”অবশ্যই।” এই বলে মলয়া ব্রততীর দিকে তাকাল। ব্রততী ঘাড় নাড়ল।
অন্নপূর্ণা বলল, ”আমাদের প্রণতি খুব ভাল নাচত, স্কুলে ঢুকে আর বিয়ে করে নাচ ছেড়ে দিয়েছে। ওকে বলুন না, ‘চণ্ডালিকা’ কি ‘তাসের দেশ’টা মেয়েদের দিয়ে করাতে। আমাদের অনেক মেয়ে তো খুব ভাল নাচে।”
মলয়া অবাক হয়ে বলল, ”প্রণতি নাচত? কই ওকে দেখে তো মনে হয় না! আচ্ছা,জিজ্ঞেস করব। ব্রততীদি, আর কাদের মিটিংয়ে ডাকা উচিত ঠিক করে একটা লিস্ট করে ফেলুন, খুব লম্বা লিস্ট যেন না হয়। আমি একটা চিঠি ড্রাফট করছি, সেটা জেরক্স করে কুরিয়ার মারফত পাঠাতে বৃন্দাবনবাবুকে বলে দেবেন।”
”কুরিয়ার কেন, ডাকে পাঠালেই তো হয়।” অসীমা বলল।
”ওই যে বললুম, ঝামেলা পাকাবার লোক সবাই। অন্তত একজন তো আছেই, বলে বসবে চিঠি পাইনি।”
”কে বড়দি, কে?” অসীমা বলল।
”নামটা তো আমি প্রথমেই বলে দিয়েছি, সত্যশেখর সিংহ, কলাবতীর কাকা।”
”আপনি চেনেন?” আবার অসীমার প্রশ্ন।
”হাড়ে—হাড়ে, সেই ছোটবেলা থেকে।”
মলয়া মুখটা কঠিন করে বুঝিয়ে দিল, আজকের মতো আলোচনা শেষ।
সত্যশেখর মেনে নিল সে ঝামেলাবাজ
কথামতো বৃন্দাবনবাবু কুরিয়ার মারফত সত্যশেখর, বলরাম দত্ত, পল্লবী গুহ, জনপ্রিয় গণসঙ্গীত গায়ক অরুণাচল সেনগুপ্ত এবং সিমেন্ট ব্যবসায়ী শিবশঙ্কর হালদারকে চিঠি পাঠালেন। সত্যশেখর বাদে এদের সবার মেয়ে এই স্কুলে পড়ে। ব্যারিস্টার সত্যশেখর অবিবাহিত। বাবা—মা মরা কলাবতীর একাধারে সে কাকা এবং প্রিয় বন্ধু। কুরিয়ারের লোক দুপুরে চিঠি দিতে যায় সত্যশেখরকে। তখন গৃহকর্তা, সত্তরোর্ধ্ব, বিপত্নীক, প্রাক্তন জমিদার কলাবতীর ঠাকুর্দা রাজশেখর ঘুমোচ্ছেন, সত্যশেখর কোর্টে, কলাবতী স্কুলে এবং মুরারী তাস খেলতে গেছে পাশের মালোপাড়ায়। বাড়িতে ছিল অপুর মা। যার পিতৃদত্ত নাম করুণাময়ী।
সদর দরজা খুলে অপুর মা দেখল একটা লোক, যাকে সে চেনে না। তাকে বলা আছে, দুপুরবেলা কোনও অচেনা লোক এলে দরজা খুলবে না। মুশকিল হয়েছে, দরজা না খুললে সে জানবে কী করে লোকটা চেনা না অচেনা। একটা আই—হোল দরজায় আছে বটে কিন্তু সেটা এমন উচ্চচতায় যে, সে ফুটোয় লাগানো কাচে চোখ লাগাতে পারে না।
”কী চান?”
”একটা চিঠি আছে সত্যশেখর সিনহার নামে। উনি আছেন?”
”ছোটকত্তা তো এখন কোটে। আপনি সন্ধেবেলায় আসুন।” ডাকাতটাকাত নয়, এটা অপুর মা বুঝে গেছে। তাই গলা অমায়িক করে বলল।
”আপনি চিঠিটা সই করে নিন।” বলল লোকটি।
মহা ফাঁপরে পড়ে গেল অপুর মা। কিন্তু এটা তো লোকটার কাছে ফাঁস করা যাবে না যে, সই করতে তার কষ্ট হবে।
”সইটই করাতে হলে সন্ধের পর আসুন। ছোটকত্তা তখন থাকবেন।”
”আপনিই রাখুন না সই করে।” লোকটি বলল।
কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে অপুর মা হাত বাড়াল, ”দিন।”
লোকটি একটা কাগজ আর ডটপেন এগিয়ে ঘরকাটা একটা জায়গা দেখিয়ে বলল, ”এই জায়গায়, আর ফোন নম্বরটাও লিখে দেবেন।”
কাগজ—কলম হাতে নিয়ে অপুর মা এধার—ওধার তাকাল। কাগজটা রেখে সই করবে, এমন একটা উঁচু জায়গা খুঁজে না পেয়ে অবশেষে হাঁটু গেড়ে বসে মেঝেয় কাগজটা রেখে সেই ছোট্ট দেড় ইঞ্চি চৌকো জায়গায় কলম ঠেকিয়ে সে বিড়বিড় করে তার নামের বানানটা ঝালিয়ে নিতে লাগল। পাঠশালায় পড়ার সময় সে কোনওক্রমে ‘করুণাময়ী” লিখতে শিখেছিল। বাবা সাতকড়ি মোদক তখন বলেছিল, ‘অনেক শিখেছিস, আমাদের বংশের তুই প্রথম মেয়ে নিজের নাম লিখতে শিখলি। এবার রান্নাটা শেখ।’ তারপর চারটি দশক কেটে গেছে, অপুর মা শুধু হাতা আর খুন্তি ধরেছে, কলম ধরেনি। বাংলা হরফের চেহারাগুলোও এখন আর মনে নেই।
প্রথমে সে ‘ক’ লিখল। যেটা দেখতে ‘ফ’—এর মতো হল এবং চৌকো জায়গার অর্ধেকটা সেই ‘ফ’ দখল করে নিল। এরপর সে ‘র’ লিখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ‘র’—কে ‘রু’ করল এবং চৌকো ঘরটা এই দুটি অক্ষরেই ভরে গেল। ফ্যালফ্যাল করে কুরিয়ারের দিকে তাকিয়ে অপুর মা বলল, ”কী হবে! আর তো জায়গা নেই।”
কুরিয়ার অভিজ্ঞ লোক, হেসে বলল, ”ওতেই হবে। ফোন নম্বর কত?”
”তা তো জানি না। ফোন এলে ধরি, কথা বলি। কাউকে ডেকে দিতে বললে ডেকে দিই।”
”ঠিক আছে। চিঠিটা যার নামে, তাকে দিয়ে দেবেন।”
অপুর মা খামটা বিকেলে রাজশেখরের হাতে দিয়ে বলল, ”কত্তাবাবা, ছোটকত্তার এই চিঠিটা পিওন দিয়ে গেল দুপুরে, আমি সই করে নিয়েছি।” ‘সই’ শব্দটার উপর অপুর মা একটু বেশি জোর দিল।
সন্ধ্যাবেলায় সত্যশেখর চিঠিটা পড়ে কলাবতীকে ডেকে বলল, ”কালু, তোদের স্কুলের প্ল্যাটিনাম জুবিলি, তিনদিন ধরে চলবে অনুষ্ঠান। প্রোগ্রাম ঠিক করার জন্য গার্জেনদের মিটিং ডেকেছে মলু, রোববার বিকেল চারটেয়।”
”জানি। ছাত্রীদের তরফ থেকে আমি আর ধুপু মিটিংয়ে থাকব।”
”তা থাকিস, কিন্তু গার্জেনরা কেন? প্রোগ্রাম তো স্কুল—কমিটিরই ঠিক করার কথা।”
”ক্লাস সেভেনের অনামিকার কাছে শুনলুম, ওর মা অন্নপূর্ণাদি বাড়িতে বলেছেন, বড়দি চেয়েছেন সবার মতামত নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অনুষ্ঠানের সূচি ঠিক করতে, যাতে ভবিষ্যতে ঝামেলা না হয় আর ঝামেলাবাজ লোক হিসেবে বড়দি প্রথমেই সত্যশেখর সিংহর নাম করেছেন। কাকা, এটা কিন্তু বড়দির খুব অন্যায় হয়েছে।” অভিমানে কলাবতীর গাল ফুলে উঠল।
