মলয়া মাথা নেড়ে জানাল, জানে না।
”আমিও জানি না। সেটা জানার জন্যই ওদের দিয়ে এবার ফাংশন করুন। নাচ, গান, নাটক, আবৃত্তি…” ব্রততী থমকে আইটেম খুঁজতে লাগল।
অন্নপূর্ণা পাইন ওদের কথা শুনছিল। সে যোগ করল, ”শ্রুতিনাটক, গীতিআলেখ্য, বৃন্দগান, সমবেত আবৃত্তি। এবারে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে আমাদের হাউজি.ংয়ের মাঠে শ্রুতিনাটক হয়েছিল। কী বলব ব্রততীদি, কী ভাল যে হয়েছিল, কী হাততালি আর কী হাততালি!”
”কী শ্রুতিনাটক হয়েছিল?” ব্রততী জিজ্ঞেস করল।
”কচ ও দেবযানী।”
”কারা করল?” আবার জিজ্ঞাসা ব্রততীর।
”অনামিকা আর ওর বাবা। ওদের দিয়ে এটা করান না।” অন্নপূর্ণার স্বর আদুরে শোনাল।
অনামিকা অন্নপূর্ণার মেয়ে, এই স্কুলেই ক্লাস সেভেনে পড়ে। বয়স তেরো।
ব্রততী অবাক হয়ে বলল, ”ওইটুকু মেয়ে হল দেবযানী আর তার বাবা কচ? পারল করতে?”
”কেন পারবে না! অনামিকা তো আবৃত্তির কোচিং নেয় নবকুমার ঘোষের স্কুলে, হপ্তায় একদিন। নবকুমার খুব নামকরা আবৃত্তিকার। আমেরিকায় গিয়ে বাঙালিদের মুগ্ধ করে এসেছে।”
অন্নপূর্ণা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, মলয়া থামিয়ে দিয়ে বলল, ”ব্রততীদি, এটা খুব স্পর্শকাতর ব্যাপার। অনেকের অনেকরকম মত, ইচ্ছা থাকতে পারে। আমার মনে হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আইটেম নির্বাচন করা উচিত। ভবিষ্যতে তা হলে সমালোচনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।” এই বলে মলয়া তাকিয়ে রইল ঘরের অন্যান্যদের দিকে।
আরতি ঘটক, সদ্য বিয়ে হয়েছে, প্রায় দৌড়ে ক্লাসে আসে, ঘণ্টা পড়ে গেলেও পড়িয়ে যায়, মেয়েরা ঝালমুড়ি কিনে আরতির জন্যও এক ঠোঙা কেনে। এহেন ছাত্রীপ্রিয় আরতি বলল, ”গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটা কী বড়দি?”
”সবাইয়ের মতামত দিয়ে সিদ্ধান্তে আসা।”
অন্নপূর্ণা বলল, ”সবাইটা কে?”
মলয়া বলল, ”আমরা সব টিচার, গার্জেনরা, ম্যানেজিং কমিটির মেম্বাররা মিলে ঠিক করব। এজন্য একটা মিটিং ডাকতে হবে। ব্রততীদি, আপনি কনভেনর। একটা চিঠি ড্রাফট করুন, করে আমায় দেখান।”
আরতি বলল, ”ছাত্রীদের তরফে কেউ ওই মিটিংয়ে থাকবে না?”
মলয়া লজ্জিত স্বরে বলল, ”ইসস, ভুলেই গেছলুম, অবশ্যই থাকবে। অনুষ্ঠান তো ওরাই করবে। ব্রততীদি, টেন আর টুয়েলভ থেকে একজন করে থাকবে। কে থাকবে, সেটা আপনার বিবেচনামতো ঠিক করবেন।”
অসীমা দত্ত, যার স্বামী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিধায়ক কিন্তু নিজে রাজনীতির ধারেকাছে নেই, বলল, ”বড়দি এগারোশো মেয়ের এগারোশো গার্জেন—আপনি ক’জনকে ডাকবেন? প্রত্যেকের মতামত নিলে তো এগারোশো মতামত, পারবেন সামলাতে? তার চেয়ে বলি, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটা ঝুলি থেকে বের না করে ঝুলিতেই রেখে দিন। বেছে—বেছে কয়েকজন গার্জেনকে ডাকুন। গাজন নষ্ট হয় অধিক সন্ন্যাসীতেই। ভবিষ্যতে ঝামেলা পাকাতে পারে, এমন লোকেদেরই ডাকুন। আমি লিস্টি করে ব্রততীদিকে দোব।”
মলয়া বলল, ”আমি এক্ষুনি তোমায় একটা নাম দিতে পারি—সত্যশেখর সিংহ, কলাবতীর গার্জেন। এমন ঝামেলাবাজ লোক তুমি দুটি পাবে না।”
অসীমা বলল, ”আমিও একটা নাম দোব, পল্লবী গুহ।”
”ওহহো, সেই সমাজসেবিকা!” মলয়া প্রায় আঁতকে উঠে বলল, ”গার্জেনস মিটিংয়ে যিনি মেয়েদের চরিত্ররক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন। অবশ্যই ওঁকে চিঠি দেবে। অসীমা, তুমি কোনও নাম দেবে?’
গম্ভীরমুখে অসীমা বলল, ”মিস্টার দত্ত, আমার কর্তা।”
সবাই অবাক হয়ে তাকাল অসীমার দিকে।
”ওনাকে দূষণে পেয়েছে।” নির্বিকার স্বরে অসীমা বলল, ”শব্দদূষণ, দৃশ্যদূষণ, বায়ুদূষণ তো আছেই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সংস্কৃতিদূষণ। ব্রততীদি, কী বলব আপনাকে, দুলু একটা রাহুল দ্রাবিড়ের রঙিন পোস্টার কিনে এনে বৈঠকখানার দেওয়ালে সেঁটেছিল। ঘরটা সদ্য সাদা রঙে পেন্ট করা হয়েছে। ওর বাবা ছবিটা খুলে দিল! বলল, ‘দৃশ্যদূষণ হচ্ছে। সাদা নির্মলতার প্রতীক, এই দেওয়ালে কোনও ছবি থাকবে না।’ শাশুড়ি কানে কম শোনেন, টিভি তাই একটু জোরে চালাতে হয়। ব্যস, সেটা হয়ে গেল শব্দদূষণ, ভলিউম কমাও। দরজা—জানলা বন্ধ করে মা এখন টিভি দেখেন।”
”আর বায়দূষণ?” অন্নপূর্ণার কৌতূহল উপচে পড়ল মিটিমিটি হাসিতে।
”কলকাতার বাতাসে অক্সিজেন কমে গেছে গাছ কেটে ফেলার জন্য। আর সেজন্যই বৃষ্টি হচ্ছে না, ফুসফুস আর হার্টের অসুখ বাড়ছে। গাছ লাগাও, যেখানে ফাঁকা জায়গা পাবে গাছের চারা বসাও। বাড়ির ছাদে এখন তেত্রিশটা টব, তাতে নয়নতারা, গাঁদা, জবা থেকে গোলাপ, বেল, এমনকী পালংশাকও। ছাদে পা রাখার জায়গা নেই। রোজ তেত্রিশটা টবে জল দেওয়া সোজা কথা। এম এল এ—বাড়িতে জলটা একটু বেশিই আসে, তাই রক্ষে।”
”সংস্কৃতিদূষণটা কী ব্যাপার?” মলয়া উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে বলল।
”এখুনি কাজটা করে ফেলতে হবে, এক সেকেন্ডও দেরি করা চলবে না। দেরি করলেই অপসংস্কৃতির ক্যাটিগরিতে সেটা পড়ে যাবে। তা হলেই সেটা হবে সংস্কৃতিদূষণ।”
”উনি এসব মেনে চলেন?” মলয়ার স্বরে সন্দেহ।
”চলতে চেষ্টা করেন খুব। এই তো গত রোববার, পাড়ার মাঠে ফুটবল ফাইনালে প্রধান অতিথি হয়ে গেছলেন ট্রফি দিতে। কার্ডে লেখা ছিল পাঁচটায় খেলা শুরু। পাঁচটা পাঁচ, তখনও দুটো টিম মাঠে নামেনি আর সভাপতিও এসে পৌঁছয়নি। উনি গটমট করে বাড়ি চলে এলেন। বললুম, ‘কী হল, কাপ শিল্ড না দিয়েই চলে এলে যে? বললেন, ‘কর্মসংস্কৃতির গোড়ার কথা সময় মেনে চলা, না চললে সেটায় দূষণ ছড়ায়। সেটাই বন্ধ করা দরকার, ওরা বুঝল কিনা জানি না।’ বড়দি, এই লোককে আগে ডাকুন, নইলে প্ল্যাটিনামকে ঝামেলায় ফেলে দেবে।”
