”ভবদা, রেফারি নয়, আম্পায়ার।” সুব্রত টেলিফোনটা মুখ থেকে সরিয়ে কথাটা বলেই আবার ফোনটা মুখে ধরল।
ভবনাথ প্রথমে হতবাক হল, তারপরই রেগে বলে উঠল, ”জানি, জানি, রেফারি নয়, আম্পায়ারই। পঁয়ত্রিশ বছর মাঠ চষছি, আমাকে আর শিখিয়ো না। …রেফারি আর আম্পায়ারের মধ্যে পার্থক্য কিছু কি আছে? সাহেবদের এই এক বাজে অভ্যেস, একই কাজের দুটো নাম দেওয়া। ফুটবলের রেফারি আর হকির আম্পায়ার, কাজ তো একই! তা হলে দুটো নাম দেওয়া কেন?”
প্রশ্নটা যেহেতু কলাবতীর দিকে তাকিয়ে হল তাই সে সযত্নে মাথা নেড়ে বলল, ”কোনও মানে হয় না।”
ভবনাথের রাগ প্রশমিত হল। সে আবার শুরু করল, ”ফুটবল মাঠের মতো মারপিট, হাঙ্গামা ক্রিকেট মাঠেও এখন হচ্ছে। লিগে রেলিগেশনের ম্যাচগুলোতেই বেশি করে হয়। এইরকম ম্যাচে তুমি কিন্তু একদম যাবে না। যদি দ্যাখো লাঠি, বাঁশ নিয়ে কিছু লোক একজনের পেছনে দৌড়চ্ছে, সঙ্গে—সঙ্গে তুমি উলটোদিকে দৌড়বে। কী ঘটল—টটল, সেটা পরে টেন্টে জেনে নেবে। শাড়ি পরে ছুটে পালানো যায় না…।”
”না, না, আমি মাঝে—মাঝে শাড়ি পরি, নয়তো সালোয়ার—কামিজ আর জিনসই বেশিরভাগ সময় পরি।” কলাবতীর কথায় ভবনাথ আশ্বস্ত হল।
”মাথাটাথা ফাটল কিনা, অ্যারেস্ট হয়েছে কিনা এসব তুমি টেন্টে অন্য কাগজের রিপোর্টারদের কাছ থেকেই পেয়ে যাবে। অফিসে এসে ডেসকে যে থাকবে তাকে বললেই সে পুলিশে, হাসপাতালে ফোন করে জেনে নেবে। আচ্ছা, আজ তা হলে এই পর্যন্তই, তোমাকে তো… বাড়ি যেন কোথায়?”
”কাঁকুড়গাছি।”
”ভবদা, বলা ফোন করে জানাল সি এ বি—তে যেতে পারেনি। ছেলের পা ভেঙেছে, তাকে নিয়ে মেডিকেলে গেছে।” সুব্রত বলল ফোন রেখে দিয়ে।
”মুশকিলে ফেললে তো।” ভবনাথ বিব্রত ও বিরক্ত মুখে সুব্রতকে নির্দেশ দিল, ”সি এ বি—তে ফোন করে বিল্টুবাবুর কাছ থেকে জেনে নাও।”
কলাবতী তখন হাঁটতে শুরু করেছে যাওয়ার জন্য। পেছন থেকে পরেশ বলল, ”পেয়ারা কেমন লাগল সেটা বোলো কিন্তু।”
রাস্তায় বেরিয়ে এসে দেখল গাড়িতে ঠেস দিয়ে কাকা রোল খাচ্ছেন। সত্যশেখর তাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”তোর জন্য দুটো রেখেছি, চিকেনের। এত দেরি হল কেন? কী বলল সদানন্দ ঘোষ?”
”যেতে—যেতে বলছি।”
গাড়িতে ওঠার সময় সে দেখল সিটের ওপর দুটো রোল। হাতে তুলে নিয়ে একটা পাকানো কাগজ ছিঁড়ে কামড় বসাল।
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে সত্যশেখর বললেন, ”খেতে বেশ, ঝালটা বেড়ে দিয়েছে, গোটাছয়েক সেঁটেছি। ওদিকে একটা ফুচকাওলাকে দেখলুম—”
”কাকা, আজকের মতো রিটায়ার করো। তার বদলে এই পেয়ারাটা খাও।”
সত্যশেখর পেয়ারায় কামড় দিয়ে দু—তিনবার চিবিয়েই থুঃ থুঃ করে মুখ থেকে ফেলে দিয়ে বললেন, ”মানুষে খায় এ—জিনিস!”
বাড়ি ফেরামাত্র মুরারির কাছ থেকে শুনল দাদু তার জন্য পড়ার ঘরে অপেক্ষা করছেন।
”কাজ হল?”
গদিমোড়া ইজিচেয়ারে রাজশেখর বই পড়ছিলেন। পাশের টেবলেও একটা বই রাখা।
”হল। তোমার চিঠিটা দারুণ কাজে লেগেছে।”
”চিঠি লিখতে জানা চাই। এটা তো আর বেড়াল—কুকুরের ওপর চিঠি নয়।” রাজশেখর নাতনির পেছনে দাঁড়ানো লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন।
”ও—চিঠিটা আমার লেখা ছিল না, মলয়ার লেখা।” সত্যশেখর বিপন্ন প্রতিবাদ জানালেন।
”চিঠি লেখা একটা আর্ট। রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিগুলো একবার পড়ে দেখো, মেয়েকে লেখা জওহরলালের চিঠিগুলোও তো পড়োনি। কিছুই পড়লে না, শুধু অন্যকে দিয়ে চিঠিই লেখালে। …কালু, বলো আমার চিঠিতে কী ফল হল?”
”সদানন্দবাবু তো খুব উচ্ছ্বসিত। আমার ঠাকুর্দা তাঁর বাবার কাছে বাংলা শিখেছেন—”
”ঘেঁচু শিখেছেন।” রাজশেখরের কণ্ঠ থেকে বজ্রপাতের চাপা শব্দ বেরিয়ে এল। ”ক্লাসে এসে শুধু বেতটা দেখিয়ে বলতেন, ‘পদ্য মুখস্থ হয়েছে? বই বন্ধ করে এবার খাতায় লেখ,’ তারপর নাক ডাকিয়ে ঘুমোতেন। অ্যাকের নম্বরের ফাঁকিবাজ ছিলেন সদার বাবা।”
”কিন্তু দাদু, তুমি যে চিঠিতে লিখেছ—।”
”আরে ওটাই তো আর্ট। লিখেছি তো কী হয়েছে? কাজ হাসিল করতে হলে ঠিক জায়গায় ঠিক কথাটি বলতে হয়।”
একগাল হেসে কলাবতী বলল, ”আমিও আজ বলেছি। তোমার নাম করে বলে দিলাম, আমার কাজের জন্য বঙ্গবাণীকে মাইনে দিতে হবে না। ব্যস, ভদ্রলোক এটা শুনে ভীষণ স্বস্তি পেয়ে অমনই স্পোর্টস এডিটরকে তলব করলেন।”
এর পর কলাবতী বঙ্গবাণীতে যা দেখল, শুনল, সবিস্তারে রাজশেখরকে তা জানাল। ”একটা জিনিস বুঝলাম, ওখানকার লোকগুলোর মনটা ভাল, কিন্তু খেলা সম্পর্কে আগ্রহটা যেন কম।” একটু থেমে গভীর স্বরে সে বলল, ”তাতে অবশ্য আমার কিছু আসে—যায় না। আমার দরকার একটা লেখার জায়গা।”
”কিন্তু এই ম্যাচ—রেজাল্ট টোকা রিপোর্টারি করে কি কোনও লাভ আছে?” সত্যশেখর এবার খুবই গুরুতর একটা সমস্যা হাজির করে বাবার দিকে তাকালেন।
”তা কেন?” কলাবতী প্রতিবাদ করল। ”আমাকে টেন্টে গিয়ে রেজাল্ট টুকতে বললেই কি তা করব? মাঠে বসে ম্যাচ দেখব। কেউ ভাল খেললে তার সম্পর্কে লিখব যাতে সি এ বি—র নজরে পড়ে। কাগজে প্রশংসা বেরোলে উঠতি প্লেয়াররা খুব উৎসাহ পায়।”
”তুই উৎসাহ পেতিস?” সত্যশেখর জানতে চাইলেন।
”উৎসাহ! কাগজে তো কখনও আমার নামই বেরোয়নি। উৎসাহ পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”
