”বলদেবদা আপনারা কী করবেন এবার?”
”করব মানে? কী আবার করব, এই পাগলের চিঠি কি রেখে দেব নাকি? একটা তুচ্ছ সামান্য ব্যাপার নিয়ে লোকটা যে লখনউ—দিল্লি করবে কে জানত! লোকটা সম্পর্কে তুমি ইন্টারেস্ট দেখিয়েছিলে বলেই ফোন করলুম। ভবদা তো চিঠিটা ফেলেই দিচ্ছিল।”
”পরিমল বেরা যদি প্রমাণ নিয়ে আসে?”
”খেপেছ তুমি! জীবনে আর বঙ্গবাণীমুখো হবে না। এসব লোক আমার জানা আছে।”
”যদি কোনও প্রমাণ পাঠায়, আমাকে কি একবার জানাবেন?”
”জানাব।”
ওদের কথোপকথন ওইখানেই শেষ হল।
কলাবতীর স্কুল খুলে গেছে। পড়াশোনা নিয়ে সে ব্যস্ত। সাংবাদিকতা, বঙ্গবাণী, ময়দান, স্পোর্টস ডেসক— এসব তার কাছে এখন আবছা হয়ে আসছে। স্কুলে বড়দির সঙ্গে দেখা হলেই তার অস্বস্তি হয়, এই বুঝি ঝুপুকে স্টেফি গ্রাফ করে তোলার প্রসঙ্গটা উঠবে। কিন্তু ওঠেনি। অবশেষে একদিন সে বড়দির ঘরে গিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করল, ”ঝুপুর বাবা—মার সঙ্গে আপনি কথা বলবেন বলেছিলেন।”
”বলেছি।” মলয়া মুখার্জি চিঠি পড়া বন্ধ করে গম্ভীর মুখটা তুললেন, ”ওঁরা আর আমার মুখ দেখবেন না বলেছেন।…. কিন্তু কালু, তুমি যা বুঝেছ সেটাই ঠিক। মন খারাপ কোরো না।” আবার তিনি চিঠি পড়া শুরু করলেন।
মনটা সত্যিই তার খারাপ হয়ে গেল। বড়দির সঙ্গে আত্মীয়—বিচ্ছেদ ঘটল তারই জন্য। তার চেয়েও খারাপ লাগছে, বাচ্চচা ঝুপুকে একটা টেনিস রোবট বানাবার জন্য ওর বাবা—মায়ের হাস্যকর, অবুঝ এবং লোভী চেষ্টা দেখে।
রবিবার কাকার সঙ্গে ইভনিং শো—এ সিনেমা দেখতে গেছল কলাবতী। চার্লি চ্যাপলিনের ‘গোল্ড রাশ’। বাড়ি ফিরতেই রাজশেখর জানালেন, ”কালু, বঙ্গবাণী থেকে বলদেব ব্যানার্জি নামে একজন তোকে ফোন করেছিল। তোকে জানিয়ে দিতে বলল, ”ফর্টিএইট ওলিম্পিক ট্রায়ালের রেজাল্টের একটা ফোটোস্ট্যাট কপি ওরা ডাকে পেয়েছে। কোথা থেকে এসেছে সেটা ওরা জানে না। তবে একটা চিরকুট আঁটা ছিল, তাতে লেখা ‘অনেক চেষ্টায় এইটুকুমাত্র জোগাড় করিতে পারিয়াছি।’ তলায় নাম লেখা পরিমল বেরা।”
শোনা মাত্র কলাবতী আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ”ইয়াহ। দাদু লোকটা কথা রেখেছে।”
রাজশেখরকে কিন্তু উৎফুল্ল দেখাল না। মৃদুস্বরে তিনি বললেন, ”কালু, মুশকিল হয়েছে একটাই। ট্রায়ালে যারা নিজেদের ইভেন্টে প্রথম হয়েছে শুধু তাদেরই নাম ছাপা হয়েছে, তাতে হেনরি রেবেলোরও নাম আছে।”
”আর তার জাম্পের ডিসট্যান্সটা?” কলাবতী নিজেই যেন এবার লাফিয়ে উঠবে এমন ভাবে সে হাত মুঠো করে শরীরটা কুঁকড়ে স্প্রিংয়ের মতো গুটিয়ে নিল।
”নেই। কারও ডিসট্যান্স, টাইমিং কি হাইট, কিছুই নেই। শুধুই প্রথম হওয়াদের নাম।”
”ধীরে—ধীরে আলগা হয়ে এল কলাবতীর শরীর। দু’চোখে ফুটে উঠল গভীর দুঃখ। শুধু বলল, ”বেচারা!”
রাজশেখর বললেন, ”তবু পরিমল চেষ্টা করেছে নিজের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য। দুঃখ করার কিছু নেই কালু, এটাই হল স্পোর্টসম্যানের কাজ।” নাতনিকে বুকে টেনে তিনি মাথায় হাত বুলোলেন।
”দাদু, কালই আমি পরিমল বেরার কাছে যাব। ওকে অপমান করে কথা বলে এসেছি, মাফ চাইব। ফোটোস্ট্যাটে রেবেলোর লাফাবার ডিসট্যান্স নাই থাকুক, আমি বিশ্বাস করি পরিমল বেরাই সত্যি।”
”বহু বছর ওকে দেখিনি, কাল ভোরে জগিং করতে—করতে আমরা দু’জনেই যাব।”
ভোরেই ওরা জগ করতে—করতে চুয়াল্লিশের এফ—এর সামনে পৌঁছল। টিনের দরজাটা খোলাই রয়েছে। এখানকার মানুষ ভোরেই উঠে পড়ে কাজে বেরনোর জন্য। রাজশেখরকে দেখে একতলায় লোকেরা অবাক হয়ে গেল। এই ধরনের চেহারার মানুষ মাঠকোটায় কখনও আসেনি।
”দাদু, তুমি আর উঠো না, আমি ওকে ডেকে আনছি।” এই বলে কলাবতী সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।
পরিমল বেরার ঘরের দরজাটা খোলা। কিন্তু কী আশ্চর্য, ঘরে যে একটা বউ! তক্তপোশটায় একটা বাচ্চচা কাত হয়ে ঘুমোচ্ছে। ঘরে কিছু জিনিসপত্রও রয়েছে। স্টোভে ভাত ফুটছে। ঝাঁট দেওয়া বন্ধ রেখে অবাক হয়ে বউটি তাকিয়ে।
”এখানে পরিমল বেরা থাকেন না?”
”থাকত, এখন আর থাকে না।” বারান্দায় উবু হয়ে বসে আঙুল দিয়ে দাঁত মাজছে যে লোকটি, সে—ই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”ঘরটা আমাকে দিয়ে গেছে। পরিমল বেরাকে কী দরকার, টাকা ধার করেছিল?”
”না, ধার করেনি, তবে আমার ওকে ভীষণ দরকার।”
”ছবির ফ্রেম করতে দিয়েছিলেন? কিন্তু দোকান তো বেচে দিয়েছে।”
”সে কী?”
”কী একটা খুব জরুরি কাজে ধারধোর করে লখনউ গেল, আমার কাছ থেকে নিয়েছে দেড়শোটা টাকা। বললুম, কী এমন জরুরি কাজ পরিমলদা? বলল, সে তুই বুঝবি না। তারপর ক’দিন বাদে ফিরে এসে বলল, কাজ হয়নি, দিল্লি যেতে হবে। দোকানটা বেচে টাকা নিয়ে দিল্লি সেই যে গেল তো গেলই, আর ফিরে আসেনি। বুড়ো বয়সে কী যে ভীমরতি ধরল, দোকান কি কেউ বেচে?”
”কোথায় ওকে পাব, বলতে পারেন?”
”না।” লোকটি ঘরে ঢুকে গেল।
অসাড় মাথা নিয়ে এক—পা এক—পা করে কলাবতী নীচে নেমে এল।
”কী হয়েছে কালু, পরিমল…” রাজশেখর নাতনির মুখ দেখে ব্যস্ত স্বরে বললেন।
”এখানে আর থাকে না।… চলো দাদু।”
ধীরে—ধীরে জগ করে ছোটার মধ্যেই রাজশেখর আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন, কলাবতীর চোখ দুটি জলে ভেজা, ছলছল দৃষ্টি।
”কালু, তোর কী হল? চোখে জল!”
”দাদু, আমার আনন্দ হচ্ছে। কী যেন হারিয়েছিলাম। মানুষকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এখন আবার পারছি।”
কলাবতীর শক্তিশেল (২০০৫)
কলাবতীর শক্তিশেল (২০০৫) – মতি নন্দী / প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ২০০৫ / আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা ৯ পৃ. ১১০। মূল্য ৭৫.০০ প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কৃষ্ণেন্দু চাকী / উৎসর্গ: চিকিৎসক দম্পতি শান্তি ও গুরুসদয় ভট্টাচার্যকে। স্নেহ ও প্রীতি সহকারে।
কাঁকুড়গাছি উচ্চচমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্ল্যাটিনাম জুবিলি উপলক্ষে স্কুলের মেয়েদের নিয়ে নানারকম অনুষ্ঠান করার কথা ভেবেছে মলয়া। সে এই স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। ভাবনাটা প্রথম সে জানায় ভূগোলের ব্রততী বেদজ্ঞকে। শুনেই পৌনে ছ’ফুট লম্বা, পঞ্চাশ কেজি ওজনের ব্রততী বলে উঠেছিল, ”দারুণ হবে বড়দি। বাইরের লোককে দিয়ে ফাংশন করানো আর স্কুলের মেয়েদের দিয়ে করানোয় অনেক তফাত। কত প্রতিভা এই স্কুলে আছে জানেন?”
