এইবার রাজশেখর তাঁর হাতের বইটা তুলে বললেন, ”কার্ডাস, নেভিল কার্ডাস।… ‘সামার গেম’, সেই টোয়েন্টি নাইনের বই।” বইটা রেখে পাশ থেকে আর—একটা তুলে নিলেন। ”এটা ‘গুড ডেজ’, থার্টি ফোরের বই। বাবা কিনে দিয়েছিলেন, কত বছর পর শেলফ থেকে বের করলুম। কার্ডাসের সেরা আমলের লেখা। কালু এবার তোকে তো এসব বই পড়তে হবে। চার পুরুষ ধরে কার্ডাস পড়ার একটা রেকর্ড তা হলে হবে।”
কলাবতী চোখ প্রায় ছানাবড়া করে বলল, ”ওরে বাবা, ওই কঠিন ইংরিজি পড়ার বিদ্যে আমার এখনও হয়নি দাদু। রেকর্ডটা পরে করলেও চলবে।”
”আমি তোকে বাংলা মানে করে বুঝিয়ে দেব।” বলা বাহুল্য, কথাটা সত্যশেখরের।
”থাক কাকা। ময়দানি ক্রিকেটের হালচালটা আগে বুঝে আসি তারপর তোমার বাংলা—কার্ডাস শুনব।”
.
রবিবার দশটায় কলাবতী ময়দানে পৌঁছল। উঠতি প্রতিভা থাকে ছোট ক্লাবে, এই বিশ্বাসে সে ঠিক করেই রেখেছে ছোট ক্লাবের ম্যাচ দেখবে। শহিদ মিনারের ধারে ভবানীপুর মাঠে আম্পায়াররা স্টাম্পের ওপর বেল সাজাচ্ছেন। বাউন্ডারির ধারে খেলোয়াড়রা জড়ো হয়েছে মাঠে নামার জন্য। কলাবতী এই মাঠের খেলা দেখার জন্য দাঁড়াল না। তার কাঁধে ঝুলছে চামড়ার ঝুলি। তাতে আছে জলের বোতল, স্যান্ডুইচ, কলা, কাপড়ের টুপি আর খাতা—কলম। ভবনাথের উপদেশমতো সে জিনস আর শার্ট পরেছে।
সি এস জে সি টেন্ট ও মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তির মাঝের পথ ধরে এগিয়ে গুরু নানক সরণি আর রেড রোড পার হয়ে, যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মরণে গড়া স্মৃতিস্তম্ভের চাতালে এসে সে দাঁড়াল। তার সামনে রয়েছে ফুটবলে শট নিতে যাওয়া গোষ্ঠ পালের মূর্তি। আরও দূরে মোহনবাগানের ঘেরা মাঠ। ডান দিকে ইডেন গার্ডেনস স্টেডিয়াম, বাঁ দিকে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের ঘেরা মাঠ। এইসবের মধ্যে খোলা মাঠে সাদা ট্রাউজার্স শার্ট পরা লোকেদের ছোটাছুটি, ব্যাট—বলে ধাক্কার শব্দ আর অ্যাপিলের চিৎকার।
কোন মাঠে সে প্রথমে যাবে? তালতলা? পুলিশ, কাস্টমস, গ্রিয়ার না হাইকোর্ট মাঠে? ঘেরা মাঠে সে যাবে না এটা আগেই ঠিক করে রেখেছে। মনে—মনে কিছু একটা স্থির করে সে পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে টস করল। সেটা লুফেই ‘টেইল’ বলে মুঠো খুলে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ”হাইকোর্ট!” মাঠে প্রথম দিন রিপোর্টারি করতে এসেই ঠিক টস ডেকেছে। এটা তার কাছে শুভ লক্ষণ বলে মনে হল।
টেন্টের বাইরে, বাউন্ডারির ধারে ছোট একটা শামিয়ানা। তার নীচে দুই দলের স্কোরাররা টেবলে স্কোর লেখার খাতা বিছিয়ে পাশাপাশি বসে। সঙ্গে পেনসিল, ইরেজার, নানা রঙের কলমে ভরা বাক্স। স্টিলের কয়েকটা চেয়ার আর একটা বেঞ্চ পাতা। দু’দলের কিছু খেলোয়াড়, ক্লাবকর্তা তাতে বসে। দর্শক বলতে কেউই নেই। চমৎকার বাতাস বয়ে আসছে গঙ্গার দিক থেকে। বাউন্ডারি ফ্ল্যাগগুলো টানটান হয়ে উড়ছে। দু’ধারে সাদা বিছানার চাদরের মতো বাঁশে বাঁধা সাইট স্ক্রিন বাতাসে কাঁপছে। কলকাতার মাঝখানে অলস নির্জন দুপুর কাটাবার সেরা জায়গা ক্রিকেট মরসুমের গড়ের মাঠ।
দূর থেকেই কলাবতী শামিয়ানার বাঁশে ঝোলানো স্কুলের ব্ল্যাক বোর্ডের মতো টেলিগ্রাফিক স্কোরবোর্ডটার দিকে তাকাল। তাতে টিনের প্লেটে সংখ্যা ঝুলিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় ম্যাচের হালচাল। বোর্ডের ওপর দিকে পাশাপাশি ঝুলছে শূন্য ও ২, এখন ব্যাটসম্যান দু’জনের এই রান। মাঝে ৪ অর্থাৎ চারজন আউট হয়ে গেছে, তার নীচে ৭, তার মানে ইনিংসের এখন এটাই মোট রান।
চার উইকেট পড়ে গেছে! হতেই পারে না, কলাবতীর মনে হল নিশ্চয় ভুল করে ‘৪’ ঝুলিয়ে দিয়েছে। খেলা তো বড়জোর তিন কি চার ওভার মাত্র হয়েছে, আর এর মধ্যেই সাত রানে চার উইকেট!
দ্রুত পা চালিয়ে সে শামিয়ানার নীচে এল। দু’জন স্কোরারের মাঝে ঝুঁকে বিনীতভাবে সে বলল, ”দাদা চারটে উইকেট কে নিল?”
ওভার সদ্য শেষ হয়েছে। স্কোরবুকের নানা জায়গায় ওরা পেনসিলের আঁচড় দিচ্ছে। কেউ জবাব দিল না।
আবার সে বলল, ”উইকেট চারটে কে…।”
”আপনি কে?” বয়স্ক স্কোরারটি মুখ না তুলে প্রশ্ন করল।
”প্রেস রিপোর্টার।” কলাবতী গলাটা গম্ভীর করে ভারিক্কি হওয়ার চেষ্টা করল। লোকটি তেরছা চোখে কলাবতীকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বিস্মিত হল। ছেলেদের পোশাকে একটি মেয়ে, তাও এত অল্পবয়সী, সুতরাং অবাক তো হবেই!
”কোন কাগজের?”
”বঙ্গবাণী।” বলেই সে অস্বস্তিতে পড়ল। যদি জিজ্ঞেস করে, ”প্রেসকার্ড দেখি?” তা হলে তো একটা বেইজ্জতি পরিস্থিতিতে সে পড়ে যাবে। তার কাছে তো প্রেস রিপোর্টারের কোনও প্রমাণপত্রই নেই। কিন্তু লোকটি আর কোনও কথা বলল না, যেহেতু পরের ওভার আরম্ভ হয়ে গেছে।
খাতা বের করে কলাবতী যতটা সম্ভব ততটা ঝুঁকে স্কোরবুক থেকে বোলারের নামটা পড়ার চেষ্টা করল। স্বাধীন সঙ্ঘের বি. বাগচি নামের বোলারই চারটি উইকেট পেয়েছে। খেলা হচ্ছে মিত্র পরিষদের সঙ্গে। তিনজন শূন্য রাতে বোল্ড; একজন এক রানে এল বি ডবলু; অতিরিক্ত চার বাই রান আর নট আউট ব্যাটসম্যান দুই। বি. বাগচির দু’ওভারে চার উইকেট, এক রান দিয়ে!
খেলার পঞ্চম ওভার শুরু হয়েছে। বাগচির এটা তৃতীয় ওভার। প্রথম বলেই উইকেটকিপারকে ক্যাচ এবং ফসকান এবং বলটা গেল বাউন্ডারিতে। স্কোয়ার লেগ থেকে কলাবতী বুঝতে পারল না বলটা কী ধরনের ছিল। গুড লেংথে জোরে বল, খুবই জোরে। ব্যাটসম্যান যেন ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে কুঁকড়ে গেল। বলটা ব্যাটের কানায় লেগেছিল। মনে হচ্ছে সুইং ছিল। পরের তিনটি বলই প্যাডে লাগল। বাগচি ছাড়া আর কেউ কিন্তু এল বি ডবলু অ্যাপিল করল না। কলাবতী একটু অবাকই হল। আম্পায়ার সবক’টা অ্যাপিলেই মাথা নাড়ল।
