”আপনার নাম?” কলাবতী জিজ্ঞেস করল।
”পরিমল বেরা।… সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফিয়েছিল রেবেলো। তখন ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ছিল জাপানের তাজিমার, সাড়ে বাহান্ন ফুট, বার্লিন ওলিম্পিকে করা।”
”আপনি বলতে চান বরুণ বসুরায় সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফাননি? মিথ্যে কথা বলেছেন?” বলদেব সতর্কভাবে ধীরে—ধীরে কথাটা বলল উকিলের জেরা করার ভঙ্গিতে।
”না, লাফায়নি। আমি আর বরুণ দু’জনেই সাড়ে চুয়াল্লিশ করেছিলুম। তাই দূরত্বটা আমার ভালই মনে আছে। রেবেলোর ধারেকাছে আমরা তিনটে জাম্প করেও যেতে পারিনি।” অত্যন্ত দৃঢ় এবং তৃপ্তস্বরে পরিমল কথাগুলো বলল। ”অসাধারণ পারফরমান্স!”
”বরুণ বসুরায় একটা অডিট ফার্মের মালিক, মানী লোক। তাঁকে মিথ্যেবাদী বলতে হলে প্রমাণ দাখিল করতে হবে।… আপনি কী করেন?” বলদেব তাচ্ছিল্যভরে কথা বলে লোকটির আপাদমস্তক চোখ বোলাল।
পরিমল এই প্রথম যেন কুঁকড়ে গেল। একটু দ্বিধাভরে বলল, ”আমি বিশেষ কিছু করি না, সামান্য একটা ব্যবসা।”
”কিসের ব্যবসা?”
”ছবির ফ্রেমের ব্যবসা।”
”তার মানে ছবি—বাঁধাইয়ের?”
”হ্যাঁ।”
”কোথায় ব্যবসাটা?”
”আমি যেখানে থাকি, তার কাছেই।”
”কোথায় থাকেন?”
”চুয়াল্লিশের এফ অবিনাশ কবিরাজ লেন, বাগমারিতে।”
কলাবতীদের বাড়ি থেকে বাগমারি বেশি দূরে নয়, বড়দিদের বাড়ি তো ওখানেই, আর অবিনাশ কবিরাজ লেনে থাকে তাদের ক্লাসেরই সুচরিতা। এই বৃদ্ধ তার এলাকারই লোক, কলাবতী ব্যাপারটায় তাই কৌতূহলী হয়ে উঠল।
”লাফিয়েছিলেন সাড়ে চুয়াল্লিশ আর থাকেন চুয়াল্লিশ নম্বরে, অদ্ভুত যোগাযোগ তো!” কলাবতী হালকা স্বরে বলল। পরিমল হাসল। নীচের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই।
”তা এখন কী করতে হবে?” বলদেব ভ্রূ তুলে জানতে চাইল, ”প্রতিবাদ ছাপাতে হবে?”
”না, না, না, এমন কিছু বিরাট ব্যাপার এটা নয় যে, চিঠি ছাপতে হবে। আমি কতটা লাফিয়েছিলুম তা জেনে এখন কার কী লাভ! আর জানলেও তাতে আমার এক ছটাকও সম্মান বাড়বে না।”
”কেন, ছেলেমেয়ে, নাতি—নাতনি তারা তো গর্ববোধ করতে পারবে এই বলে যে…” কলাবতী থেমে গেল পরিমলের মুখে ছড়ানো হাসিটা দেখে।
”আমি বিয়েথা করিনি, সংসারেও কেউ নেই।”
”অ, সম্মানটম্মানের দরকার নেই, ভাল কথা। তা হলে কী চান?”
”রেবেলোর সম্মান।”
”কী বললেন!” বলদেব সিধে হয়ে বসল। এতক্ষণ তার যে গড়িমসি ভাবটা ছিল সেটা পরিমলের দুটি শব্দেই খসে পড়ল।
”আসল সাড়ে আটচল্লিশ যে লাফিয়েছিল, তাকে তার প্রাপ্য সম্মানটা দেওয়া হোক, এটাই চাই।”
”বলছেন কী আপনি? চল্লিশ বছরেরও আগে কে একজন একটা লাফ মেরেছিল… বেশ ভাল কথা, সাড়ে আটচল্লিশের কোনও প্রমাণ আছে কি?”
”বরুণ বসুরায়ও কি প্রমাণ দিয়েছে?”
বলদেব মনে—মনে যে বিব্রত হচ্ছে কলাবতী ওর মুখ দেখেই সেটা বুঝে গেল।
”যে লিখেছে সে প্রমাণ দেখেই লিখেছে। বরুণ বসুরায় তাকে পেপার কাটিং দেখিয়েছেন।”
”কোন কাগজের কাটিং?” পরিমল বেরা অবাক হয়ে জানতে চাইল। ”আমার কাছেও কাটিং আছে। ট্রায়ালের পরের দিন লখনৌ হেরাল্ড—এ আমাদের লাফের ডিসট্যান্স দিয়ে রেজাল্ট বেরিয়েছিল। আমি কেটে রেখেছি।”
”আপনার কাছে কাটিং আছে?” বলদেব নিশ্চিত হওয়ার জন্য জোর দিয়ে বলল।
”আমি এনে দেখাতে পারি।” পরিমল জোর দিয়ে বলল।
”বেশ, দেখাবেন এনে।” কথাটা বলে বলদেব সিনেমা ম্যাগাজিনটায় ঝুঁকে পড়ল।
পরিমল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ”আচ্ছা আসি, নমস্কার” বলে চলে যাচ্ছে, তখন কলাবতী পেছন থেকে তাকে ডাকল।
”পরিমলবাবু, শুনুন।”
পরিমল বেরা ঘুরে দাঁড়াল এবং এগিয়ে এল।
”ধরা গেল রেবেলো সাড়ে আটচল্লিশ ফুটই লাফিয়েছিল, কিন্তু সেটা না বললে এত বছর পর কী এসে যায়? আপনারই বা এই নিয়ে এত দুশ্চিন্তা কেন? ওটা তো আর ওয়ার্ল্ড রেকর্ড নয়!” কলাবতী শান্তভাবেই খোঁজ করতে চাইল পরিমলের ‘দুশ্চিন্তা’র।
”কিন্তু তখনকার ওয়ার্ল্ড ক্লাস জাম্প ওটা। রেবেলো ওলিম্পিক ফাইনালে উঠেছিল, গোল্ডও পেতে পারত।” পরিমলের গলায় উচ্ছ্বাস আর তারিফ এসে গেল।
বলদেব ম্যাগাজিন থেকে চোখ তুলে বলল, ”ওলিম্পিকের কথা হচ্ছে না। প্রশ্নটা হল, আপনার কী এমন মাথাব্যথা হল যে, রেবেলোর হয়ে ওকালতি করতে এসেছেন?”
”করব না?” করিমলের কোটরে—ঢোকা চোখজোড়া হঠাৎই দপ করে জ্বলে উঠল। গলায় ফুটে উঠল ব্যগ্রতা। ”একজনের কৃতিত্ব অন্য লোক নিয়ে নেবে! কত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একজন অ্যাথলিট জীবন শুরু করে। দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে, সাধ—আহ্লাদ বর্জন করে, ডিসিপ্লিনড থেকে সে একটু—একটু করে এগোয়। তার এগনো মানে দেশেরও এগনো। এজন্য তো তাকে মর্যাদা, শ্রদ্ধা দেওয়া উচিত। চুরি করে একজন সেটা নিয়ে নেবে আর তাতে আপনারা সাহায্য করবেন?” পরিমলের এই প্রথম গলার স্বর উঠল, তাকে বিচলিত দেখাচ্ছে। চেয়ারের পিঠ ধরে থাকা—মুঠি—জোড়ার শিরা ফুলে উঠেছে।
সে আবার বলল, ”রেবেলো আপনাদের কাগজ পড়বে না, নিশ্চয় বাংলা জানে না। এখন সে কোথায় আছে তাও আমি জানি না। কিন্তু আমি তো আছি, আমি তো জানি। এক অ্যাথলিটের মর্যাদা অন্য অ্যাথলিট রক্ষা করবে, এটাই তো কর্তব্য।”
বলদেব চোখ নামিয়ে নিল। মৃদুস্বরে বলল, ”কাল—পরশুই তা হলে স্পোর্টস এডিটরের কাছে নিয়ে আসুন আপনার কাটিংটা। সত্যি হলে ভুলটা নিশ্চয় সংশোধন করা হবে।”
