”দাদু, এই ‘কর্তব্য’ শব্দটা আজ দ্বিতীয়বার শুনলুম, প্রথমার শুনেছি পরিমল বেরার মুখ থেকে। হেনরি রেবেলোকে খাটো করে বরুণ বসুরায় ওর কৃতিত্বটাকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়াতেই ওর মনে হয়েছে রেবেলোকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হল না। কী বলল জানো দাদু? এক অ্যাথলিটের মর্যাদা অন্য অ্যাথলিট রক্ষা করবে, এটাই তো কর্তব্য। ভাবতে পারো!”
রাজশেখর কিছুক্ষণ কলাবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলেন, ভাবতে পারেন না।
.
”হ্যালো, স্পোর্টস? বলদেবদা আছেন? আমি কলাবতী বলছি।”
”কে, কলাবতী নাকি? আমি ভবদা।”
”ওহহ ভবদা, কেমন আছেন? একটা ব্যাপারে বলদেবদাকে ফোন করছি, উনি আছেন?”
”এখনও ফেরেনি মাঠ থেকে। তা তুমি আর আসছ না কেন? ভালই তো কাজ করছিলে, বাংলাটাও অনেক ইমপ্রুভ করেছিলে। রোজ না পারো মাঝে—মাঝে তো আসতে পারো, ফিচার—টিচারও তো লিখতে পারো। তা বলদেবকে কী জন্য দরকার?”
”দরকারটা খুবই সামান্য। পরিমল বেরা নামে কোনও লোক পেপার কাটিং নিয়ে দেখাতে এসেছিল কিনা সেটাই জানতে চাইছিলুম।”
”আরে বরুণ বসুরায় নামে পুরনো আমলের এক অ্যাথলিট তো ক’দিন আগে এটা নিয়ে আমায় ফোন করেছিল। কিন্তু কোনও পেপার কাটিং নিয়ে কেউ তো আমার কাছে আসেনি!”
”আসেনি। অথচ খুব বড় মুখ করে বলে গেল, এনে দেখাবে। লোকটা তা হলে দেখছি ধাপ্পা দিতে এসেছিল।”
”এই রকম অনেক লোকই আমাদের কাছে আসে। আসলে জেলাসি থেকেই ওরা এইসব বলে। মনুষ্য চরিত্র বোঝা বড় শক্ত, কলাবতী।”
”হ্যাঁ ভবদা, দু’দিনেই আমি সেটা একটু—একটু বুঝেছি। আচ্ছা, এখন আমি রাখছি, একদিন যাব।”
ফোন রেখে কলাবতী বিষণ্ণ মনে হাসল। কেন জানি পরিমল বেরাকে তার সাচ্চচা মানুষ বলে মনে হয়েছিল। যখন বলছিল ‘এটাই তো কর্তব্য’, তখন ওর চোখে কেমন একটা আলো জ্বলে উঠেছিল। যেরকম আলো কলাবতী কখনও দেখেনি। গভীর অনুভব ছাড়া অমন আলো জ্বলতে পারে না। অথচ আজ আটদিন হয়ে গেল পরিমল বেরা বঙ্গবাণীতে যায়নি। ভবনাথদাই হয়তো ঠিক, মনুষ্য চরিত্র বুঝতে তার অনেক বাকি।
কয়েকদিন পর সুচরিতা এসে কলাবতীকে নিমন্ত্রণ করল। তার ভাইপোর অন্নপ্রাশন, দুপুরে খাওয়া। একমাত্র কলাবতী ছাড়া ক্লাসের আর কাউকে সে বলেনি। রাত্রে কলাবতী নিমন্ত্রণের কথাটা তুলে দাদু আর কাকার কাছে জানতে চাইল। ”কী উপহার দেওয়া যায় বলো তো? সোনার বালা কি আংটির কথা বোলো না। ওসব সেকেলে উপহার এখন চলে না।”
”একটা বারবি ডল কিনে দে।” সত্যশেখর মুহূর্তে সুপারিশ করে ফেললেন।
”পুতুলটুতুল! ভেঙে ফেলবে দু’দিনেই।” কলাবতী নাকচ করে দিল।
”একটা সিল্ক কি গরদের ফ্রক।” রাজশেখর এমনভাবে বললেন যেন কেনা প্রায় হয়েই গেছে।
”ক’দিন আর পরবে? দেখতে—দেখতে তো বড় হয়ে যাবে।”
রাজশেখরও নাকচ হলেন।
”তা হলে একটা ট্রাইসাইকেল।” দ্বিধাভরে সত্যশেখর প্রস্তাব দিলেন।
”ছ’মাসের ছেলে ট্রাইসাইকেল চালাবে! বলছ কী?”
ছেলেকে লজ্জিত হতে দেখে রাজশেখর এগিয়ে এলেন তাকে লজ্জামুক্ত করতে। ”তা হলে প্যারাম্বুলেটর। সেটা তো ওকে চালাতে হবে না।”
”কলকাতায় এখন কেউ প্র্যাম ঠেলে না। রাস্তায় যা গর্ত, বাচ্চচার হাড়গোড় আর আস্ত থাকবে না।”
”একটা ফার্স্ট এইড বক্স দিলে কেমন হয়?” সত্যশেখর নড়েচড়ে বসলেন। ”শুধু বাচ্চচার কেন, বাড়ির লোকেরও কাজে লাগবে।”
রাজশেখর ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ”তা হলে বরং গোটাচারেক বেবি ফুডের কৌটো দেওয়া…” নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি থেমে গেলেন।
”এমন একটা কিছু বলো, যেটা দিলে সারাজীবন আমাকে মনে রাখবে।” কলাবতী অধৈর্য হয়ে বলল।
ওঁরা দু’জন চিন্তায় ডুবে গেলেন। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে ভয়ে—ভয়ে সত্যশেখর প্রায় দমবন্ধ অবস্থায় বললেন, ”একটা কম্পিউটার… না, না, না অনেক দাম, তার থেকে বরং একটা অভিধান দিলে কেমন হয়? সারাজীবন বাচ্চচাটার কাজে লাগবে, তোকেও মনে রাখবে।”
লাফিয়ে উঠল কলাবতী। ”হাতে করে নিয়ে যেতেও আমার সুবিধে হবে। কাকার ওরিজিনালিটির ধারেকাছে কেউ আসতে পারবে না, তাই না দাদু?”
অবশেষে ইংরেজি থেকে বাংলা একটা অভিধান হাতে কলাবতীকে দেখা গেল অবিনাশ কবিরাজ লেন দিয়ে হেঁটে সুচরিতার বাড়ির দিকে যেতে। বাড়িটা সে চেনে। হাঁটতে—হাঁটতে একটা পানের দোকানে সার দেওয়া মহাদেব, কৃষ্ণ, হনুমান ও রামের ছবি দেখে তার ছবি বাঁধাইয়ের দোকানগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। আর সঙ্গে—সঙ্গে সে বলে উঠল, ”আরে, চুয়াল্লিশের এফ—এ তো পরিমল বেরা থাকে! একবার খোঁজ নিয়ে দেখলে কেমন হয়?”
যেমন ভাবা তেমনই কাজ। খুঁজে বের করতে তার মোটেই অসুবিধে হল না। সুচরিতাদের বাড়ি ছাড়িয়ে দুটো মোড় ঘুরে একতলা চুয়াল্লিশের—ডি বাড়িটা। তারপর দোতলা একটা মাঠকোটা যার নম্বরের সঙ্গে রয়েছে ই এবং এফ। একপাল্লার টিনের দরজা দিয়ে ঢুকে সরু একটা পথ, যার দু’ধারে করোগেটেড টিন আর শালকাঠ দিয়ে তৈরি দুটো দোতলা বাড়ি। খোলা কাঁচা নর্দমা। ঘরগুলোর সামনে দড়িতে শুকোচ্ছে প্যান্ট, শার্ট, শাড়ি। রান্না হচ্ছে শোবার ঘরেই। কাঠের সোজা সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।
কলাবতী ফাঁপরে পড়ল। কোন বাড়িটা ‘এফ’? একটি বউ তার ঘর থেকে উঁকি দিয়ে কলাবতীকে এতক্ষণ দেখছিল। এবার সে জিজ্ঞেস করল, ”কাকে চাই আপনার?”
