”আমি বঙ্গবাণীর রিপোর্টার।”
রমেন আরও অবাক! ভরদুপুরে রিপোর্টারি করতে কোনও মেয়েকে সে কখনও দেখেনি।
”আপনি বাগচিকে দিয়ে আর বল করালেন না, এটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। তিন ওভারে পাঁচটা উইকেট যে নেয় তাকে আর বল না দেওয়ার কারণটা বলবেন?”
রমেন ভাবেনি এমন প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতে হবে। ছোট টিমের খেলা দেখতে কখনও কোনও রিপোর্টার আসে না, এইসব খেলায় দর্শকও হয় না। সুতরাং যেমন খুশি তেমনভাবে খেললেও কৈফিয়ত চাইবার কেউ নেই। রমেন কী জবাব দেবে বুঝতে পারছে না। উত্তর হাতড়াতে লাগল।
”ছেলেটার বলের পেস লক্ষ করেছেন?” রমেন প্রশ্ন করল।
”দারুণ।” কলাবতী বলল।
”উইকেটের অবস্থা খুব খারাপ। ময়দানে কোনও খোলা মাঠেই যত্ন নিয়ে উইকেট তৈরি করা হয় না। বাগচির এক—একটা বল এমন লাফিয়ে উঠছিল যে, আমার ভয় করেছিল। মনে হল, ব্যাটসম্যানদের মারাত্মক চোট লাগতে পারে, মারাও যেতে পারে। তাই আর ওকে বল দিইনি।” চমৎকার একটা যুক্তি দাখিলের সুখ রমেনের মুখে ছড়িয়ে পড়ল।
”কিন্তু আমি যতটুকু দেখলাম, তাতে একটা বলও লাফাতে দেখিনি।”
”না, না, কী বলছেন আপনি! ওর থার্ড ওভারে তিনটি বল ব্যাটসম্যানের কপালের কাছে উঠেছিল।”
কলাবতী বুঝল তর্ক করে লাভ নেই, তাই সে এবার চালাকির আশ্রয় নিল। গলাটা একটু নামিয়ে বলল, ”তিলুদা কিন্তু আমাকে বলেছেন মিত্র পরিষদকে আজ আড়াইশো রান দেবেন। আমাকে আণ্ডার প্রিপেয়ার্ড উইকেট বা ইনজুরি হতে পারে বলে কোনও লাভ নেই।”
রমেনের অপ্রতিভ অবস্থাটা কেটে যাওয়ার পর মুখটা থমথমে হয়ে উঠল।
”আপনি যদি ওদের আড়াইশো রান না দেওয়াতে পারতেন, তা হলে কিন্তু পরের ম্যাচেই উনি ক্যাপ্টেন্সি থেকে আপনাকে বরখাস্ত করতেন।”
”তাই বলেছে বুঝি?” রমেন দাঁতে দাঁত ঘষল। ”অফ দ্য রেকর্ড বলছি, পরিষদ হল শিবু ঘোষের টিম। শিবু ঘোষ, নিশ্চয় জানেন বাংলার ক্রিকেটের একটা কেষ্টবিষ্টু, অনেক ক্ষমতা রাখে। শুনছি নাইনটি সিক্সে ওয়ার্লড কাপ ক্রিকেটের খেলা এখানে আনার চেষ্টা হবে। তখন অনেক কমিটি, সাব—কমিটি হবে। শিবু ঘোষ ইচ্ছে করলেই তিলুদাকে একটা কমিটিতে ঢুকিয়ে দিতে পারে। এইবার কি বুঝতে পেরেছেন কেন পরিষদকে তোয়াজ করে জিতিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে? আপনাকে বলেই দিচ্ছি, আমরা দেড়শো রানের মধ্যেই আউট হব, খেলাটা দেখুন আর আমার কথাটা মিলিয়ে নিন।”
”আপনি এইভাবে গড়াপেটা খেলা খেলতে রাজি হলেন?” কলাবতীর স্বরে আন্তরিক বেদনার ছায়া পড়ল। ”একটা অল্পবয়সী সম্ভাবনাময় বোলার, ভাল বল করে সবার চোখে পড়তে চায়, আর তাকে…।”
”আপনি এ—লাইনে নতুন, তাই এইসব কথা বলছেন। ময়দানটা আগে ভাল করে ঘুরে দেখুন। হরির লুটের মতো গড়াপেটা ম্যাচ হওয়ায় গত বছর লিগই বাতিল করা হল। এ—বছর একদিনের লিগ হয়েছে। কিন্তু তাতে কি গড়াপেটার উচ্ছেদ ঘটেছে? করাপ্ট, অল করাপ্ট।” রমেন কথাগুলো বলে সিগারেটটা মাটিতে আছড়ে ফেলে হনহন করে টেন্টের মধ্যে ঢুকে গেল।
ম্যাচটা শেষপর্যন্ত দেখার ইচ্ছে কলাবতীর আর রইল না। সে হাঁটতে শুরু করল। দু—তিনটে মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ খেলা দেখে আবার হাঁটতে লাগল। কোনও মাঠেই তার চোখ বা মন বসল না। বুদ্ধি নেই, সাহস নেই, পরিচ্ছন্নতা নেই, অমন খেলা সময় নষ্ট করে দেখা যায় না।
অবশেষে ক্লান্ত বোধ করে সে ওয়াই এম সি এ মাঠে এল। কিছু দর্শক স্কোরারদের কাছাকাছি ঘাসে পা ছড়িয়ে বসে ঝালমুড়ি চিবোচ্ছে। কলাবতীও এক টাকার ঝালমুড়ি কিনল। স্কোরবোর্ডে দেখল তিন উইকেটে ১০৮। একজনের ২৩ ও অন্যজনের ১৬ রান। আউট হওয়াদের কেউ হয়তো হাফ সেঞ্চুরি করে থাকতে পারে কিন্তু কাগজে তার নাম উঠবে না। সেজন্য নব্বই—টব্বই অন্তত করতে হবে। কলাবতী দর্শকদের পাশে গিয়ে বসল। একজনের কাছ থেকে জেনে নিল, খেলা হচ্ছে, সবুজপাতার সঙ্গে কদমতলা ফ্রেন্ডসের। ব্যাট করছে পাতা।
হঠাৎ তার মনে হল কিছু যেন একটা হচ্ছে। আম্পায়াররা কেমন যেন অন্যমনস্ক, সাত বলে ওভার হল, এমনকী আট বলেও। মিড উইকেটের ফিল্ডার বলের পেছনে ছুটতে—ছুটতে বলে শট মেরে বাউন্ডারি পার করিয়ে দিল। বল এন্তার শর্ট পিচ পড়ছে। যেন স্বাধীন সঙ্ঘেরই ফিল্ডিংটা কলাবতীর মনে হল আবার সে দেখছে। তবে এখানে এগুলো ঘটছে শুধু একজন ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রেই, সে গাওস্করের মতো সাদা সান হ্যাট পরে খেলছে। গাওস্করের মতোই বেঁটে, গাঁট্টাগোট্টা, ব্যাট ধরা, হাঁটাচলাও তার মতো।
”ওরে ইন্দ্রজিৎ, বাবা, আঁকুপাকু করিসনি।” দর্শকদের একজন ব্যঙ্গভরে চেঁচিয়ে উঠল। ”তোর সেঞ্চুরি হবেই হবে, একটু রয়েসয়ে দেখে খেল।”
কলাবতী মুখ ফিরিয়ে দেখল ২৩ সংখ্যাটা ৪৪ হয়ে গেছে তিন ওভারেই। হাফপ্যান্ট পরা একটি ছেলে বোর্ডে স্কোর ঝোলাবার কাজ করছে। স্কোরারদের পেছনে গিয়ে কলাবতী দাঁড়াল। আই. তালুকদারের নামের ঘরে দেখল দশটা বাউন্ডারি আর চারটে এক লেখা।
”বাউন্ডারি, আই. তালুকদার।” এক স্কোরার বলে দিল, অন্যজন তার স্কোরবইয়ে চার বসাল।
”বিলু, স্কোর বায়ান্ন কর।” স্কোরার চেঁচিয়ে হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটিকে নির্দেশ দিল।
”বায়ান্ন কেন? চার মারল, আটচল্লিশ হবে তো!” বিলু প্রতিবাদ জানাল যোগের ভুল ধরিয়ে।
