”তুমি বরং ডেসকে বসেই কাজ করো।”
কলাবতী চেয়ার থেকে উঠে অস্ফুটে বলল, ”দেখি।”
পায়ে—পায়ে সম্পাদকের ঘর থেকে সে বেরিয়ে এল। পরেশ এসে গেছে। কলাবতীকে দেখেই একগাল হেসে বলল, ”মাঠ থেকে ফিরলে?”
”হ্যাঁ। বাগুইহাটি—কদমতলা ম্যাচ ছিল।”
”রেজাল্ট কী?”
”ড্র।”
পরেশ ছোট্ট একটা পেয়ারা বাড়িয়ে ধরল। ”নাও, আমার গাছের। তোমার জন্যই এনেছি।”
পেয়ারাটা হাতে নিয়ে তার চোখে প্রায় জল এসে গেল। সামান্য ফল কিন্তু অসামান্য আন্তরিকতা। এটাই সে এখন চাইছে।
”স্কুল খুলে যাচ্ছে পরেশদা। এখন আর রোজ আসতে পারব না।”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়, সবার আগে লেখাপড়া।”
কলাবতী বাড়ি ফিরল একটু দেরি করে। ইচ্ছে করেই বঙ্গবাণী অফিস থেকে সে বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে এসেছে অস্থির মনকে শান্ত করার জন্য। হাঁটতে—হাঁটতে একটা ব্যাপার সে ঠিক করে ফেলেছে, মাঠের লোকেদের কাছে হেরে যাওয়া মানেই পৃথিবীর লয় নয়। সে মোটেই দুঃখে ভেঙে পড়বে না। জীবনে যা আসবে সেটা হাসিমুখে সহজভাবে নেবে।
যখন সে ফটক ছাড়িয়ে বাড়িতে ঢুকল, তখন তার মনে কোনও খেদ, কোনও বিদ্বেষ বা কষ্ট আর নেই। দাদু আর কাকাকে সে জানিয়ে দিল, খেলার রিপোর্টার হওয়ার ইচ্ছেটা আপাতত সে মুলতুবি রাখছে। বুদ্ধিটা আর—একটু পরিপক্ব না হলে মাঠের লোকেদের সঙ্গে এঁটে ওঠা যাবে না।
”তবে আজ একটা অদ্ভুত লোককে দেখলুম, যে নিজে এককালে ট্রিপল জাম্পার ছিল।”
”আগে যাকে বলা হত হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প?” এই বলে সত্যশেখর জানিয়ে দিলেন অ্যাথলেটিকসের খবরটবর তিনি রাখেন।
”হ্যাঁ, আগে তাই বলা হত। এই লোকটির নাম পরিমল বেরা।”
”পরিমল বেরা?” রাজশেখর ঔৎসুক্য দেখালেন। ”ভাল অ্যাথলিট ছিল। আমাদের বরুণের সঙ্গে ওর খুব কম্পিটিশন হত।”
”আমাদের বরুণ মানে!” কলাবতী অবাক হয়ে গেল। ”বরুণ বসুরায়?”
”হ্যাঁ রে, গোবিমাসিমার দেওর বরু! আমার থেকে বয়সে কিছু ছোট। খুব চালিয়াতি কথাবার্তা বলত। আমাকে বলেছিল লন্ডন ওলিম্পিকে যাওয়ার জন্য সিলেক্ট হয়েছিল, কিন্তু গোড়ালিতে চোট লাগে ফাইনাল জাম্পটা দেওয়ার সময়, তাই ও নিজেই নাম উইথড্র করে নিয়ে ওলিম্পিকে যায়নি।”
”উইথড্র না কচু। ট্রায়ালেই কোয়ালিফাই করতে পারেনি। লখনউয়ে সেই ট্রায়ালে পরিমল বেরাও নেমেছিল। বরুণ বসুরায়ের একটা ইন্টারভিউ কিছুদিন আগে বঙ্গবাণীতে বেরিয়েছে। তাতে বলেছে, সাড়ে আটচল্লিশ ফুট নাকি ট্রায়ালে লাফিয়েছিল। পরিমল বেরা আজ বঙ্গবাণীতে এসে বলল, ওটা হেনরি রেবেলো লাফিয়েছিল। তখনকার ওয়ার্ল্ড ক্লাস জাম্প। সে আর বরুণ লাফিয়েছিল রেবেলোর থেকে চার ফুট কম, সাড়ে চুয়াল্লিশ। তখনকার পেপার কাটিং ওর কাছে আছে, এনে দেখাবে।”
”বরুণের স্বভাবটা দেখছি বুড়ো বয়সেও পালটায়নি। ভাবল এত বছর পর কে আর ধরতে পারবে, তাই গুলটা মেরে দিল।” রাজশেখর মিটমিট করে হাসলেন।
সত্যশেখর বললেন, ”এর একটা প্রতিবাদ ছাপিয়ে দিক পরিমল বেরা।”
”বললেই কি বঙ্গবাণী ছাপাবে?” কলাবতী প্রায় বলদেবের ভঙ্গি নকল করল। ”প্রমাণ চাই না?”
”কারেক্ট। সতু যে ব্যারিস্টারি করে কীভাবে, বুঝতে পারি না। প্রমাণ ছাড়া কোনও প্রতিবাদ গ্রাহ্য হয়?” রাজশেখরকে খুবই ক্ষুব্ধ দেখাল।
মাথাটা চুলকে আড়চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে সত্যশেখর বললেন, ”বরুণ বসুরায়ও কি প্রমাণ দেখিয়ে দাবি করেছে সাড়ে আটচল্লিশ লাফিয়েছিল?”
”নিশ্চয় প্রমাণ দিয়েছে। আচ্ছা, আমি এখনই ওকে ফোন করে জেনে নিচ্ছি।” রাজশেখর মার্চ করার ভঙ্গিতে ফোনের কাছে গেলেন। তিন মিনিট খোঁজাখুঁজি করে ডাইরেক্টরি থেকে নম্বরটা বের করে ডায়াল করলেন।
অতঃপর রাজশেখরের তরফে সংলাপটা এইরকম হল :
”হ্যালো, এটা কি বরুণ বসুরায় মশাইয়ের বাড়ি?… হ্যাঁ ওকেই চাইছি… আরে বরু, কী সব আজেবাজে কথা ইন্টারভিউয়ে বলেছিস? আমি রাজুদা কথা বলছি… দুম করে বলে দিলি লখনউয়ে সাড়ে আটচল্লিশ ফুট ট্রায়ালে লাফিয়েছিস… গোবিমাসি বাতের কথা বলেছিলেন, আমি তো কোবরেজ দেখাতে বলেছি, দেখিয়েছেন কি?… কী বলছিস? সাড়ে আটচল্লিশই। তা হলে পরিমল বেরা যে বলছে ও আর তুই দু’জনেই সাড়ে চুয়াল্লিশ… হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওর কাছে তখনকার পেপার কাটিং আছে। বঙ্গবাণীতে গিয়ে দেখিয়ে এসেছে…. ট্রায়ালে নয়? কী বললি, প্র্যাকটিসে সাড়ে আটচল্লিশ করেছিস? সেটা তা হলে বলিসনি কেন? বুঝতে না পেরে ভুল করে লিখে দিয়েছে বললেই হল? …পরিমল ধরাধরি করে লখনউ ট্রায়ালে গেছল, ওর ট্রেন ভাড়া কি ওর রানিং শু্যটা তোরই দেওয়া, এসব কথা এখন অবান্তর। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না রে, গন্ধ বেরোবেই। রেবেলোর ডিসট্যান্সকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়াটা খুবই অন্যায়। না না বরু, এই বয়সে এটা ভাল কাজ করিসনি। তুই নিজেই ভুল স্বীকার করে কাগজে একটা চিঠি দে। …কেউ প্রতিবাদ করলে তবেই দিবি? আচ্ছা, তাই দিস। আর শোন, গোবিমাসিকে কোবরেজ দেখাতে বলবি। রাখছি তা হলে।”
ফোন রেখে একগাল হেসে রাজশেখর বললেন, ”আমার গুলটা কেমন হল কালু। যেই বলেছি, পরিমল বঙ্গবাণীতে গিয়ে কাটিং দেখিয়ে এসেছে, অমনই বাছাধন স্বীকার করল ট্রায়ালে করিনি, প্র্যাকটিসে করেছি। ব্যাপারটা কী জানিস কালু, আমি তো সত্তর পেরিয়ে গেছি, এখন কোনও বুড়োকে জেনেশুনে মিথ্যা কথা বলতে দেখলে লজ্জা করে। আর লজ্জা করেছে বলেই আমার কর্তব্য বরুকে দিয়ে এটা শুধরে নেওয়ানো।”
