ওকে থামিয়ে কলাবতী বলল, ”আজ থাক, আমার দেরি হয়ে যাবে ফিরতে।”
আবার ফোন বেজে উঠল।
”আহ, একটু কথা বলতেও দেবে না, আসছি ভাই।”
ছবি চ্যাটার্জি ঘর থেকে বেরোতেই কলাবতী ঝুপুর দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভেংচি কাটল।
”তুমি গুপি গায়েন বাঘা বায়েন দেখেছ?”
”হ্যাঁ, টিভিতে।”
”ভূতের রাজা দিল বর, দিল বর।” সুর করে লাইনটা চাপা স্বরে গেয়ে উঠে সে বলল, ”কেমন লাগে?”
”খুব ভাল।”
পাশের ঘর থেকে ভেসে এল, ”আর বলবেন না মিসেস দাস, কোথা থেকে যে এরা ঝুপুর খবর পেল, একেবারে ফোটোগ্রাফার নিয়ে হাজির হয়েছে…।”
”অরণ্যদেব?”
ঝকমক করে উঠল ঝুপুর চোখ। ”সকালে কাগজওলা কাগজ দিলেই আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে টুক করে পড়ে নিই।”
”তারপর কী করো?”
”বাবা সার্ভিস প্র্যাকটিস করায়।”
”কতক্ষণ?”
”পঞ্চাশটা।”
”করতে ভাল লাগে?”
”না।” বলেই মুখটা পাংশু হয়ে গেল ঝুপুর।
”রেলের এক অফিসারের বউ।” ঘরে ঢুকলেন ছবি চ্যাটার্জি। ”মেয়ে ক্লাস ফোরে উঠেছে, ফার্স্ট হতে পারেনি তাই দুঃখ করছিল।… দুপুরে খেয়ে বেরিয়েছ, এতক্ষণে খিদে পাওয়ার কথা, একটু কিছু মুখে দাও। কোনও কথা শুনব না।”
কলাবতীর ”না, না” উপেক্ষা করে তিনি ভেতরের দরজার কাছে গিয়ে ডাকলেন, ”বাসন্তী, নিয়ে এসো।”
সেই ফাঁকে কলাবতী ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ”তুমি স্টেফি গ্রাফ হতে চাও?”
”না।”
”কী হতে ইচ্ছে করে?”
”ভূতের রাজা।”
ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল এক প্রৌঢ়া। এতরকমের খাবার! কলাবতী আঁতকে উঠে বলল, ”করেছেন কী? সব কি আমার জন্য?”
”তা না হলে কার জন্য। আমার শরীর দেখছ তো, খাওয়া কমিয়েও কিছু হচ্ছে না, আর ঝুপুর তো এসব খাওয়ার কথাই নয়।”
কলাবতী লক্ষ করল, ঝুপুর জুলজুল চোখ খাবারের প্লেটগুলো চেটে গেল। তার পলকের জন্য মনে পড়ল কাকাকে। কী খুশিই না হত এই ট্রে—টা যদি সামনে পেত।
”মাংসের শিঙাড়া, চিংড়ির কাটলেট আর পুডিংটা আমার করা। ঝুপুর বাবা কাল নিউ মার্কেট থেকে পেস্ট্রি, আপেল, আঙুর, আর পেস্তার বরফি এনেছে।”
খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে কলাবতীর মনে হল, সে খুবই অন্যায় করবে এগুলো খেয়ে। মেয়েকে নিয়ে একটা লেখা খবরের কাগজে যাতে বেরোয় সেজন্য খাদ্যের আড়ম্বর দিয়ে এটা তাকে খুশি করার চেষ্টা। কিন্তু সে ঠিক করেই ফেলেছে এই দুর্ভাগা মেয়েটি সম্পর্কে একটি লাইনও লিখবে না।
”কিন্তু আমার তো এর সবক’টাই খাওয়া বারণ। বড়দি বোধ হয় আপনাকে বলতে ভুলে গেছেন, দিন সাতেক হল জনডিস থেকে উঠেছি, খাওয়াদাওয়া প্রচণ্ড রেস্ট্রিকটেড। সামান্য বেনিয়ম হলেই আবার শুরু হতে পারে। আমায় মাফ করবেন।” কলাবতী ঝোলা কাঁধে উঠে দাঁড়াল।
”অন্তত একটা কিছু…।” ছবি চ্যাটার্জির কাতর স্বরে হতাশাটা স্পষ্ট।
”না। এবার আমি যাব।” কলাবতীর স্বরে এবং শরীরে কাঠিন্য ফুটে উঠল। ঘর থেকে বেরিয়ে সে বারান্দায় এল। মারুতিটা ফটকের সামনে অপেক্ষা করছে। পায়ে—পায়ে ঝুপু ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
”গাড়ি তোমাকে স্টেশনে দিয়ে আসবে। কিন্তু একটু কিছুও মুখে দিলে না, আমার খুব খারাপ লাগছে।”
”একটু ভাল হয়ে নিই, তারপর একদিন এসে প্রচুর খেয়ে যাব।” কলাবতী হাসল ঝুপুর দিকে তাকিয়ে। মেয়েটির চোখে আবার ঘুম—জড়ানো শ্রান্তি নেমে এসেছে।
”ওমমা, দেখেছ! আসল জিনিসটাই দিতে ভুলে গেছি।” ছবি চ্যাটার্জি ঘরের মধ্যে ছুটে গেলেন। তখন কলাবতী ঝুপুর দিকে তাকিয়ে বলল, ”ভূতের রাজা দেখতে কেমন জানো?”
”না।”
চোখ—মুখ কুঁচকে সে জিভ বের করে দেখাল। হন্তদন্ত হয়ে ছবি চ্যাটার্জি ফিরে এলেন হাতে একটা খাম নিয়ে। ”ছবিগুলোই দিতে ভুলে যাচ্ছিলাম।”
খাম হাতে গাড়িতে ওঠার সময় কলাবতী একবার ফিরে তাকাল। বারান্দায় মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ঝুপু, জিভটা বের করে।
ফেরার সময় তার মনে হয়েছে, যদি না লিখি তা হলে বড়দি কী ভাববেন? ওঁরা বড়দির আত্মীয়। বড়দি নিশ্চয় আশা করবেন, তাঁর আত্মীয়ের মেয়েকে নিয়ে কালু লিখবে। অথচ তার মন একদমই রাজি হচ্ছে না এই লেখাটা লিখতে। একটা বিচিত্র ধরনের সঙ্কট।
বাড়ি ফিরেই সে ফোন করল। তার অসীম সৌভাগ্য, ফোন করার সময় চেম্বারে কাকা ছিল না এবং অপরপ্রান্তে ফোনটা হরিশঙ্কর নয়, ধরল মলয়াই।
”বড়দি আমি খুব মুশকিলে পড়ে গেছি। কী করব সেটা আপনিই বলে দিন।” কলাবতী মরিয়া হয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মলয়ার সাহায্য চাইল।
লিলুয়ায় যা দেখল এবং শুনল তার বিবরণ সংক্ষেপে জানিয়ে সে বলল, ”বড়দি, ওঁরা নিজেদের অপূর্ণ মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য দশ বছরের একটা মেয়ের শরীর আর মনের ওপর রীতিমতো অত্যাচার চালাচ্ছেন। এভাবে বোকার মতো কখনও খেলোয়াড় তৈরি করা যায় না। খেলাটা আপনা থেকেই আসে, একে জোর করে চাপিয়ে খেলোয়াড় বানানো যায় না, এটা একটা স্বতস্ফূর্ত ব্যাপার।
”ওঁরা মেয়েটাকে মেরে ফেলছেন, ওর জীবনটাকে নষ্ট করছেন। ট্যালেন্ট আছে কি নেই তা জানি না, তবে এখনই বলে দিতে পারি, ঝুপু কোনওদিনই টেনিস প্লেয়ার হবে না। বাবা—মা ওকে ঘিরে কোটি—কোটি টাকার স্বপ্ন দেখছেন, কী ভয়ঙ্কর স্বার্থপর! আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ঝুপুর জন্য।… বড়দি, আপনার আত্মীয় ওঁরা, আপনিই অনুরোধ করেছেন লেখার জন্য, কিন্তু লিখতে আমার মন চাইছে না। বড়দি, আমি তা হলে কী করব?”
