”একটু—আধটু কী হয়ে থাকে?” কলাবতী নাছোড়বান্দার মতো কোণঠাসা করতে চাইল গুচাবাবুকে।
”একটু—আধটু ম্যানিপুলেট, একটু—আধটু ম্যানেজ না করলে আমাদের মতো গরিব ক্লাবের টিকে থাকা যায় না। আজকের ম্যাচটা যে খেলা হল না, এতে কারুর কোনও ক্ষতি হয়নি। না বেঙ্গল ক্রিকেটের, না ক্রিকেটারদের, না সি এ বি লিগের, না এই দুটো ক্লাবের। কারুরই পাকা ধানে মই পড়ল না। বাগুইহাটি—কদমতলা অলরেডি নক আউটে উঠে গেছে, এটা ছিল গ্রুপের শেষ লিগ ম্যাচ। পয়েন্ট ভাগাভাগিতে কারুরই কোনও বাড়তি সুবিধে হল না, তা হলে অন্যায়টা কোথায়? বরং একটা ম্যাচ খেলানোর খরচা থেকে, অযথা রোদ্দুরে ছুটোছুটি করার থেকে বাড়িতে গিয়ে ঘুমনো কি সিনেমা দেখা অনেক কাজের!” বলতে—বলতে শ্রীশ মিত্তিরের গলা অন্তরঙ্গ হয়ে এল। একটা বাচ্চচা অবুঝ মেয়েকে সে যেন বোঝাবার চেষ্টা করল কেন এই নোংরামিতে তারা নামে।
কলাবতী চেয়ার থেকে উঠে পড়ল গম্ভীর মুখে। গুচাবাবুকে যেন বিপন্ন—বিপন্ন মনে হল। মুখে অনিশ্চিত ভয়।
”আপনি কি লিখবেন নাকি? প্লিজ লিখবেন না, জানাজানি হলে দুটো ক্লাবই বিপদে পড়ে যাবে, সাসপেন্ড হবে। প্লেয়াররা, আম্পায়াররা শাস্তি পাবে।” গুচাবাবু হাতজোড় করে ফেলল।
”মাফ করবেন। আমার কাজ আমাকে করতেই হবে।” ঘর থেকে বেরোবার জন্য সে পা বাড়াল।
”তা হলে কিন্তু আমরাও ভাবব কী করা যায়।” গুচাবাবু খোলাখুলিই জানিয়ে দিল পেছন থেকে।
”ভাবুন।” কলাবতী হনহনিয়ে এগিয়ে গেল।
রাস্তায় আসামাত্রই সে খালি একটা রিকশা পেয়ে গেল। বাগুইহাটি মোড়ে যাওয়ার জন্য তিন টাকা চাইল রিকশাওয়ালা। একটাকা ভাড়া কমে যাওয়াকে সে ভাল লক্ষণ বলে ধরে নিল। কলাবতী রিকশায় উঠে বসল। আসার সময় ভাঙাচোরা গর্ত ভরা রাস্তা তাকে যে কষ্ট দিয়েছিল, ফেরার সময় সে কিছুই অনুভব করল না। একটা নতুন আনন্দে সে মশগুল। সাংবাদিকরা যে সাফল্য চায় সেটা যে এত তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবে, এটা ভাবতেই মাথার মধ্যে ঢুকে যাওয়া ভীমরুলটা আবার উড়তে লাগল। সে ঠিক করল এখনই বঙ্গবাণীতে গিয়ে লেখাটা লিখতে বসবে। ভেবেচিন্তে দারুণভাবে এটা তাকে লিখতে হবে।
বঙ্গবাণীর খেলার টেবলে তখন বলদেব। পাঁচজনের মধ্যে ওরই বয়স কম। খেলার বই, ম্যাগাজিন পড়ে। কিঞ্চিৎ বিলাসী এবং কাজে ফাঁকি দেওয়ার কোনও সুযোগই নষ্ট করে না। বলদেবের সামনে খোলা রয়েছে একটা সিনেমার ইংরেজি পত্রিকা এবং পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছ’ফুটেরও বেশি লম্বা একটি লোক।
লোকটি খুবই রুগণ, জিরজিরেই বলা যায়। গাল বসে যাওয়া লম্বাটে মুখে কপালটা ছোট, ভ্রূদুটি ঘন এবং চোখজোড়া কোটরে ঢোকা। মাথায় প্রচুর চুল, যা অযত্নে সত্যিই পাখির বাসার মতো, দাড়ি কয়েকদিন কামানো হয়নি। লোকটির দাড়ি এবং চুল কাঁচাপাকা, তবে সাদার ভাবটাই বেশি। ওর পরনে ফিকে খয়েরি রঙের খদ্দরের ঢিলেহাতা পাঞ্জাবিটা চওড়া কাঁধে যেন হ্যাঙ্গারে ঝোলানো মনে হয়। সেটা পরিষ্কার না ময়লা বোঝা শক্ত, তবে ইস্ত্রি করা নয়। ধুতিটা আধময়লা। পায়ে হাওয়াই চপ্পল। গোড়ালির চামড়া ফাটা এবং তার মধ্যে ময়লা জমে আছে। বয়স মনে হয় সত্তরের কাছাকাছি।
লোকটি ঝুঁকে বলদেবকে কিছু একটা বলছে তখন কলাবতী টেবলে ওদের উলটোদিকে বসল। তাকে দেখে বলদেব একটু অবাক হয়ে বলল, ”তুমি এখন?”
”খেলা হয়নি তাই চলে এলাম।”
”কেন, পিচ খুঁড়ে রেখেছে?” তারপর বলল, ”কাদের খেলা ছিল?”
”বাগুইহাটি—কদমতলা।” কলাবতী এইটুকু বলেই ঝোলার মধ্য থেকে স্যান্ডুইচ বের করায় মন দিল।
”হ্যাঁ, কী বলছিলেন যেন?” বলদেব পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে বলল।
”গত বুধবার আপনাদের কাগজে একটা লেখা বেরিয়েছে, বরুণ বসুরায়ের সঙ্গে ইন্টারভিউ।”
কলাবতী চোখ তুলে লোকটির দিকে তাকাল। শঙ্কর দত্ত নামে বাইরের একজন, যে বলদেবেরই বন্ধুর ভাই, ইন্টারভিউ নিয়েছে। অনেকদিন আগের লেখা, কম্পোজ হয়ে পড়ে ছিল। দুটো স্যান্ডুইচের একটা বলদেবের দিকে বাড়িয়ে কলাবতী বলল, ”বলদেবদা খাবেন?”
”নাহ, ভাত খেয়ে আর এখন পাঁউরুটি চিবোতে পারব না। মিষ্টিফিস্টি থাকে তো দাও।”
”নেই। কলা দিতে পারি।”
”দাও।”
কলাটা হাতে নিয়ে সন্তর্পণে খোসা ছাড়াতে—ছাড়াতে বলদেব বলল, ”হ্যাঁ ইন্টারভিউ, তা কী হয়েছে?”
”উনি বলেছেন ফর্টিএইট ওলিম্পিকের জন্য লখনউয়ে যে সিলেকশন ট্রায়াল হয়, তাতে হপস্টেপ অ্যান্ড জাম্পে সাড়ে আটচল্লিশ ফুট নাকি লাফিয়েছিলেন। এটা ভুল কথা।” বিনীত, মৃদু গলায় লোকটি এমনভাবে বলল যে, বলদেব কলায় কামড় দিতে গিয়ে থেমে গেল।
”আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।” কলাবতী বলল।
”হ্যাঁ, হ্যাঁ বসুন।” বলদেব কথাটা বলে কলার আধখানা মুখে পুরল। ”ভুল কথা কেন?”
লোকটি চেয়ারে বসল। একটু কুণ্ঠিত ভাবেই, ইতস্তত করে বলল, ”বরুণ অতটা লাফায়নি।”
”সেটা আপনি জানলেন কী করে? আটচল্লিশ সালে আপনি কি তখন লখনউয়ে ছিলেন?” বলদেব ঝাঁঝালো গলায় বলল।
”ছিলুম।”
শান্ত, নিচু গলায় লোকটি বলল। কলাবতী ও বলদেবের দৃষ্টি একই সঙ্গে প্রখর হয়ে উঠল।
”কী জন্য ছিলেন?” বলদেব প্রশ্নটা করে নড়েচড়ে বসল।
”কম্পিটিটার ছিলুম। আমি, বরুণ আর বোম্বাইয়ের হেনরি রেবেলো হপস্টেপের ট্রায়ালে ছিলুম।”
