কলাবতীর শ্যামলা রঙের মুখ লজ্জায় পলকের জন্য বেগুনি হয়ে উঠল। মুখে হাসি টেনে বলল, ”হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট।”
”এক মিনিট।” দেবাশিস ব্যস্ত হয়ে টেন্টের ভেতর ঢুকে গেল। কলাবতী মুখ নামিয়ে কীভাবে তার রিপোর্ট শুরু করবে, তাই ভাবতে লাগল।
কৃষ্ণপদর মনে হল, প্রথম বলেই বোল্ড হওয়ার লজ্জায় কলাবতী হয়তো মনমরা হয়ে পড়েছে। তাকে চাঙ্গা করার জন্য বলল, ”আরে, প্রথম বলে কে না আউট হয়? গাওস্কর হয়নি? এই ইডেনেই তো মার্শালের বলে হয়েছে। আর গোল্লা করা? জানো, একবার ডবলু. জি. গ্রেসের কাছে এক ছোকরা খুব লম্বা—লম্বা বাত ঝাড়ছিল। সে নাকি দারুণ ব্যাট করে, বড়—বড় স্কোর করেছে। অনেকক্ষণ শুনে গ্রেস জিজ্ঞেস করলেন, ‘কখনও গোল্লা করেছ?’ ছোকরা বুক ফুলিয়ে বলল, ‘জীবনে শূন্য রানে আউট হইনি।’ গ্রেস শুনে বললেন, ‘তা হলে ক্রিকেটের কিছুই তো শেখোনি।’ বুঝলে কলাবতী, গোল্লা করার খুব প্রয়োজন আছে। তা হলে ওটাকে একশো করার জন্য তুমি চেষ্টা করবে। তাই না?”
কলাবতী মাথা নেড়ে সায় দিল।
”তুমি এখন অফিসে চলে যাও। রেজাল্ট—ফেজাল্ট আমি নিয়ে যাব’খন। আমার পৌঁছনোর জন্য অপেক্ষা কোরো না, তুমি লিখে রেখে দিয়ে চলে যেয়ো, আমি রেজাল্টগুলো তলায় জুড়ে দেব।”
বঙ্গবাণীর খেলার বিভাগে পৌঁছে সে কাউকেই দেখতে পেল না। অবশ্য সেজন্য তার কোনও অসুবিধে হল না। কৃষ্ণপদ যা বলে দিয়েছিল, কলাবতী তাই করল। দুটো মাঠে যা দেখেছে, শুনেছে এবং বুঝেছে সেগুলো যথাসাধ্য গুছিয়ে ঝাঁঝালো ভাষায় লিখে, অবশেষে আক্ষেপ জানিয়ে শেষ করল, ”নীচের দিকে যদি এইভাবে খেলা হয়, বনিয়াদটাই যদি ভেজাল দিয়ে তৈরি হয় তা হলে এর পর সুউচ্চচ অট্টালিকা কখনওই তৈরি করা যাবে না।” প্রায় এক কলামের একটা রচনা লিখে পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে সে বাড়ি চলে গেল।
রাত্রে রাজশেখরকে সে সবিস্তারে মাঠের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলল, ”দাদু, তোমার সামার গেমস আর গুড ডেজ যেখান থেকে বের করেছ, আবার সেখানেই তুলে রেখে দাও। আমার আর কার্ডাস পড়ার দরকার নেই।”
”সে কী রে! আমি যে দু’দিন ধরে কত ভাল—ভাল জায়গা অনুবাদ করে রাখলাম, তার কী হবে?” সত্যশেখর আক্ষেপ জানিয়ে বললেন, ”বাংলার ক্রিকেট সুউচ্চচ অট্টালিকা না হোক, তোর লেখাটা তো চোখে পড়ার মতো উচ্চচ দরের হতে পারবে।”
পরদিন ভোরবেলায় রাজশেখরের সঙ্গে জগিং সেরে বাড়ি ফিরেই কলাবতী দেখল কাকার হাতে বঙ্গবাণী, কিন্তু মুখটা বিমূঢ়। কাগজটা হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কলাবতী দ্রুত খেলার পাতাটা খুলল। ছাপার অক্ষরে তার লেখা বেরিয়েছে। হাজার—হাজার লক্ষ—লক্ষ মানুষ তা পড়বে। নাই—বা তার নাম দিয়ে বেরোল, কিন্তু খেলার নামে যা চলছে তার একটা আংশিক ছবি তো সে তুলে ধরেছে। কত লোক প্রশংসা করে বলবে, এমন লেখাই তো চাই! প্রতিশ্রুতিমানরা কীভাবে নষ্ট হয়, সেটা তো নিজের চোখে বাগচিকে দেখেই তো লিখেছে।
কিন্তু তার লেখাটা কোথায়? কলাবতীর মাথায় এবার ভেঙে পড়ল যেন বাংলার ক্রিকেটের ‘সুউচ্চচ অট্টালিকাটাই’। তার লেখাটা কোথায়? ”ঝড়ের মতো শত রান” হেডিং দিয়ে লম্বা এক কলামের লেখায় ‘স্টাফ রিপোর্টার’ শুরু করেছে, ”রবিবার ওয়াই এম সি এ মাঠের ওপর ঝড় বয়ে গেল। মাত্র ৪৪ বলে সবুজ পাতার ইন্দ্রজিৎ তালুকদার কদমতলার বোলিং তছনছ করে শতরানে পৌঁছন। মরসুমে এটি তাঁর পঞ্চম শতরান। ২৩টি বাউন্ডারি ও তিনটি ছক্কা মেরে তিনি শেষপর্যন্ত ১২৪ রানে অপরাজিত থেকে যান। বাংলার রঞ্জি দলের ভঙ্গুর মিডল অর্ডার ব্যাটিংয়ে ইন্দ্রজিতের মতো ব্যাটসম্যানই যে এখন দরকার সে—কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।” কিন্তু তার লেখাটার একটা বাক্যও তো এতে নেই। সে শুরু করেছিল, ”বাংলার রঞ্জি দলে কেন অন্য রাজ্যের খেলোয়াড়দের সংখ্যা বাড়ছে তার প্রকৃষ্ট এক কারণ রবিবার ওয়াই এম সি এ মাঠে দেখা গেল। ইন্দ্রজিৎ তালুকদার মরসুমে তার পঞ্চম লিগ শতরানটি ৪৪ বলে করলেন কদমতলা ফ্রেন্ডসের ফুলটস ও শর্ট পিচ বলের ভর্তুকি দ্বারা। বাংলা দলে ইন্দ্রজিতকে এর পর নেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই জোর দাবি উঠবে।”
কলাবতী ফ্যালফ্যাল চোখে কাকার দিকে তাকাল। সত্যশেখরেরও সেইরকম অবস্থা।
”লেখাটা কাল টেবলে রেখে চলে এসেছিস। উড়েটুড়ে মানে হারিয়েটারিয়ে যায়নি তো?” ঢোক গিলে সত্যশেখর বললেন।
কলাবতী মাথা নাড়ল, ”পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে রেখে এসেছিলুম।”
”তা হলে?”
কলাবতীর চোখ দিয়ে দরদর করে জল নেমে এল। তার প্রথম সাংবাদিকতা প্রয়াস ছাপার মুখ আর দেখল না।
.
”তুমি নিশ্চয় মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছ।” কৃষ্ণপদ তার পাশে বসা গম্ভীর মুখ কলাবতীকে একগাল হেসে বলল, ”আরে সাংবাদিকতার এটাই তো ফার্স্ট লেসন। খবরের কাগজে আগে থাকবে খবর। সাহিত্যফাহিত্য, মন্তব্য, উপদেশ, পরামর্শ থাকবে…অবশ্যই থাকবে, কিন্তু পরে। তুমি পরেশ কি সুব্রতকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখো।”
”আবার আমায় নিয়ে কেন টানাটানি করছ কেষ্টদা।” সুব্রত কপি লিখতে—লিখতে কলাবতীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আবার বলল, ”লেখাটা ফেলে না দিয়ে ওকে তো বলতে পারতে এটাকে কিছু এধার—ওধার করে একটা ফিচারের মতো লিখে দাও। আমাদের তো মাঝে—মাঝে ম্যাটার শর্ট পড়ে যায়, তখন ওটা চালিয়ে দেওয়া যেত।”
