”হ্যাঁ, এনে দেখাব, নমস্কার।”
পরিমল চলে যাওয়ার পর কলাবতী বলল, ”অদ্ভুত লোক, না?
”মাথায় ছিট আছে।”
”থাকতে পারে, তবে ছিটেল লোকেরাই কিন্তু আমাদের নাড়া দেয়। একজন অ্যাথলিটের মর্যাদা অন্যজন রক্ষা করবে, এমন কথা জীবনে কখনও শুনিনি, আপনি শুনেছেন?”
বলদেব কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ধীরে—ধীরে মাথা নাড়ল। ”দেখি কী কাটিং আনে।”
”অত জোর দিয়ে বলল যখন, নিশ্চয় আনবে।” কলাবতী প্যাডের কাগজে হাত মুছে, বোতল থেকে জল খেল। দেওয়াল—ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে, খাতাটা খুলে প্যাডটা টেনে নিল।
এখন সে বাগুইহাটি—কদমতলা ম্যাচটা সম্পর্কে লিখবে। শ্যামাপদ আর গুচাবাবুর সঙ্গে তার যা কথাবার্তা হয়েছে সেগুলো মনে করার জন্য সে কয়েক মিনিট মাথা নামিয়ে চোখ বন্ধ করল। মাথার মধ্যে একটা টেপ রেকর্ডারের চলা যেন শুরু হল। দু’জনের প্রতিটি কথা সে শুনতে পাচ্ছে। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে মাঠটাকে। গোরু চরছে, দড়ি দিয়ে ঘেরা পিচ, একধারে রবারের বলে ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে, মাঠের পাশের বাড়িগুলো, দু’ধারের রাস্তা, কিন্তু দু’জন আম্পায়ার আর শাদা ট্রাউজার্স ও শার্টপরা তেরোটা মানুষকে সে খুঁজে পাচ্ছে না।
কলাবতী ঠিক করল, এইখান থেকেই সে লেখাটা শুরু করবে।
.
তিন পাতা লিখে ফেলে প্যাডের নতুন পাতার ওপরের কোণে চার সংখ্যাটা সবে লিখেছে, তখন সম্পাদকের বেয়ারা এসে কলাবতীকে বলল, ”আপনাকে ডাকছেন।”
কলাবতী প্রায় চমকে উঠল। ”কে ডাকছেন!”
”এডিটর।”
বেয়ারা চলে গেল। বলদেব বার্তা বিভাগে গিয়ে গল্প জুড়েছে। কলাবতী তার লেখা তিনটি পাতা ঝোলার মধ্যে ভরে, ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে, সম্পাদকের ঘরে এল দুরু—দুরু বক্ষে।
মধ্যিখানে সিঁথি—কাটা চুলে সদানন্দ দু’হাতের তেলো আলতো করে বুলোচ্ছিলেন। চশমাটা টেবলে। সেটা তুলে চোখে দিয়ে একগাল হেসে বললেন, ”বোসো বোসো। তারপর কাজকম্ম কেমন চলছে? ভাল লাগছে? ভব বলছিল, তুমি তো বাংলা ভালই লেখো, পরিশ্রমও করতে পারো। এরকমই তো চাই। না ঘুরলে, না খাটলে শুধু টেলিফোন করে—করে খবর জোগাড় করলে জার্নালিস্ট হওয়া যায় না। ঘোরো, হাঁটো… বসে থেকো না, ঘুরে—ঘুরে খবর খুঁজে বেড়াও। আজকে কি বেরিয়েছিলে?”
”হ্যাঁ। বাগুইহাটি গেছলুম।” সদানন্দর কথা তাকে উৎসাহিত করেছে। সে উত্তেজিত স্বরে দ্রুত বলে গেল। ”জানেন, কী দারুণ একটা খবর আজ পেলুম! ম্যাচ খেলাই হয়নি, অথচ খেলা হয়েছে বলে স্কোরবইয়ে ভুয়ো রান, উইকেট, টোটাল, এমনকী ম্যাচটা ড্র বলে লেখাও হয়ে গেল আর তাতে দু’জন আম্পায়ার সইও করে দিয়েছেন। ভাবতে পারেন, এটা লিগের খেলা! খেলার মাঠে এর চেয়ে ঘৃণ্য আর কিছু কী হতে পারে? আর কোনও কাগজের লোক ভাগ্যিস যায়নি। আমি একাই খবরটা পেয়ে গেছি।”
কলাবতী জ্বলজ্বল চোখে সম্পাদকের দিকে তাকাল। টানা কথাগুলো বলে সে হাঁফিয়ে পড়েছে। সে আশা করছে সম্পাদকও ওইভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে রিভলভিং চেয়ারটাকে ডাইনে—বাঁয়ে ঘোরানো বন্ধ করে খাড়া হয়ে বসবেন। কিন্তু সদানন্দ ঘোষ তা করলেন না।
”এটা তো একটা দুর্নীতির ব্যাপার।” সদানন্দ অনুত্তেজিত গলায় বললেন।
”নিশ্চয়। জালিয়াতি, চিটিং।” কলাবতী আরও উত্তেজিত।
”সিরিয়াস, খুবই সিরিয়াস অভিযোগ তুমি করতে যাচ্ছ দুটো ক্লাব আর আম্পায়ারদের বিরুদ্ধে। কীভাবে তা হলে লিখবে?”
”এই দেখুন না, লেখাটা প্রায় হয়েই গেছে।” কলাবতী ব্যস্ত হয়ে ঝুলি থেকে তিনটি পাতা বের করে এগিয়ে দিল।
তিন পাতা লেখা পড়ার পর ঈষৎ চিন্তিত মুখে সদানন্দ বললেন, ”তুমি যা—যা লিখেছ, কোর্টে যদি ওরা যায় তা হলে প্রমাণ দাখিল করতে পারবে?”
”নিশ্চয়। স্কোরশিটটাই প্রমাণ। তা ছাড়া শ্যামাপদ, শ্রীশ, দু’জন আম্পায়ার—।”
সদানন্দর মাথা নাড়া দেখে কলাবতী থেমে গেল। ”ওরা নিজেদের বাঁচাবার জন্য বলবে কোনও স্কোরশিটই তৈরি হয়নি, সেরকম কিছু সি এ বি—তে জমাও পড়েনি। সুতরাং বঙ্গবাণী মিথ্যে কথা লিখেছে। এর পর ওরা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মানহানির মামলা করবে।”
”তা কী করে হয়! আমি নিজের চোখে স্কোরবুকে যা দেখলুম সেটা ভুল?”
”হ্যাঁ, ভুল। এইমাত্র বাগুইহাটির প্রেসিডেন্ট, আমারই সম্পর্কিত ভাগ্নে টেলিফোনে পুরো ব্যাপারটাই জানিয়ে বলল, স্কোরবই থেকে দুটো পাতা ওরা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে আর আম্পায়াররা সি এ বি—কে রিপোর্ট করেছে, রাত্রে কারা পিচ খুঁড়ে দেওয়ায় ম্যাচটা খেলানো যায়নি। সুতরাং ভুয়ো স্কোরশিট বানানো হয়েছে বলে যদি কালকের বঙ্গবাণীতে খবর বেরোয় তা হলে আপনারা বিপদে পড়ে যাবেন।” সদানন্দর মুখে বিষণ্ণ একটা হাসি, চোখেও দুঃখের ছায়া। তিনি বিশ্বাস করেন কলাবতী যা দেখেছে এবং লিখেছে তার শতকরা একশো ভাগই সত্যি। কিন্তু তিনি নিরুপায়। নাতনির বয়সী মেয়েটির মনের অবস্থাটা তিনি বুঝতে পারছেন। প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে, টগবগিয়ে একটা কিছু করে দেখাবার ইচ্ছেটা যে কীভাবে মিইয়ে আসে, সেটা এখন তিনি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছেন।
বিধ্বস্ত কলাবতী মাথা নামিয়ে বসে রয়েছে। সে বুঝে গেছে তার লেখাটা আর ছাপা হবে না। একটা ফাঁপানো বেলুন ছাড়া তার বুকের মধ্যে আর কিছু যেন এখন নেই। মাথা নাড়ল সে। সাংবাদিক হওয়ার শখ ঘুচে গেছে। আজই শেষ। খেলার মাঠ বড় নোংরা লাগছে তার, দমবন্ধ হয়ে আসছে।
