”পরিমল বেরা, এফ বাড়িতে থাকেন।”
”ওই সামনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায়, প্রথম ঘরটাই। সাবধানে উঠবেন।”
সিঁড়িটার একদিকে ধরার কাঠ খসে পড়েছে, একটা ধাপে কাঠের পাটা নেই। দোতলায় পৌঁছেই দেখল সামনের প্রথম ঘরটার দরজা আধ—ভেজানো। পাল্লার ফাঁক দিয়ে কলাবতী পরিমল বেরাকে দেখতে পেল। তক্তপোশে চিত হয়ে পাঁজির মতো একটা বই পড়ছে। পরনে সবুজ চেক লুঙ্গি, খালি গা। কলাবতী দরজায় টোকা দিল। পরিমল উঠে বসল।
”আপনি!” তাড়াতাড়ি দড়িতে টাঙানো পাঞ্জাবিটার দিকে হাত বাড়িয়ে পরিমল বেরা আবার বলল, ”বসুন।”
”বসতে আসিনি। শুধু একটা কথা জানবার জন্যই এসেছি।” কলাবতী তীব্র চোখে তাকাল। পরিমল বেরার অবাক ভাবটা তখনও ঘোচেনি। অস্ফুটে বলল, ”কী কথা?”
”বলে এসেছিলেন পেপার কাটিং দেখাবেন, দেখিয়ে এসেছেন?”
পরিমল বেরা মাথা নাড়ল, ”না।”
”তা হলে অত জোর দিয়ে বলে এসেছিলেন কেন? কোথায় সেই পেপার কাটিং? মিথ্যা কথাগুলো বলতে আপনার কি লজ্জা করল না? ভেবেছিলেন, আপনার মুখের কথা শুনেই বঙ্গবাণী লিখে দেবে, বরুণ বসুরায় বাহবা নেওয়ার জন্য হেনরি রেবেলোকে চিট করেছে।… আসলে আপনি একটা ঈর্ষাপরায়ণ, জেলাস লোক। বরুণ বসুরায়কে খাটো করার জন্য ধাপ্পা দিতে গেছলেন। এক অ্যাথলিটের মর্যাদা আর—এক অ্যাথলিট রক্ষা করবে, এটা কর্তব্য। …কর্তব্যের নমুনাটা তো খুব দেখালেন… আসলে আপনার মতো লোকেরাই স্পোর্টসের সম্মান নষ্ট করে, অ্যাথলিটদের মর্যাদা নষ্ট করে।” মেশিনগানের মতো কথার বুলেট ছুড়ে গেল কলাবতী। রাগে তার সারা শরীর কাঁপছে।
পরিমল বেরার লম্বা দেহটা কথায় ঝাঁঝরা হয়ে সামান্য নুয়ে পড়েছে। চোখে—মুখে অসহায় লজ্জা।
”বলেছিলুম ঠিকই। কিন্তু কাটিং রাখা খাতাটা খুঁজে পেলুম না… এত বছর পর, কোথায় যে…” পরিমল বেরা ঘরের চারদিকে চোখ বোলাল। কলাবতীও ঘরটা দেখল।
কোনও কিছু হারিয়ে যাওয়ার উপায় নেই এই ঘরে। একটা কেরোসিন স্টোভ, হাঁড়ি, থালা—বাসন, হ্যারিকেন, মসলার কৌটো, জলের কলসি, গ্লাস ও বালতি ছাড়া আর কিছু নেই। এর মধ্যে কোনও খাতা লুকিয়ে থাকতে পারে না। তক্তায় একটা ওয়াড় ছাড়া তেলচিটচিটে বালিশ, সুজনি আর পাট করে রাখা মশারি। ওখানেও খাতা থাকলে খুঁজে পাওয়া যাবে।
পরিমল তক্তপোশের তলা থেকে একটা টিনের বাক্স টেনে বের করে ডালাটা খুলে দেখাল। ”এর মধ্যে রেখেছিলুম।”
পাটকরা একটা ধুতি আর সাদা পাঞ্জাবি, ছোট কয়েকটা মোড়ক, পাকিয়ে রাখা কাগজ ছাড়া কলাবতী বাক্সে আর কিছু দেখতে পেল না।
”ঠিক সময়েই দেখছি আপনার জিনিস হারায়।” রাখঢাক না করেই কলাবতী কথাগুলোয় ব্যঙ্গের বিছুটি মাখিয়ে দিল, ”অজুহাতটা ভালই দিলেন, হারিয়ে গেছে।”
যন্ত্রণায় পরিমল বেরার মুখটা কুঁকড়ে গেছে। নিরুপায় দুই মুঠি বুকের কাছে। ”বিশ্বাস করুন, আমাকে বিশ্বাস করুন, আমি কাউকে ছোট করার জন্য, কাদা ছিটোবার জন্য এসব বলিনি। সত্যিই রেবেলো সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফিয়েছিল, বরুণ নয়।”
”এখন এসব বলে কী লাভ?”
”আমার কিছু বলার নেই। আপনার কথার জবাব দেওয়ার মুখ আমার নেই।” অপরাধীর মতো পরিমল বেরা মাথা নামিয়ে নিল।
”যেখান থেকে পারুন, লিখিত প্রমাণ এনে দিন।” কলাবতী দরজার দিকে এগিয়ে থমকে ঘুরে বলল, ”সাতদিন অপেক্ষা করব, তার মধ্যে প্রমাণ না দিতে পারলে আপনাকে নিয়ে স্টোরি করব। বঙ্গবাণীতে ওটাই হবে আমার শেষ লেখা।”
কলাবতী সিঁড়ি দিয়ে নামতে—নামতে ঘুরে দাঁড়াল। ঘর থেকে পরিমল বেরা বেরিয়ে এসেছে। আবেগরুদ্ধ গলায় কলাবতী বলল, ”জানেন, আপনাকে আমি বিশ্বাস করেছিলুম। আমার দাদু, কাকাও বিশ্বাস করেন। আপনি সব ভাল ধারণা ভেঙে দিলেন।”
সিঁড়ি থেকে নেমে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে ওপরে তাকিয়ে দেখল বাজপড়া লোকের মতো পরিমল বেরা দাঁড়িয়ে।
.
”কলাবতী, হ্যালো, আমি বলদেবদা বলছি। আরে একটা মজার ব্যাপার… একটা চিঠি এসেছে দিল্লি থেকে। কে লিখেছে?… পরিমল বেরা। পড়ে শোনাব?”
”পড়ুন।”
”চিঠিটা ক্রীড়া—সম্পাদককে লেখা। ‘মাননীয়েষু, সাতদিনের মধ্যে প্রমাণ দাখিল করিতে না পারার জন্য আমি যৎপরোনাস্তি লজ্জিত ও দুঃখিত।’ কলাবতী, বানান— টানানগুলো কিন্তু ফোনে আর বলছি না, বুঝে নিয়ো। হ্যাঁ, তারপর লিখেছে, ‘লখনউয়ে দুইটি ইংরাজি, একটি উর্দু ও একটি হিন্দি কাগজের অফিসে গিয়াছিলাম। কিন্তু চল্লিশ বছরেরও অধিক কালের কাগজ ইহাদের কাহারও কাছে পাইলাম না। তাহারা বলিল, দিল্লি গিয়া খোঁজ করিতে, সেখানে বড়—বড় কাগজের অফিস রহিয়াছে, হয়তো তাহাদের কাছে আটচল্লিশ সালের কাগজ থাকিতে পারে। তাই আমি দিল্লি আসিয়াছি। কিন্তু লখনউ ট্রায়ালের সময় এখানে বড় কোনও খবরের কাগজের অফিস ছিল না। একটি—দুটি যাও বা ছিল, তাহারা কাগজ উঠাইয়া দিয়াছে। একজন আমাকে একটি লাইব্রেরির কথা বলিল, যেখানে পুরাতন খবরের কাগজ রাখা আছে। টাকা দিলে নাকি সেখানে খবরের কাগজ হইতে ছবি তুলিয়া দেয়। আমি কাল সেখানে যাইব। ইতিমধ্যে দয়া করিয়া আমার সম্পর্কে কিছু লিখিবেন না। আমাকে আরও কয়েকটি দিন সময় দিন। আশা করি, আমার এই প্রার্থনা আপনি মঞ্জুর করিবেন। আপনি মহানুভব, তাই আশা করি কয়েকটা দিন ভিক্ষা নিশ্চয়ই দিবেন। নমস্কার জানিবেন। ইতি—আপনার বশম্বদ শ্রীপরিমলকুমার বেরা।’ কলাবতী শুনলে তো?”
