”তা অবশ্য বলতে পারতুম।” কৃষ্ণেদ তার ডান দিকের চুল আলতো দুটো থাপ্পড়ে চেপে বসাল। ”তা হলে কলাবতী তুমি আরও দু—একটা ম্যাচ দেখে ফিচার গোছের একটা লেখা লিখে ফেলো। ছোট করে লিখবে। তোমার লেখাটা এত বড় করে ফেলেছিলে, যেন ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের রিপোর্ট করছ। লেখাটার আকার দেখেই তো বুঝে গেছলুম বাদ দিতে হবে।”
”তা হলে এবার কোন ম্যাচটায় যাব?” শুকনো গলায় কলাবতী জানতে চাইল।
”পরেশ, ফিকশ্চারটা দে তো।”
টাইপ করা একটা কাগজ পরেশ ফাইলবক্স থেকে বের করে দিল। কৃষ্ণপদ ভ্রূ কুঁচকে সেটার দিকে তাকিয়ে বলল, ”বড় টিমের ম্যাচ থেকে ফিচারের মেটিরিয়াল পাবে না তুমি, সেকেন্ড ডিভিশনের ম্যাচই বরং করো। শনিবার বাগুইহাটি স্পোর্টিং নিজেদের মাঠে খেলবে কদমতলা ফ্রেন্ডসের সঙ্গে। কাঁকুড়গাছি থেকে তোমার যেতেও সুবিধে হবে।”
”মাঠটা কোথায় কেষ্টদা?”
”মাঠটা?” কৃষ্ণপদর চুলের ওপর ঘরের ছাদ যেন ভেঙে পড়ল। ”তাই তো? পরেশ বাগুইহাটির মাঠটা কোথায় রে?”
”আমি কী করে জানব! আমি কি ক্রিকেট করি?” পরেশ প্যাড থেকে একটা কাগজ প্রবল বিরক্তি নিয়ে ছিঁড়ল।
”কোথা থেকে কোথা থেকে সব ক্লাব যে সি এ বি ধরে আনে! হ্যাঁ রে সুব্রত—।” কৃষ্ণপদ বিপন্ন চোখে তাকাল।
”তোমায় ভাবতে হবে না, কলাবতী ঠিক খুঁজে বের করে নেবে। বাগুইহাটির মোড়ে বাস থেকে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই সে বাতলে দেবে।” সুব্রত লেখা থেকে মুখ না তুলে বলল।
”সাংবাদিকতার ফার্স্ট লেসন হল এটাই, অজানাকে খুঁজে বের করা।” কৃষ্ণপদ হাই তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল।
বাড়ি ফিরতেই মুরারি জানাল, ”বড়দি তোমাকে ফোন করেছিলেন। কী দরকার সেটা আর বলেননি। তোমাকে ফোন করতে বলেছেন।”
”কাকা কোথায়?”
”নীচে, চেম্বারে। ওঁর কাছেই ফোনটা এসেছিল।”
”মক্কেল রয়েছে?”
”তিনটে লোককে তো দেখেছিলুম।”
দোতলার ফোনটা দিনসাতেক হল মরে রয়েছে। কাকার চেম্বারের ফোন ব্যবহার করতে কলাবতী নীচে নেমে এল।
সত্যশেখর ঘরে একা এবং টেবিলের ওপর সাজানো তিন শালপাতা আলুকাবলি। তাকে দেখে সত্যশেখর ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”লোকগুলো এসে আর ওঠেই না… নে। শুরু কর। বেশি আর খাব না, চারটে হয়ে গেছে।”
”বড়দি ফোন করেছিলেন?”
”হুঁ।” শালপাতাটা চেটে নিয়ে সত্যশেখর বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেললেন। কলাবতীকে ডায়াল করতে দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, ”এগুলো ফেলে তুই আজেবাজে ফোন করতে শুরু করলি?”
”বড়দি আজেবাজে?”
”এই আলুকাবলি আমার জন্য আলাদা করে তৈরি করিয়ে আনে মুরারি। এর কাছে তোর বড়দি?”
কলাবতী উত্তর দিতে যাচ্ছে, তখন ফোনে ওধার থেকে গম্ভীর পুরুষ গলা বলে উঠল, ”হ্যালও।”
গলাটা চিনতে পারল কলাবতী। ”কে হরিদাদু, আমি কালু বলছি।”
”কী খবর তোমার, ভাল আছ তো? বাড়ির সবাই, সতু, রাজু ভাল আছে?”
”আছে।”
”মলুর কাছে শুনলাম, তুমি নাকি বঙ্গবাণীতে স্পোর্টস রিপোর্টিং করছ? আর কী কাগজ পেলে না? ওর এডিটর তো সদানন্দ ঘোষ, আমাদের ওদিককারই ছেলে। ওর বাবা স্কুলে বাংলা পড়াত। সদানন্দ তো এককলম বাংলাও লিখতে পারে না, ওর কাগজে তুমি কী লিখবে? যে বাংলা শিখেছ সেটাও ভুলে যাবে। কার বুদ্ধিতে ওখানে গেলে, নিশ্চয় রাজুর।”
কলাবতী সন্ত্রস্ত এবং হুঁশিয়ার হয়ে গেল। ”না, না, দাদুর তো ভীষণ আপত্তিই ছিল। ঠিক আপনার মতোই বলেছিলেন, সদানন্দ তো এককলমও বাংলা লিখতে পারে না, ওর কাগজে লিখলে…” কথাটা শেষ করতে পারল না সে।
”কী বললে?” হরিশঙ্কর মুখুজ্জে হুঙ্কার ছাড়লেন, ”রাজু এ—কথা বলেছে? ও বাংলার বোঝেটা কী? ও তো বিদ্যাসাগর মশায়ের ‘উপক্রমণিকা’ পড়েনি, পড়েছে নেসফিল্ড। সদানন্দর বাংলা বোঝার যোগ্যতা ওর আছে? সম্পাদকীয়গুলো পড়ে দেখো, কী ওজঃ কী ঝঙ্কার, আমি তো ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের গলা শুনতে পাই ওর লেখা থেকে… খুব ভাল করেছ তুমি… এই যে মলু এসে গেছে, ধরো।”
”কে, কালু?”
”হ্যাঁ, বড়দি।”
”ফোন করেছিলুম একটা ব্যাপারে। তুমি তো বঙ্গবাণীর স্পোর্টসে জয়েন করেছ। আমার মামাতো দাদার মেয়ে ঝুপু টেনিস খেলে, ওকে নিয়ে তুমি লিখতে পারো। দিনরাত পরিশ্রম করছে। স্টেফি গ্রাফ, সাবাতিনি, এরাই ওর আদর্শ। ওদের মতো হতে চায়। প্রভাতদা, বউদি ওঁরাও খুব চেষ্টা করছেন। তুমি এদের নিয়েও লিখতে পারো।”
”ওঁরা থাকেন কোথায়?”
”লিলুয়ায়। দাদা ওয়েলিংটন জুট মিলে বড় চাকরি করেন। বউদি কাল এসেছিলেন। কথায়—কথায় আমি বললুম, আমার এক ছাত্রী খবরের কাগজে স্পোর্টস রিপোর্টার।”
”না বড়দি, আমি ঠিক রিপোর্টার নই। টুকটাক কাজ শিখছি, চাকরি করি না।” কলাবতী ভুল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করল।
”ওই হল। তুমি লিখলে সেটা কাগজে বেরোবে।”
”না বড়দি, তার কোনও গ্যারান্টি নেই।”
”তা হলে, প্রভাতদার মেয়ের কথা তোমার পক্ষে লেখা সম্ভব নয়?” হতাশা ফুটে উঠল মলয়া মুখার্জির গলায়।
”বড়দি, আমি বরং মেয়েটিকে আগে একবার দেখি। ও খেলে কোথায়, সাউথ ক্লাবে? কোনও টুর্নামেন্ট জিতেছে?”
”তা তো আমি বলতে পারব না। ওদের কোয়ার্টারটা বেশ বড়, সঙ্গে অনেকটা জমি আছে, হয়তো সেখানেই খেলে। বউদি তো তোমার কথা শুনে লাফিয়ে উঠলেন। একটু পাবলিসিটি পেলে নাকি ঝুপু খুব উৎসাহ বোধ করবে, তা ছাড়া স্পনসরার পেতেও সুবিধে হবে। তুমি যদি যাও তো বাড়িতে ওঁরা গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন।”
