”না, না, ওসব নয়। লিলুয়া স্টেশন থেকে আমায় তুলে নিলেই হবে। আমি বুধবার তিনটে নাগাদ হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠব। ওঁদের এটা জানিয়ে দিন।”
”এখনই ফোন করছি। বলে দিচ্ছি পরশু তিনটে থেকে যেন গাড়ি নিয়ে সবুজ সালোয়ার কামিজ পরা একটা মেয়ের জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করে।”
ফোন রেখে সে সত্যশেখরের দিকে তাকাল। টেবলের তিনটি শালপাতা নেই।
”কী করব, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল। এত ভাল জিনিস!”
.
বুধবার লিলুয়া স্টেশনের বাইরে এসে কলাবতী হাতঘড়িতে দেখল সাড়ে তিনটে বাজে। সবুজ একটা মারুতি দেখে তাকানো মাত্র গাড়ির পেছনের জানলা থেকে এক মহিলা হাত বাড়িয়ে নাড়লেন। ড্রাইভারও হর্ন বাজাল। গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ধরে কৃতার্থ হওয়ার মতো গলায় মহিলা বললেন, ”সবুজ সালোয়ার কামিজ দেখেই বুঝে গেছি। আমি মলুর বউদি ছবি চ্যাটার্জি… বেশিক্ষণ লাগবে না, মিনিট—দশেকের রাস্তা… উনি আসতে পারলেন না, লেবারদের ঝামেলা চলছে। এখন মিলে রয়েছেন, আমাকে বললেন তোমাকে রিসিভ করতে। আচ্ছা, বঙ্গবাণী তো বেশ বড় কাগজ, এখন সার্কুলেশন কত, লাখ চার—পাঁচ হবে?”
ফাঁপরে পড়ল কলাবতী। সে সত্যিই জানে না বঙ্গবাণীর বিক্রয়—সংখ্যাটা কত। তার অনুমান, লাখ দেড়েকের বেশি নয়। কিন্তু তার মনে হচ্ছে দেড় লাখ বললে ছবি চ্যাটার্জি খুবই হতাশ হবেন, খাতিরটাও কমিয়ে দেবেন।
”এখন ছ’লাখের কাছাকাছি।”
”ছ—অ—অ—অ লাখ!” পুলকিত বিস্ময়ের ধাক্কায় ছবি চ্যাটার্জি অনর্গল কথা বলতে শুরু করলেন।
”জানলে, আমিও একসময় খুব খেলাধুলো করতুম। সাঁতার কাটতুম, দৌড়তুম, গাছে চড়তুম… গাছে চড়াটাও তো একটা খেলা, তাই না? চোর—পুলিশ, গাদি, কানামাছি, কতরকমের যে খেলা খেলেছি! কিন্তু কোনও খেলাতেই উঁচুতে আর উঠতে পারলুম না। এই আক্ষেপটা আজও আমার রয়ে গেছে। উনিও বড় টেনিস প্লেয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কলেজে পড়ার সময় খেলতেন। কিন্তু কেরিয়ারের কথাটা তো ভাই আগে ভাবতে হবে। উইম্বলডন জিতবেন ভাবতেন, সেই সাধ আর পূর্ণ হল না।”
ছবি চ্যাটার্জির বয়স, কলাবতীর মনে হল, বড়দির চেয়ে অনেক কম, বড়জোর পঁয়ত্রিশ। কিন্তু দেহের ওজনে বড়দির থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোগ্রাম বেশিই হবেন। মুখটি সুন্দর, যাকে লক্ষ্মী প্রতিমার মতো বলা যায়, দুধে—আলতা গায়ের রং। ধনীর কন্যা এবং দর্শনশাস্ত্রের এম.এ.। কলাবতী চ্যাটার্জিদের সম্পর্কে যথাসাধ্য হোমওয়ার্ক করেছে লিলুয়া রওনা হওয়ার আগে। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, ভস্মে ঘি ঢেলেছে।
”আমাদের অপূর্ণ সাধ, আকাঙ্ক্ষা এখন ঝুপুকে দিয়ে আমরা মেটাতে চাই। উনি গাদা—গাদা বই কিনছেন আর রাতদিন পড়ছেন। সব টেনিসের বই। কোচিংয়ের বই, স্পোর্টস সাইকোলজির বই, স্পোর্টস মেডিসিনের বই, বড়—বড় প্লেয়ারদের জীবনী, শোবার ঘরের চারটে তাক বইয়ে ভরে গেছে। ঝুপুও খুব খাটে। তবে ওর সম্পর্কে কাগজে কিছু বেরিয়েছে দেখলে উৎসাহটা বাড়বে, আরও খাটবে। ও বড় হলে সেটা তো দেশেরই বড় হওয়া, খবরের কাগজের এই দিকটা, মানে দেশের গৌরবের দিকটা তো দেখা উচিত, ঠিক কিনা? তুমি আসবে শুনে কালই ওর গোটা তিরিশ ছবি তোলানো হয়েছে, তোমার তো লেখার সঙ্গে লাগবে?”
কলাবতী আগাগোড়াতেই হুঁ—হুঁ করতে—করতে অবশেষে উঁচু পাঁচিল—ঘেরা কোয়ার্টারের ফটকে পৌঁছল। একতলা বাংলো বাড়ি। মোরাম—ঢাকা পথ ফটক থেকে ঢাকা বারান্দা পর্যন্ত, দু’ধারে মরসুমি ফুল আর চন্দ্রমল্লিকা। কলাবতীর চোখ মুগ্ধ হয়ে গেল এবং তারপরই বিস্ময়ে গোলাকার। বাংলোর পশ্চিমে, ফ্রকপরা ছোট্ট একটি মেয়ে, হাতে একটা টেনিস র্যাকেট, যার হাতলটার আধখানাই কেটে বাদ দেওয়া, কৌতূহলী চোখে তার দিকেই তাকিয়ে। চোখাচোখি হতেই মেয়েটি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। তারপর থামিয়ে রাখা কাজটা শুরু করল—বাঁ হাতের টেনিস বলটা শূন্যে ছুড়ে র্যাকেট দিয়ে মারল। বাংলোর দেওয়ালে লেগে বলটা ফিরে আসতেই ভলি করল। এইভাবে সে জমিতে বল পড়তে না দিয়ে ক্রমান্বয়ে ভলি মেরে যেতে থাকল, ডাইনে—বাঁয়ে সরে অথবা পিছিয়ে গিয়ে।
কলাবতী লক্ষ করল মেয়েটি একবারের জন্যও বল থেকে চোখ সরাচ্ছে না। ভ্রূ কুঁচকে, গালের পেশি শক্ত করে মনপ্রাণ নিজের কাজে ঢেলে সে বল মেরে যাচ্ছে। কখনও যদি বল ফসকাচ্ছে, পাশেই রাখা একটা প্লাস্টিকের বালতি থেকে বল তুলে নিয়ে আবার শুরু করছে। সময় নষ্ট হচ্ছে না।
”ঝুপু এখন ভলি প্র্যাকটিস করছে।” ছবি ফিসফিস করে গোপন খবর জানাবার মতো গলায় বললেন। ”সাড়ে তিনটে থেকে চারটে পর্যন্ত ভলি সেশন, দেড়শো ভলি।”
”দেএএএড় শোওও!” কলাবতী অনেকটা ‘ছঅঅঅ লাখ’কে নকল করে বলল। শুনে আত্মপ্রসাদের হাসি ছড়িয়ে পড়ল শ্রোতার মুখে। ”তিন মাস পর ওটা দুশো হবে।”
”দুউউ শো!”
”তারপর আধঘণ্টা চলবে ব্যাক হ্যান্ড। দু’হাতে র্যাকেট ধরে মানে টু ফিস্টেড ব্যাক হ্যান্ড, যেভাবে মোনিকা সেলেস মারে, তুমি দেখেছ তো?”
”টিভিতে দেখেছি। আধঘণ্টায় ঝুপু ক’টা মারবে?”
”পঞ্চাশটা। আমরা সপ্তাহের ট্রেনিং শিডিউলই ওকে লিখে দিই। গত হপ্তায় মেরেছে পঁয়তাল্লিশটা। তিন মাস পর এটা হবে একশো দশ। ব্যাক হ্যান্ডের পর পনেরো মিনিট রেস্ট। তখন ওর ঘাড়ে—হাতে ম্যাসাজ করে দিই।”
