”অনেকদূর থেকে আসছি দাদা, একটু বসব। এক গ্লাস জল খাওয়াবেন?” কলাবতী একটা চেয়ার খুলে নিয়ে বসে পড়ল।
মধ্যবয়সী লোকটি কথাবার্তায় অমায়িক এবং ভালমানুষ। যেভাবে কথা বলল, তাতে মনে হয় একটু লেখাপড়া করেছে। ময়দানে মালি বলতে যা বোঝায় সেইরকম নয়। একটি মেয়ে ‘দাদা’ বলেছে, জল চেয়েছে, এতে যেন তাকে খুশি মনে হল।
একটা স্টিলের জাগ তুলে নিয়ে লোকটি ”একটু বসুন, টিউকল থেকে এনে দিচ্ছি” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
টেবল টেনিস বোর্ডের ওপর স্কোরবুকটা পড়ে রয়েছে। কৌতূহলবশতই কলাবতী উঠে গিয়ে তার পাতা ওলটাল। একেবারে শেষ দুটো পাতায় আজকের দুটো দলের খেলার স্কোর লেখা! বোঁওও করে কলাবতীর মাথার মধ্যে একটা ভীমরুল ঢুকে পড়ল।
তাজ্জব ব্যাপার! খেলাই হল না অথচ স্কোরবইয়ে ম্যাচের স্কোর আর রেজাল্ট লেখা! কী করে একটা সম্ভব? কলাবতী আরও অবাক হল দু’জন আম্পায়ারেরই সই রয়েছে দেখে। চোখ কচলে নিয়ে সে আবার স্কোর বইয়ের পাতা দুটো দেখল। বাগুইহাটির সাতজন প্রথম ব্যাট করে তুলেছে ১৬৩ রান। জবাবে কদমতলার পাঁচজন আউট হয়ে ১৪৩ রান। ম্যাচ ড্র! দ্রুত সে ঝোলা থেকে খাতা বের করে টুকতে লাগল।
লোকটি জলভরা জাগ নিয়ে ফিরে, একটা প্লাস্টিকের গ্লাসে জল ঢেলে কলাবতীর হাতে দিয়ে বলল, ”আপনি কি খেলা দেখতে এসেছেন?”
”হ্যাঁ। আমার দাদা কদমতলা ফ্রেন্ডসে খেলে। তার খেলা দেখব বলে এলাম আর কিনা খেলাই হল না!” কলাবতীর গলায় আশাভঙ্গের বেদনা ফুটে উঠল। ”হল না কেন বলুন তো?”
”দুটো টিমই তো খেলতে চাইল না। বলল, এ—ম্যাচে জিতলেও যা, হারলেও তাই। গুচাবাবু আম্পায়ার দু’জনকে বলল, ম্যাচটা না খেললে অনেক টাকা খরচা বাঁচবে। দয়া করে আপনারা ম্যানেজ করে দিন। ছেলেরাও খেলতে চাইছে না। কদমতলার ক্যাপ্টেন বলল, স্কোর আমরা বানিয়ে দিচ্ছি, আপনারা স্কোরে ড্র দেখিয়ে দিন। এখানে সি এ বি—র কেউ নেই, জানাজানিও হবে না।”
”আম্পায়াররা রাজি হলেন?”
”রাজি তো হচ্ছিল না। তখন এ—পাড়ারই একটা ছেলে মানিক, নামকরা মস্তান, ছুরি বের করে একজন আম্পায়রকে বলল, আপনার মেয়ে—জামাই বাগুইহাটিতে থাকে না? ব্যস, ওতেই কাজ হয়ে গেল। ভালই করেছে, যা দিনকাল! অন্যজনও বলল, ছুরি মারলে কি সি এ বি রক্ষে করতে আসবে? আপনি সই করে দিন, আমিও করে দিচ্ছি। তখন দু’জনেই সই করে দিল। আপনার দাদা কি আপনাকে বলেনি খেলা হবে না?”
কলাবতী মাথা নাড়ল। একটা দারুণ খবর পেয়ে যাওয়ার উত্তেজনায়, যদিও তার ঝোলায় জলের বোতল রয়েছে, তবুও সে আর—এক গ্লাস জল চাইল। যে—ম্যাচে একটা বলও খেলা হল না সেই ম্যাচের স্কোর আম্পায়াররা সি এ বি—তে দেবে। কালকের কাগজে—কাগজে এই খেলার রেজাল্টও বেরোবে! এমন কাণ্ড পৃথিবীর কোথাও ঘটেছে কি? আর একজনও খবরের কাগজের লোক আসেনি। এমন অসাধারণ একটা খবর শুধুমাত্র সে জোগাড় করেছে। একেই বোধ হয় ‘স্কুপ’ বলে। কাল বঙ্গবাণী পড়ে সবার চোখ চড়কগাছ হয়ে যাবে। সি এস জে সি টেন্টে নিশ্চয় বলাবলি হবে, দু’দিন মাঠ করেই একটা মেয়ে কিনা এমন একটা খবর বের করে ফেলল! কলাবতী শিহরিত হল আনন্দে। দু’দিনেই সে সবার নজরে পড়ে যাবে।
লোকটির হাত থেকে যখন সে জলের গ্লাস নিচ্ছে তখনই ব্যস্তভাবে একটি লোক ঘরে ঢুকল। মাঝবয়সী, রোগা, লম্বা, মুখে উদ্বেগ। কলাবতীকে দেখে ভ্রূজোড়া কোঁচকাল।
”শ্যামাপদ, স্কোরবইটা দে।”
শ্যামাপদ তটস্থ হয়ে তাড়াতাড়ি স্কোরবইটা তুলে নিয়ে নবাগতর হাতে দিল। সে স্কোরবইটা খুলে খুব মন দিয়ে উপর—নীচ চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করল, ”যা ভেবেছি, যোগে ভুল করেছে। আবার এখন দৌড়োও।” তারপর সে কলাবতীর দিকে প্রায় কটমট করে তাকিয়ে রুক্ষস্বরে প্রশ্ন করল, ”আপনি কে? এখানে, এখন?”
”আমি বঙ্গবাণীর রিপোর্টার, আমার নাম কলাবতী সিংহ। নতুন, তাই আগে আমায় দেখেননি। আপনি?” শুকনো, কঠিন স্বরে উত্তর দেওয়া লোকটি কেমন যেন মিইয়ে গেল। কলাবতী ইতিমধ্যে বুঝে গেছে জোচ্চচুরি যারা করে তারা অমেরুদণ্ডী শ্রেণীতে পড়ে। এদের সঙ্গে ডেঁটে কথা বলতে হয়।
”আমি ক্লাবের সেক্রেটারি শ্রীশ মিত্তির।”
”ইনিই গুচাবাবু।” শ্যামাপদ যোগ করল।
”আপনি এখানে এসেছেন কেন?” গুচাবাবু ঈষৎ অবাক হয়ে প্রশ্নটা করল।
”কেন আবার, ম্যাচটা রিপোর্ট করব বলে।”
”কিন্তু খেলা তো হয়নি।” বিনীতকণ্ঠে সেক্রেটারি জানালেন।
”হয়নি বুঝি? তা হলে সেটাই রিপোর্টে লিখব। কিন্তু কেন হয়নি?”
”কদমতলার প্রেসিডেন্ট আজ সকালে হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গেছেন, তাই ওরা খেলবে না বলল। শোক আর সম্মান জানাতে আমরাও এক মিনিট নীরবতা পালন করে খেলা বাতিল করতে রাজি হয়ে গেলাম, এই আর কি!”
”তা হলে এটাই লিখব, বাগুইহাটির সেক্রেটারি শ্রীশ মিত্র জানালেন, কদমতলার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ হার্ট…।”
”না, না, না, আমি ঠিক নিশ্চিত নই এ—ব্যাপারে। এসব আপনি লিখতে যাবেন না।” গুচাবাবু আঁতকে উঠল।
”নিশ্চিত না হয়েই আপনারা এক মিনিট নীরবতা পালন করে ফেললেন?” বয়স্ক একটা লোকের মিথ্যা কথা বলা দেখে কলাবতীর যেমন মজা লাগছে তেমনই দুঃখও হল। নিজেদের এরা কত নীচে নামাতে পারে, বয়সকেও মর্যাদা দেয় না।
”দেখুন, ব্যাপারটা আপনি ঠিক বুঝতে পারবেন না। আপনার বয়স কম, মাঠের হালচাল সম্পর্কেও অনভিজ্ঞ। এসব একটু—আধটু হয়েই থাকে। না হলে ক্লাব চালানো যায় না।” গুচাবাবুর কথায় ও ভাবভঙ্গিতে আত্মসমর্পণের মতো দীনতা ফুটে উঠল।
