করতে গেলে,” হাত নাড়তে—নাড়তে শিবশঙ্কর বলল, ”আরও দু’লাখ।”
ছাত্রী প্রতিনিধি ধূপছায়া এবার বলল, ”আমাদের ভাল করে না খাওয়ালেও চলবে। প্যাকেটে লুচি—আলুর দম বোঁদে দিলে সোনামুখ করে আমরা খাব।”
বলরাম দু’হাত ঝাঁকিয়ে বলল, ”এই তো চাই। কবজি ডুবিয়ে মাংস—ভাত, কি বিরিয়ানি, এসব কী? এটা বিয়েবাড়ি না কালীপুজো? এঁটো কলাপাতা, হাড়গোড় ফেলে ছড়িয়ে পরিবেশদূষণ করা? না, না, ওই মেয়েটি ঠিক বলেছে, প্যাকেটের খাবার।”
শিবশঙ্কর হালদার এখনও হাল ছাড়েনি। বলল, ”আমার শালার কেটারিং ব্যবসা, তাকে বললে, থার্টি পারসেন্ট লেস করে দেবে। তা ছাড়া প্যাকেটে খাবার দেবেন, কিন্তু প্যাকেটগুলো এখানে—ওখানে ফেললে তাতে কি পরিবেশদূষণ হবে না?”
”ফেলবে কেন? বাড়ি নিয়ে যাবে।” বলরাম উত্তেজিত হয়ে গলা চড়াল।
মলয়ার মনে হল ব্যাপারটা বাগবিতণ্ডার দিকে গড়াচ্ছে। তাড়াতাড়ি সে বলল, ”খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা ফান্ডের অবস্থা বুঝে পরে আমরা ঠিক করব।”
ব্রততী ঝুঁকে খাতায় লিখে নিল। শিবশঙ্কর বলল, ”থার্টি পারসেন্ট নয়, লিখুন ফর্টি ফাইভ পারসেন্ট। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে লুচির সঙ্গে প্যাকেটটাও কি খেয়ে ফেলবে? ওটা তো ফেলতেই হবে, তাতে বোধহয় দূষণ হবে না।”
শিবশঙ্করের চিমটিটা বলরাম হজম করে নিল।
মলয়া বলল, ”আর কারও যদি কোনও প্রস্তাব থাকে, বলতে পারেন।”
”আমার একটা প্রস্তাব আছে।” পল্লবী গুহ গলা পরিষ্কার করার জন্য ছোট্ট করে কেশে নিয়ে বলল, ”পড়াশুনোয় এই স্কুল কলকাতার সেরা দশটা স্কুলের একটা। মাধ্যমিক—উচ্চচ মাধ্যমিকের রেজাল্টই তা বলে দিচ্ছে। পড়াশুনোর সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক কাজ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সমাজের, দেশের মঙ্গল হয় এমন একটা কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন, যা অন্যান্য স্কুলকে ইনস্পায়ার করবে।”
সারাঘর কৌতূহলে উদগ্রীব। পল্লবী সেটা উপভোগ করে বলল, ”রক্তদান শিবির।”
সত্যশেখরের প্রবেশ দেখে যতটা হোঁচট খেয়েছিল সভা, এবার চিৎপাত হয়ে পড়ল।
এই প্রথম সত্যশেখর কথা বলল, ”বলেন কী! এই সব নাবালিকাদের শরীর থেকে রক্ত টেনে নেবেন? পুলিশে ধরবে যে!” দাঁড়িয়ে উঠে সে সভাপতির উদ্দেশ্যে বলল, ”ইওর অনার, এই প্রস্তাব অনৈতিক এবং আইনবিরুদ্ধ। কোনওমতেই এটা মানা যায় না।”
পলাশবরণ ঘোষ বহু বছর পর ‘ইওর অনার’ শুনে প্রসন্ন মনে বললেন, ”প্রস্তাব খারিজ।”
পল্লবী দাঁড়িয়ে উঠে তীব্র স্বরে বলল, ”এখনও আমার বক্তব্য পুরোটা শোনা হল না, তার আগেই খারিজ! এটা পুরো অগণতান্ত্রিক।”
সভাপতি বিব্রত হয়ে বললেন, ”আপনি আপনার বক্তব্য শোনাতে পারেন।”
”নাবালিকাদের রক্ত টানার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছা আমার নেই। তাদের অভিভাবকদের রক্ত নেওয়ার জন্য শিবির হোক। বাবা—মায়েরা স্বেচ্ছায় এসে রক্ত দিয়ে যাবেন, এটাই আমার প্রস্তাব।”
পল্লবী গুহ বসে পড়ে এক গ্লাস জল চাইল। মিশিরজি তাড়াতাড়ি টুলে বসা থেকেই চাপা গলায় ফাইভ এ—ওয়ান ঘরের দিকে মুখ করে বলল, ”গিরি, জল এক গ্লাস।”
গিরিবালা প্রস্তুত ছিল। দশ সেকেন্ডের মধ্যে জলভর্তি গ্লাস একটি প্লেটের উপর রেখে ঘরে ঢুকে সত্যশেখরের সামনে দাঁড়াল। তার মনে হয়েছে, আলুথালু চুল, গেঞ্জিপরা, মোটাসোটা লোকটিরই বোধহয় তেষ্টা পেয়েছে।
”আমাকে নয়, ওনাকে।” সত্যশেখর পাশে বসা পল্লবী গুহকে দেখাল। তারপর বলল, ”আমার রক্ত জল হয়ে গেছে ওনার প্রস্তাব শুনে।”
পল্লবী গ্লাস হাতে নিয়ে বলল, ”জল নয়, জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেছে। এবার ওটা গলাবার জন্য চা খান।” বলেই এক চুমুকে গ্লাস খালি করে দিয়ে বলল, ”মাডাম কি চায়ের ব্যবস্থা রেখেছেন?”
