”এটা রমেনের কাণ্ড, আমাকে ডোবাবার জন্যই বাগচিকে আজ নামিয়েছে।”
কলাবতীর পেছনেই চাপা হিসহিস স্বরে কেউ একজন কথাগুলো বলল। মুখ ফিরিয়ে সে দেখল, বেঁটে গোলগাল, ধুতি, পাঞ্জাবি, জওহরকোট, চশমা, টাকমাথা এবং মুখটা রাগে থমথমে এক প্রৌঢ়। লোকটা কথাগুলো যাকে বলল, সে প্যান্ট, শার্ট খয়েরি হাফহাতা সোয়েটার পরা এক যুবক, মুখটা কাঁচুমাচু।
”এখুনি রমেনকে খবর পাঠা, বাগচিকে আর—একবারও যেন বল না দেয়। বোলিং যদি দেখাতে চায়, তা হলে অন্য ম্যাচে যেন দেখায়।… আড়াইশো রান পরিষদকে দেব কথা দিয়েছি আর রমেন কিনা চারটে উইকেট ফেলে দিল সাত রানে? ক্যাপ্টেনসি করা ঘুচিয়ে দেব। বলে দে, মিত্র পরিষদের টোটাল আড়াইশো করাতেই হবে। নয়তো পরের ম্যাচ থেকে স্বাধীন সঙ্ঘের অন্য ক্যাপ্টেন!”
”এখুনি খবর পাঠাচ্ছি তিলুদা।” খয়েরি হাফ সোয়েটার ব্যস্ত হয়ে পা বাড়াল। তখন একটা আক্ষেপের শব্দ উঠল শামিয়ানার নীচে। কলাবতী তাড়াতাড়ি মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখল সেকেণ্ড স্লিপ মাঠে উপুড় হয়ে, বল যাচ্ছে থার্ডম্যানের দিকে। ক্যাচ ফসকেছে!
এবার ওভারের শেষ বল। বাগচি ষোলো কদম ছুটে আসবে। শেষ কদমে লাফিয়ে উঠে হুবহু কপিলদেবের মতো ডেলিভারিটা করবে। কলাবতী লক্ষ করল, স্ট্রাইকার ডেলিভারির আগেই স্টাম্পের কাছে চলে এল এবং বোধ হয় চোখ বুজিয়ে ফেলেই ব্যাটটা সামনে ধরে রইল।
বোল্ড! হওয়ারই কথা। ব্যাটসম্যানটিকে মনে হচ্ছে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আম্পায়ারের দিকে না তাকিয়েই সে হাঁটতে শুরু করেছে। একজন ফিল্ডার দৌড়ে গিয়ে তাকে আটকাল। নো বল ডেকেছেন আম্পায়ার। ক্রিজে আবার ফিরে যাওয়ার সময় তার চলন দেখে কলাবতীর মনে হল, যেন খুবই অপমানিত বোধ করছে তাকে ডেকে নেওয়ায়। বাগচিকে আর—একটা বল করতে হবে। এবার সে ছুটে এসে খুব ধীরগতির ডেলিভারি করল। স্ট্রাইকারটি ব্যাট চালাল এমনভাবে যাতে বোঝা গেল সে ঠিক করেই রেখেছিল, হয় এস্পার নয়তো ওস্পার! ক্যাচটা উঠল বোলারেরই মাথার ওপর এবং বাগচি সেটা লুফে নিল।
”হাফ সাইড তেরো রানে! অথচ আড়াইশো দেব বলেছি শিবুদাকে।” দীর্ঘনিশ্বাসের মতো একটা শব্দও হল।
কলাবতী আর মুখ ফিরিয়ে দেখল না। সে জানে কথাটা কে বলল। ওদিকে এক গ্লাস জল হাতে খয়েরি হাফ সোয়েটার মাঠের মধ্যে পড়িমরি ছুটে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন রমেনের দিকে।
এর পরই ম্যাচের চরিত্রটা বদলে গেল। পরের ওভারে মিত্র পরিষদ পেল এগারো রান। বাগচি ডিপ ফাইন লেগ থেকে হেঁটে আসছে তার চতুর্থ ওভার বলা করার জন্য। ওর বলে কী আছে সেটা বোঝার জন্য কলাবতী সাইটস্ক্রিনের দিকে এগোল। ওখান থেকে লক্ষ করলে ধরা যাবে বলে কী কারিকুরি রয়েছে।
কিন্তু কী আশ্চর্য! ক্যাপ্টেন হাত নেড়ে বাগচিকে ডিপ ফাইন লেগে ফিরে যেতে বলছে! বাগচি হতভম্বের মতো তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং মাঠের বাইরে কলাবতীও। তিন ওভার বল করে পাঁচ উইকেট পাওয়া বোলারকে আর বল করতে দেওয়া হল না।
এর পর ক্রিকেট খেলার নামে শুরু হল প্রহসন। রানের বন্যা বইতে শুরু করল মাঠের ওপর। এল বি ডবলু—র জন্য একটা আবেদনও আর শোনা গেল না, একটা ক্যাচও আর লোফা হল না, কাছে দাঁড়ানো ফিল্ডারের কাছে বল গেলেও নির্বিঘ্নে রান নেওয়া গেল, ব্যাটসম্যান ক্রিজের দু’হাত বাইরে এবং উইকেটকিপারের গ্লাভসে বল, কিন্তু স্টাম্পড না হয়ে সে ক্রিজে ফিরে এল। একমাত্র বোল্ড আউট হওয়া ছাড়া ব্যাটসম্যানদের আর কোনওভাবে আউট হওয়ার উপায় রইল না। কিন্তু লেগস্টাম্পের বাইরে ছাড়া বলই পড়ছে না, সুতরাং বোল্ড হওয়ারও উপায় নেই।
এত সুযোগ পেয়েও মিত্র পরিষদের আরও তিনজন আউট হল। রানের জন্য দৌড়ে—দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে একজন ব্যাটসম্যান হুমড়ি খেয়ে পড়ে চটপট আর ওঠারই চেষ্টা করল না। তাকে রানআউট না করে উপায় নেই, তাই করা হল। আর—একজন ড্রাইভ ধরনের কিছু একটা করার পর বলটা ব্যাট থেকে স্টাম্পে এসে লাগল। তৃতীয়জন খুব জোরে সামনে দাঁড়ানো সিলি মিড অফ—এর দিকে বল মারে। সে বেচারি নিজের পেট বাঁচাবার জন্য খপ করে বলটা ধরে নেয়। পেট রক্ষা করার আনন্দে সে ক্যাচটা ফেলে দেওয়ার কথা ভুলে যায়।
খেলা দেখতে—দেখতে কলাবতীর আটঘরা—বকদিঘি ক্রিকেট ম্যাচের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। গ্রামের ক্রিকেট আর কলকাতার ক্রিকেট তার কাছে যেন সমান মনে হল। তার থেকেও যেটা বেশি করে অনুভব করল; এইরকম গড়াপেটা করে খেলে যারই লাভ হোক, ক্ষতিটা হচ্ছে বাংলার। ময়দানে যে এইভাবে ক্রিকেট খেলা হয় এটা সে জানত না।
মিত্র পরিষদের ইনিংস লাঞ্চে হল আট উইকেটে ২৫২ রান। দু’দলের খেলোয়াড়রা টেন্টে বসে যখন খাওয়ায় ব্যস্ত, তখন প্রায় নির্জন শামিয়ানার নীচে কলাবতী স্যান্ডুইচের মোড়ক খুলল। খেতে—খেতে সে ঠিক করল, স্বাধীন সঙ্ঘের ক্যাপ্টেন রমেনের সঙ্গে কথা বলে জেনে নেবে কেন সে বাগচিকে দিয়ে আর বল করাল না।
মিত্র পরিষদ ফিল্ড করতে নামার পর কলাবতী দেখল, রমেন টেন্টে ঢোকার কাঠের ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। সম্ভবত ব্যাটিং অর্ডারে নীচের দিকে, তাই এখনও প্যাড পরেনি।
”আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
একটি মেয়ে, দুপুরে ময়দানে ক্রিকেট মাঠে, তাও আবার কথা বলতে চায়, সুতরাং রমেন খুব অবাক হয়ে বলল, ”বলুন।”
