”যা বলছি কর।” স্কোরার চাপা ধমক দিল। বেচারা বিলু রানের তোড়ে এমন হিমশিম খাচ্ছে যে, তাল রেখে স্কোর টাঙাতে ভুল করে ৫২—র বদলে ৬২ করে ফেলল।
হইহই করে উঠল দর্শকদের দু—তিনজন।
”ওরে চক্ষুলজ্জার মাথাও কি খেয়ে ফেলেছিস! চুয়াল্লিশ থেকে বাষট্টি, একটা স্ট্রোকেই!… চালিয়ে যা বাবা।”
আর—একজন চেঁচিয়ে উঠল, ”বোলার চেঞ্জ, বোলার চেঞ্জ! এই বোলারটা গুড লেংথে বল ফেলছে, একে চেঞ্জ করো।”
সবাই হেসে উঠল এ—কথা শুনে। লজ্জিত বিলু তাড়াতাড়ি ৫২ করে দিল ৬২—কে।
”দাদা, ব্যাপারটা কী বলুন তো?” কলাবতী উঠে গিয়ে সেই লোকটির পাশে বসল যে ‘ওরে ইন্দ্রজিৎ, বাবা’ বলে চেঁচিয়েছিল। একটি মেয়ে ময়দানে বসে ছোট দুটো ক্লাবের লিগ ম্যাচ দেখছে, লোকটির এতে অবাক হওয়ারই কথা। সে অবাক হয়ে কলাবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”ময়দানে নতুন?”
”হ্যাঁ। ঠিক বুঝতে পারছি না। ওখানে কী হচ্ছে।”
”ক্রিকেট বোঝেন?”
”আমি খেলি। গত বছর বেঙ্গলের হয়ে এলাহাবাদে খেলে এসেছি।”
লোকটি এবার গম্ভীর হয়ে গেল। ”ওই যে ইন্দ্রজিৎ তালুকদার, এই সিজনে ওর চারটে সেঞ্চুরি হয়ে গেছে। ওকে বেঙ্গল টিমে ঢোকাবার দাবিটা জোরালো করতে আরও অন্তত একটা সেঞ্চুরি দরকার। সেই সেঞ্চুরিটাই ওখানে হচ্ছে।”
”হলে, বেঙ্গল টিমে ইন্দ্রজিৎ ঢুকে যাবে?”
”যাবে, ওর লবিটা ভাল। অন্তত চোদ্দজনের মধ্যে তো আসবেই।”
”কদমতলা ফ্রেন্ডস এতে রাজি হল?”
”কদমতলা ফ্রেন্ডস তো আর চ্যাম্পিয়ানশিপের জন্য লড়ছে না। লিগের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে, ওখানেই থেকে যাবে। সুতরাং এই ম্যাচটা হারলে ওদের কোনও ক্ষতি হবে না। অথচ সবুজপাতা ঋণী হয়ে রইল কদমতলার কাছে। পরে যখন কদমতলার দরকার হবে সবুজপাতা ঋণশোধ করে দেবে।”
কলাবতীর স্তম্ভিত মুখটা দেখে লোকটি মুচকি হেসে বলল, ”খেলা দেখুন। বাঙালি ছেলের বীরত্ব কতদূর যায় সেটা স্বচক্ষে দেখুন।”
কলাবতীর দেখা আর শোনা হতে—হতেই ইন্দ্রজিতের ৫২টা ৭২ হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছে সে যেন অ্যালিসের মতো কোনও আজব দুনিয়ায় বসে খেলা দেখছে। যথাসময়ে সেঞ্চুরিটা হয়ে গেল। কদমতলার জনাদুই খেলোয়াড় হ্যান্ডশেক করল, সাদা টুপি এবং ব্যাট তুলে ইন্দ্রজিৎ শামিয়ানা থেকে কয়েকজনের পাঠানো করতালি গ্রহণ করল।
সবুজপাতা শেষপর্যন্ত তিন উইকেটে ম্যাচটা জিতল। কলাবতী স্কোরবই থেকে খেলার ফল টুকে নেওয়ার সময় দেখল, ইন্দ্রজিতের অপরাজিত ১২৪ রানে আছে তেইশটি বাউন্ডারি ও তিনটি ওভার বাউন্ডারি। শতরানে পৌঁছেছে ৪৪ বল খেলে।
ভবনাথদা বলেছিলেন ‘কার কী বক্তব্য জেনে নেবে।’ কোট খুলে চেয়ারে বসে একজন আম্পায়ার চা খাচ্ছেন। কলাবতী তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ”স্কোরবুকে যে জোচ্চচুরি করে রান বাড়ানো হল, তাতে আপনারা আপত্তি করলেন না?”
”বাড়ানো হয়েছে নাকি!” তিনি আকাশ থেকে পড়লেন। ”আমরা তো মাঠে ছিলাম, স্কোরে কী লেখা হয়েছে তা তো আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। দু’দলেরই স্কোরার স্কোর রেখেছে, কেউ তো আমাদের কাছে এই নিয়ে কমপ্লেন করেনি, সুতরাং আমাদের কিছুই করার নেই।”
কলাবতীর মনে হল ময়দানে আর তার থাকার দরকার নেই। শরীর ক্লান্তিতে ভরে উঠেছে। সারাদিনই ফিল্ড করে স্কোরবোর্ডে ৩০০—০ দেখার মতো এখন তার মনের অবস্থা।
কলাবতী সি এস জে সি—র কাঠের ফটক ঠেলে ঢুকেই দেখল, তাঁবুর বাইরের বাগানে খদ্দরের পাঞ্জাবি—ধুতি—পরা কৃষ্ণপদ ভটচাজ একটা চেয়ারে বসে।
”তোমার জন্যই চলে এলুম। একে নতুন, তায় মেয়ে, চেনা পরিচয়টা করিয়ে না দিলে কেউ তো তোমায় পাত্তা দেবে না।… এই যে রূপায়ণ, এদিকে আয়।” কৃষ্ণপদ, প্রচুর দাড়িওলা, চশমাপরা একজনকে ডাকল। ”একে চিনিস? এর নাম কলাবতী সিংহ, আমাদের কাগজে স্পোর্টসে জয়েন করেছে। আজই প্রথম মাঠে এল। ভাল ক্রিকেট খেলে, ভাল লেখে।”
”তাই নাকি? কাল তা হলে তো বঙ্গবাণী পড়তে হবে।”
কলাবতী শুনে খুশি হল, আবার ভয়ও পেল। তার লেখা পড়ে যদি হাসে! যদি বলে কাঁচা, ছেলেমানুষি, কিসসু বোঝে না!
কৃষ্ণপদ আর—একজনকে ডাকল, ”অ্যাই দেবাশিস, শুনে যা।”
”কেষ্টদা এক মিনিট।” কালো রং, দাড়িহীন, সরু গোঁফের লোকটি একজনের সঙ্গে কথা বলছে। কৃষ্ণপদ তখন ফিসফিসিয়ে কলাবতীকে জিজ্ঞেস করল, ”মাঠে গেছলে তো?”
”হ্যাঁ, দুটো মাঠে খেলা দেখেছি।”
”কিছু পেলে? লেখার মতো?”
”হ্যাঁ পেয়েছি। প্রথম মাঠে…” কলাবতী থমকে পড়ল কৃষ্ণপদর ঠোঁটে তর্জনীর চাবি দেখে।
”চুপ। রূপায়ণ, দেবাশিস, ওই যে সুপ্রিয়, এদের সামনে একদম মুখ খুলবে না। যা খবর পাবে পেটের মধ্যে রাখবে। এটা হল সাংবাদিকতার ফার্স্ট লেসন। কাউকে কোনও খবর সাপ্লাই করবে না।”
”কী সাপ্লাই করবে না কেষ্টদা?… আরে তুমি তো কলাবতী সিনহা?” দেবাশিস এগিয়ে এসে বলল।
”কী করে চিনলি একে?” কৃষ্ণপদ পালটা প্রশ্ন করল।
”ওকে তো খেলতে দেখেছি, দাঁড়াও—দাঁড়াও…” দেবাশিস তর্জনী দিয়ে কপালে চারটে টোকা মেরে স্মৃতির ভাণ্ডারের ঢাকনা খুলে বের করে আনল, ”গত বছর এই ইডেনেই, ফার্স্ট বলেই তো তুমি বোল্ড হয়েছিলে? ইয়েস, ইয়েস, বোলার ছিল ডায়না এদুলজি। আমি অবশ্য মেয়েদের ক্রিকেট দেখি না, একটা কাজে মিনিট দশেকের জন্য গিয়ে পড়েছিলুম। ফার্স্ট বলেই… অ্যাম আই কারেক্ট?”
