কলাবতী শ্বাস প্রায় না নিয়েই একটানা কথা বলে তার ভেতরের উত্তেজনাকে মুক্তি দিল। কিন্তু ওধার থেকে কোনও সাড়াশব্দ আসছে না কেন! সে ভাবল, তা হলে বড়দি কি ক্ষুণ্ণ হলেন? হয়তো মামাতো দাদা—বউদিকে কথা দিয়ে ফেলেছেন তাঁর ছাত্রীকে দিয়ে লিখিয়ে কাগজে ছাপিয়ে দেবেন। এখন সেই ছাত্রী লিখতে না চাওয়ায় নিশ্চয় রেগে গেছেন।
”বড়দি? হ্যালো…”
”কালু, একদিন ক্লাসে তোমায় কী বলেছিলাম তা মনে আছে?”
”কী বলেছিলেন?”
”যথার্থ যা দেখবে, শুনবে, বুঝবে, তাই লিখবে। …কালু তুমি কিন্তু এই লেখাটা লিখবে না।” গম্ভীর থমথমে মলয়ার কণ্ঠস্বর। ”মানবিক বোধ নষ্ট কোরো না। কিছু না লিখলেই বোধ হয় ঝুপুর উপকার করা হবে। আমি কালই লিলুয়ায় গিয়ে ওঁদের সঙ্গে কথা বলব। আর—একটা কথা… আমি খুব খুশি হয়েছি।”
ফোনটা রেখে কলাবতীর মনে হল, বুক থেকে যেন একটা পাষাণভার নেমে গেল।
.
দমদম এয়ারপোর্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী আসবেন তাই নজরুল ইসলাম সরণিতে, যাকে সবাই ভি আই পি রোড বলে, গাড়ি চলাচল বন্ধ। কারণটা অবশ্যই নিরাপত্তার জন্য। তবে মিনিবাসে বসে থাকা কলাবতীর কাছে এটা নেহাতই বাড়াবাড়ি মনে হল। প্রধানমন্ত্রীর কনভয় যাবে তার জন্য আধঘণ্টা আগে গাড়ি—চলাচল কেন যে বন্ধ করা হবে, তার কোনও ব্যাখ্যা সে খুঁজে পাচ্ছে না।
আসলে তার দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাগুইহাটি স্পোর্টিং মাঠে যাওয়ার জন্য সে সময়ের হিসেব করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কলকাতা আগমন হলে এয়ারপোর্ট থেকে উল্টোডাঙা আর নজরুল সরণির মোড় পর্যন্ত ট্র্যাফিক বন্দোবস্তটা যে কেমন হয় সেটা তার জানা ছিল না। কনভয় যখন উল্টোডাঙা মোড় থেকে বাঁ দিকে বেঁকে ইস্টার্ন বাইপাস ধরল, তখন ছাড়া—পাওয়া গাড়িগুলো প্রতিযোগিতা শুরু করল, কে আগে যাবে। ফলে যানজট।
সুতরাং বাগুইহাটির মোড়ে সে যখন মিনিবাস থেকে নামল, তখন দশটা পঁয়তাল্লিশ। মাঠটা সাইকেল রিকশাওয়ালা চেনে। কলাবতীর আপাদমস্তক দেখে সে ভাড়া হাঁকল, চার টাকা। তাই সই বলে সে রিকশায় উঠে বসল।
দু’ধারে মাটি আর খোয়া, মধ্যে আরও ভাঙা, গর্ত হওয়া পিচ ঢালা পথ। ডাইনে—বাঁয়ে বাঁক নিয়ে, এ—গলি সে—গলি হয়ে মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর কলাবতী দেখল, সাদা ট্রাউজার্স আর শার্ট পরা তিনটি ছেলে হেঁটে আসছে। তাদের হাতে কিট ব্যাগ। একজনের হাতে ক্রিকেট ব্যাটও। ওদের দেখে সে আশ্বাস পেল, তা হলে রিকশায় ঠিক জায়গার দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু এই সময় ওদের তো মাঠে থাকার কথা! কলাবতী ধাঁধায় পড়ল।
”আর কতদূর?” একটু উদ্বিগ্ন হয়েই সে জানতে চাইল। তাড়াতাড়ি মাঠে পৌঁছনোর থেকেও, গর্তভরা রাস্তায় রিকশার সওয়ার হওয়া থেকে তাড়াতাড়ি রেহাই পাওয়াটাই এখন তার কাছে কাম্য।
”আপনে অ্যাত ব্যস্ত হইতেছেন ক্যান? ঠিক জায়গায়ই লইয়া যামু। যেহানে কিরকটে খেলা হয়, সেই মাঠ ত?”
”হ্যাঁ।”
এক মিনিট পরই রিকশা থেকে কলাবতী একটা মাঠ দেখতে পেল। মাঠের দু’দিক দিয়ে রাস্তা, বাকি দু’দিকে একতলা ছোট—ছোট পাকা বাড়ি। মাঠের মাঝখানে আড়াআড়ি পায়ে চলা একটা পথ পিচের ওপর দিয়ে চলে গেছে। তবে পিচের অংশটা দড়ি দিয়ে ঘিরে দেওয়া। ক্রিকেট মরসুমে চলাচলের জন্য ওটাকে ঘুরে যেতে হয়।
কিন্তু পিচ ঘিরে এখন কেন দড়ি? রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে কলাবতী হতভম্ব হয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। খেলা কোথায়? এটাই তো বাগুইহাটি স্পোর্টিংয়ের মাঠ!
মাঠের একদিকে সাত—আটটি ছেলে রবারের বলে ক্রিকেট খেলছে। তিনটি গোরু ঘাস খেয়ে চলেছে। একটা টালির চালের ঘর মিড অন বা থার্ডম্যান বাউন্ডারির পেছনে। ঘরের দেওয়ালে ছোট হলুদ বোর্ডে লাল অক্ষরে বাগুইহাটি স্পোর্টিং ক্লাব লেখাটা সে দূর থেকে পড়তে পারল। তার নীচে ছোট অক্ষরগুলো আর পড়া গেল না। ওটাই তা হলে ক্লাবঘর।
সন্দেহ নেই ঠিক মাঠেই সে এসেছে, কিন্তু খেলা হচ্ছে কই? কলাবতী ঘড়িতে দেখল এগারোটা প্রায় বাজে। ফিল্ডার, ব্যাটসম্যান, আম্পায়ার, সাইটস্ক্রিন, স্কোরার— কোথায় কী! ক্লাবঘরের দরজাটা খোলা। ভেতর থেকে গেঞ্জি আর খেটো ধুতি পরা একটি লোক বেরিয়ে এল। পিচের কাছাকাছি এসে পড়া গোরুগুলোকে ভাগাবার জন্য ”হেই, হেই, হেট…” বলে চিৎকার করতেই অবিচলিতভাবে উলটো দিকে ঘুরে ওরা আবার ঘাস খেয়ে যেতে লাগল।
কলাবতী এগিয়ে গেল লোকটির দিকে।
”শুনছেন, শুনছেন।”
ডাক শুনে লোকটি তাকাল।
”আজ এই মাঠে বাগুইহাটির সঙ্গে কদমতলা ফ্রেন্ডসের খেলা ছিল না?”
”ছিল। হয়নি।” সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে লোকটি ক্লাবঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কলাবতী পিছু নিল।
”হল না কেন?”
”জানি না।”
”দুটো টিম এসেছিল?”
”এসেছিল।”
তারা ক্লাবঘরের দরজায় পৌঁছল।
”তা হলে খেলা হল না কেন? আম্পায়াররা আসেননি?”
”এসেছিল।” লোকটি ঘরের মধ্যে ঢুকল। কলাবতীও পিছু নিল। ”কদমতলার ক্যাপ্টেন বলল খেলব না, আমাদের সেক্রেটারি গুচাবাবুও বলল খেলব না তাই খেলা হল না।”
কলাবতী ঘরের চারদিকে চোখ বোলাল। বেশ লম্বা বড় ঘরটার এককোণে একটা তোলা উনুন, থালা, গ্লাস, হাঁড়ি ইত্যাদি। লোকটি এই ঘরেই থাকে আর রেঁধেবেড়ে খায়। নিশ্চয়ই ক্লাবের মালি। ঘরের মাঝে টেবলটেনিস বোর্ড। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রয়েছে ক্যারম বোর্ড। মেঝেয় বাঁশে জড়িয়ে রাখা প্র্যাকটিস নেট। গোলাচুনের বালতি, ঝাঁটা, বেঞ্চে রাখা দুটো ক্যানভাসের থলির খোলা মুখ থেকে উঁকি দিচ্ছে কয়েকটা ব্যাট আর কয়েক জোড়া প্যাড। দেওয়ালে হেলান দিয়ে দশ—বারোটা স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ার।
