”কিচ্ছু অন্যায় হয়নি, ও ছোটবেলা থেকে আমাকে চেনে এবং জানে।”
কলাবতী ভেবেছিল কাকা রেগে উঠবে, তার বদলে এমন ঠান্ডা নিশ্চিন্ত স্বরে বলল কিনা, বড়দি অন্যায় বলেনি। তার গালের অভিমান চুপসে গেল।
”চেনে, জানে বলে দিদিদের কাছে তোমাকে ঝামেলাবাজ বলে পরিচয় দেওয়াবেন? না কাকা, এটা বড়দির খুব অন্যায় হয়েছে, আমার গার্জেনকে অপমান করেছেন।”
”মলু যে একথা বলেছে, তার প্রমাণ তো মায়ের মুখে শোনা অনামিকার কথা?” এবার ব্যারিস্টার সত্যশেখরের গলা বেরিয়ে এল। ”অনামিকার মা অন্নপূর্ণাদি যদি বলে, আমি এসব কথা বলিনি এবং বলবেই, হেডমিস্ট্রেসকে কে আর চটাতে চাইবে, তা হলে তুই কিচ্ছু বলতে পারবি না তোর বড়দির এগেনস্টে। আমি বিশ্বাস করি, হান্ড্রেড পারসেন্ট করি, মলু আমাকে ঝামেলাবাজ বলেছে, বলার অনেক ভ্যালিড রিজ ন আছে, সেসব তুই জানিস না, জেনে কাজও নেই। যাই হোক, মিটিংয়ে আমি যাব। ওরা কী বলে শুনব, তারপর যা বলার বলব।”
জুবিলির জন্য গণতান্ত্রিক মিটিং
মিটিংয়ের ব্যবস্থা হয়েছে টিচার্স রুমে। যে ক’টা চেয়ার আছে তার সঙ্গে আরও কয়েকটি রাখা হয়েছে, দুটি টেবলও। স্কুল পরিচালন সমিতির প্রেসিডেন্ট পলাশবরণ ঘোষ বসেছেন ঘরের একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা একটি টেবলে। তার পাশের চেয়ারে হেডমিস্ট্রেস মলয়া মুখোপাধ্যায়, তার পাশে ব্রততী বেদজ্ঞ, তার সামনে টেবলে রাখা একটা নতুন খাতা, মলাটে মোটা অক্ষরে লেখা ‘প্ল্যাটিনাম জুবিলি প্রস্তুতি সভার কার্যবিবরণী ও অভিভাবকদের প্রস্তাবাদি।’
এদের উলটোদিকের দেওয়াল ঘেঁষে সারি দিয়ে রাখা অভিভাবকদের জন্য পাঁচটি চেয়ার ও একটি টেবল। একটি চেয়ার বাদে বাকিগুলি পূর্ণ। প্রেসিডেন্টের ডান দিকের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা চেয়ারগুলিতে বসেছে কয়েকজন শিক্ষিকা। ঘরের মাঝখানটা ফাঁকা। দরজায় টুলে বসে চতুরানন মিশির, হেডমিস্ট্রেসের খাসবেয়ারা। পাশের ঘরটা ক্লাস ফাইভ এ—ওয়ান। সেখানে দশটি কাচের গ্লাস, জলের ড্রাম ও একডজন সফট ড্রিঙ্কের বোতল নিয়ে বসে আছে টিচার্স রুমের তত্ত্বাবধায়িকা গিরিবালা ঢালি। ব্রততীর কড়া নির্দেশ তাকে দেওয়া আছে, ”বোতলের মিষ্টি জল শুধু বাইরের লোকেদের দেবে। কোনও দিদিকে নয়, এমনকী বড়দিকেও নয়, দু’জন ছাত্রীকেও নয়। ওদের জন্য শুধু ড্রামের খাওয়ার জল।”
গিরিবালা জানতে চায়, ”পেসিডেনবাবুকে মিষ্টি জল দোব তো?”
ব্রততী তিন—চার সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বলে, ”দেবে, উনি বাইরের লোক।”
মলয়া ঘড়ি দেখল। চারটে বাজতে তিন মিনিট। একটা চেয়ার এখনও ফাঁকা। চেয়ারটা সত্যশেখরের জন্য। বাকিরা এসে গেছে। মলয়া হাতছানি দিয়ে কলাবতীকে ডাকল। কলাবতী বুঝে গেছে বড়দি কেন ডেকেছে। চেয়ার থেকে উঠে এসে সে মলয়ার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ”সাড়ে তিনটেয় ঘুম থেকে উঠে দাড়ি কামাতে বসল দেখে এসেছি। তারপর চা খাবে।”
”তারপর সাড়ে চারটের সময় হেলতে—দুলতে আসবে। সাধে কি বলি ঝামেলাবাজ।” ফিসফিস এবং কিড়মিড় করে মলয়া বলল।
”বড়দি আপনি অপেক্ষা করবেন না, ঠিক চারটের শুরু করে দিন।” কলাবতী নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল। ব্রততী ওদের কথা শুনছিল, সে মাথা নেড়ে অনুমোদন করল।
বলরাম দত্ত, এম এল এ, তিনিও ঘড়ি দেখছিলেন। বললেন, ”ম্যাডাম আর এক মিনিট, আশা করি ঠিক সময়েই সভা আরম্ভ করে কর্মসংস্কৃতি রক্ষা করবেন।”
”অবশ্যই।” গম্ভীর এবং কঠিন স্বরে মলয়া বলল।
মলয়ার দুটো গলা। একটা থেকে স্কুলে বেরোয় লিডস ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল সায়েন্সের ডক্টরেট ছাপ লাগা ‘বড়দি’ গলা এবং স্কুল থেকে বেরোলেই অন্যটা থেকে বকদিঘির মুখুজ্জেবাড়ির মেয়ে, মিষ্টি নরম ভিতু—ভিতু ‘মলু’ গলা। দুটো গলাকেই কলাবতী চেনে ছোটবেলা থেকে।
”এবার আমাদের সভা আরম্ভ হচ্ছে।” স্কুলের সবচেয়ে সিনিয়র টিচার ব্রততী বেদজ্ঞ দাঁড়িয়ে উঠে বলল, ”আমি প্রস্তাব করছি আমাদের স্কুলের প্রেসিডেন্ট, মানে ম্যানেজিং কমিটির প্রেসিডেন্ট হাইকোর্টের জজ শ্রী…”
মলয়া ফিসফিস করে বলল, ”হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বলুন।”
”মার্জনা করবেন, হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি, আমাদের প্রেসিডেন্ট শ্রী পলাশবরণ ঘোষ মহাশয়কে আজকের সভায় পৌরোহিত্য করার জন্য প্রস্তাব করছি।”
স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে উঠে অন্নপূর্ণা পাইন বলল, ”আমি এই প্রস্তাব সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করছি।”
অত্যন্ত মনোযোগে ব্রততী খাতা খুলে প্রথম প্যারাটি লিখে ফেলল। তারপর বলল, ”আমি এবার সভা পরিচালনার জন্য মাননীয় সভাপতি মহাশয়কে অনুরোধ জানাচ্ছি।”
অনুষ্ঠানসূচি লেখা একটা কাগজ ব্রততী এগিয়ে দিল সভাপতির দিকে। প্লাস পাওয়ারের চশমা চোখে লাগিয়ে তিনি কাগজে চোখ বুলিয়ে বললেন, ”এবার প্রধানশিক্ষিকা আজকের সভার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনাদের অবহিত করাবেন।”
মলয়া গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করল, ”মাননীয় সভাপতি ও আমন্ত্রিত অভিভাবকরা, আমার সহকর্মী ও ছাত্রীরা, আপনারা জানেন আমাদের স্কুল পঁচাত্তর বছর পূর্ণ করবে সামনের জুলাই মাসে। এই পল্লির কয়েকজন শিক্ষাব্রতীর চেষ্টায়, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে, পল্লিবাসীর সক্রিয় সহযোগিতায় তেরোটি মেয়ে নিয়ে স্কুলের যে চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল, আজ তা এগারোশো ছাত্রীর মহীরুহে পরিণত…”
