”ট্রেনিংয়ের সময় কেউ লক্ষ করেন না, ঠিকমতো হচ্ছে কিনা?” বলতে—বলতে কলাবতী তার ঝোলা থেকে নোটবই আর কলম বের করল।
”কেন, আমি থাকি। ওই যে, ওখানে বসে দেখি।” কলাবতীকে টুকতে দেখে ছবি চ্যাটার্জি প্রচণ্ড উদ্দীপনা নিয়ে বললেন।
ঝুপুর পেছনে একটা বড় রঙিন বাগানছাতা আর চেয়ার কলাবতী আগেই দেখেছে। তার পেছনে নিকোনো মাটির একটা ছোট টেনিস কোর্ট, যাতে চুন—গোলা দিয়ে দাগ টানা। কোর্টে নেট খাটানো রয়েছে।
”পেছনে বসে ওকে উৎসাহ দিয়ে যান?”
”বল গার্লদের মতো বলও কুড়িয়ে দিই। উফফ কী যে পরিশ্রম করতে হয় মেয়ের জন্য, সে তো তুমি বুঝবে না ভাই।”
”কোর্টটা মাটির কেন?”
কথাটা শুনে ছবি চ্যাটার্জির যেন শ্বাসকষ্ট শুরু হল। ”বলছ কী ভাই! ঘাসের কোর্ট পৃথিবীতে আর ক’টা, সবই তো ক্লে কোর্ট! উইম্বলডন ছাড়া সার্কিটে আর ঘাস কোথায়?”
কলাবতী মনে—মনে জিভ কামড়াল। বড্ড ভুল প্রশ্ন সে করে ফেলেছে। এখন থেকেই ঝুপু মাটির কোর্টের সঙ্গে সড়গড় না হলে গ্রাফ কি সেলেসের সঙ্গে লড়বে কী করে।
”কম খরচ হয়েছে? তিন লরি মাটি, সেইসঙ্গে গোবর, খোল, আরও কত কী!”
ঝুপু সমানে ভলি মেরে চলেছে। একজন অপরিচিত যে দূর থেকে লক্ষ করছে এটা সে গ্রাহ্যেই আনছে না। বয়স বড়জোর নয়—দশ। মায়ের মতোই রং এবং মুখের গড়ন। ছোট চুল স্টেফি গ্রাফের মতো ঘাড়ের কাছে রিবন বাঁধা। পা দুটি লম্বা এবং সুগঠিত।
”শুধু একা—একা ট্রেনিংই করে যাচ্ছে? ম্যাচ খেলে না?”
”ওর বাবা রোজ সকালে বেরোবার আগে এক ঘণ্টা ওর সঙ্গে খেলেন।”
”আপনাদের দু’জনকেই খুব খাটতে হয়।”
”নিশ্চয়। চলো ভেতরে গিয়ে বসি। ঝুপু আজ আর ব্যাকহ্যান্ড করবে না। তোমার তো ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
”না, তেমন কিছু প্রশ্ন আমার নেই।” কলাবতী এগোল ছবি চ্যাটার্জির সঙ্গে। বারান্দা থেকে বসার ঘরে ঢুকেই সে থ’ হয়ে গেল। ঘরটা তো টেনিস পোস্টারের প্রদর্শনী! দেওয়ালে এক ইঞ্চিও খোলা জায়গা নেই। জিমি কোনর্স, বর্গ, এভার্ট, নাভ্রাতিলোভা থেকে সাম্প্রাস আর কাপ্রিয়াতি পর্যন্ত প্রায় কুড়ি বছরের সব নামীদের রঙিন ছবি।
”এরা সবসময় চোখের সামনে থাকলে ঝুপু প্রেরণা পাবে।” সোফায় বসলের ছবি চ্যাটার্জি। সামনের সোফায় কলাবতী।
ঘরে ঢুকল ঝুপু। মায়ের আঙুলের নির্দেশে কলাবতীর পাশে বসল। মুখটা নামানো। ঘামে ভেজা ঘাড়ের চুল চামড়ায় সেঁটে রয়েছে। একে কী জিজ্ঞেস করবে?
”তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
ঝুপু মায়ের দিকে তাকাল।
”সারাদিনটাই তো ওর ট্রেনিং শিডিউলে ভরা। পড়বার সময় কোথায়? রেস্ট নেওয়াটাও খুবই দরকার, তাই ওকে স্কুলে দিইনি। আমিই বাড়িতে পড়াই।”
”তোমার বন্ধুরা কী বলে তোমার এই টেনিস খেলা নিয়ে?”
ঝুপু মাথা নেড়ে অস্ফুটে বলল, ”বন্ধু নেই।”
”বুঝলে ভাই, বেশি বন্ধুটন্ধু থাকলে তখন হইচই করার দিকেই মন চলে যাবে, তাই আমি ওকে মিশতে—টিশতে দিই না। ঠিক করিনি?”
কলাবতী চুপ করে রইল।
”এখনকার দিনে মানুষ খাটে তো টাকা রোজগারের জন্যই। স্টেফি গ্রাফ বাইশ বছর বয়সেই এক কোটি দশ লক্ষ ডলার শুধু প্রাইজমানিই জিতেছে। টাকায় এটা কত হয় বলো তো? ঝুপুর বাবা হিসেব করে দেখেছে, প্রায় তেত্রিশ কোটি টাকা! চার বছর বয়সে বাবা স্টেফির হাতে র্যাকেট তুলে দিয়েছে বলেই তো আজ সে এত বড় হয়েছে, এত টাকা করেছে। ঝুপুর হাতে র্যাকেট আমরা দিয়েছি, গত বছর, ওর ন’ বছর বয়সে। আমি বলছি না বারো বছর পর ও তেত্রিশ কোটি টাকার মালিক হবে। কিন্তু কিছু তো হবে… কুড়ি কোটি… পনেরো কোটি… দশ কোটি?” ছবি চ্যাটার্জি উত্তেজিত হয়ে সামনে ঝুঁকে টেবলে চড় বসালেন। ”এর সঙ্গে বড়—বড় কোম্পানির প্রোডাক্টের এনডোর্সমেন্ট থেকে পাওয়া আরও দশ কোটি যোগ করো। আসলে কী জানো, খরচ করা আর লেগে থাকা এই দুটো না হলে কিছু হয় না। তিন থেকে পাঁচ বছর ফ্লোরিডায় কি ক্যালিফোর্নিয়ায় কোনও টেনিস অ্যাকাডেমিতে ঝুপুকে রাখা দরকার। কিন্তু খরচের কথা ভেবে আমরা এসব চিন্তা ত্যাগ করেছি। স্পনসরার পেলে অবশ্যই ওকে পাঠাব। তুমি ভাই সেইভাবে লিখো যাতে স্পনসরাররা এগিয়ে আসে।”
কলাবতী আড়চোখে ঝুপুকে দেখল। মাথাটা হেলিয়ে সে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মেঝেয় আঁক কাটছে। চোখের ভাব ঘুমে জড়িয়ে আসার মতো। কলাবতীর ইচ্ছে করল বুকের কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে বলতে— ‘ছুট্টে এই বাংলো থেকে বেরিয়ে সামনে যাকে পাবে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাও।’
ভেতরের ঘরে ফোন বেজে উঠল। ছবি চ্যাটার্জি ”আসছি” বলে উঠে গেলেন। সেই ফাঁকে কলাবতী নিচুস্বরে ঝুপুকে জিজ্ঞেস করল, ”তোমার ভাল লাগে রোজ এইভাবে ট্রেনিং করতে?”
মেয়েটি শুধু তাকিয়ে রইল।
”বলো না, ভয় কী আমাকে বলতে?”
ভেতর থেকে ছবি চ্যাটার্জির গলা ভেসে এল, ”হ্যাঁ, হ্যাঁ, এসেছে। তুমি কি এখন আসতে পারবে না?…”
কলাবতী আবার জিজ্ঞেস করল, ”তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না?”
ঝুপু মাথা হেলিয়েই সিধে করে নিল। তার মা ফিরে এসেছেন।
”ঝুপুর বাবার ফোন, মিলে আটকে পড়েছেন। বললেন ক্যাসেটটা তোমাকে শোনাতে।”
”কিসের ক্যাসেট!”
”ইন্টারভিউয়ের ক্যাসেট। টুর্নামেন্ট জিতলে রিপোর্টাররা যখন নানারকম প্রশ্ন করবে তখন ঝুপু কী উত্তর দেবে? ওর বাবা ইংরেজিতে আশিটা নানারকমের প্রশ্ন আর তার উত্তর নিয়ে ক্যাসেট তৈরি করেছে। রাত্তিরে ঘুমোবার আগে ঝুপু আধঘণ্টা ক্যাসেট শোনে আর মুখস্থ করে। উনি প্রতিদিন লাঞ্চ করতে এসে খাবার টেবলে ওকে ইন্টারভিউ করেন। সব দিক থেকেই আমরা ওকে তৈরি করে যাচ্ছি। তোমাকে ক্যাসেটটা এনে…”
