তিনজোড়া চোখের উদাসীনতা নিমেষে ঘুচে উদ্দীপনা ফুটে উঠল।
”এ তো খুবই ভাল কথা ভবদা। আমরা সব শিখিয়ে দেব।” পরেশ কথাটা বলে প্যাডের আর—একটা কাগজ ছেঁড়ার জন্য হাত বাড়িয়েও টেনে নিল আড়চোখে কলাবতীর দিকে তাকিয়ে।
”নিজে ক্রিকেট খেলেছে যখন, অন্য খেলাগুলোও বুঝে নিতে পারবে, না পারলে আমরা তো আছিই।”
”বয়স তো খুবই কম, ছোটাছুটি করতে পারবে বলেই তো মনে হয়। এই বয়সে এটা করাও উচিত।”
ভবনাথ কলাবতীর সঙ্গে ওদের পরিচয় করালেন : পরেশ বিশ্বাস, কৃষ্ণপদ ভট্টাচার্য আর সুব্রত ঘোষ। কলাবতীর মনে হল, এরা সবাই তার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বয়সী। কৃষ্ণপদর চুলের তটরেখা কপাল থেকে অনেকটা পিছিয়ে যাওয়ায় যে চড়াটা তৈরি হয়েছে তাকে সামলাবার জন্য ডান কানের পাশ থেকে এক গোছা চুলের প্রবাহ এনে তার ওপর বিছিয়ে দেওয়া। এর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখছে মোটা গোঁফ। সুব্রত ঘোষের ঝাঁকড়া চুল খুবই এলোমেলো। রোগা শরীর, প্যান্টে গোঁজা টি—শার্ট ঠেলে রয়েছে একটা ছোট্ট ভুঁড়ি, গলায় পাউডারের দাগ। কাচের গোল পেপার ওয়েটটা অনেকক্ষণ ধরে আঙুল দিয়ে টেবলে ঘোরাচ্ছে। ছটফটে প্রকৃতির। দ্রুত কথা বলে।
পরেশ বিশ্বাস নাকঝাড়া ছাড়াও কলম দিয়ে কান খোঁচায়। ধীরে কথা বলে। রেক্সিনের একটা হাতব্যাগ তার সামনে। ব্যাগটা খুলে একটা সবুজ ডাঁশা পেয়ারা বের করে কলাবতীর দিকে বাড়িয়ে বলল, ”আমার বাড়ির গাছের।”
ইতস্তত না করে পেয়ারাটা সে তুলে নিল। পরেশকে তখন খুশি দেখাল। ”তা হলে ভবদা ওকে প্রথমে মাঠ করতে পাঠান।”
মাঠ করা কী জিনিস! কলাবতী বিভ্রান্ত বোধ করল।
”রোববারে আমাদের লোক কম থাকে, সোমবারের কাগজে জায়গা বেশি, ভরাতে প্রাণ বেরিয়ে যায়।” পরেশ কলমটা কানে ঢুকিয়ে একচোখ বন্ধ করে দু’বার ঘোরাল।
”আমিও ঠিক তাইই ভেবেছি।” ভবনাথ টেবলে দু’হাত রেখে ঝুঁকে পড়ল। ”অন্যের লেখা অনুবাদ করে কি নিজের লেখা তৈরি করা যায়?”
”যায় না।” কৃষ্ণপদ বলল।
”লেখা ওরিজিন্যাল হওয়া চাই। সেটাই তো আসল কথা। নিজের স্টাইল, নিজের গদ্য শুরু থেকেই গড়ে তুলতে হবে। নিজে যা দেখবে, শুনবে, বুঝবে, তাই দিয়ে গুছিয়ে অল্পকথায় সহজভাবে লিখবে। কেমন, তাই তো?” ভবনাথ সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে আবার বলল, ”ঠিক বলেছি তো?”
তিনটি মাথা অনুমোদন জানিয়ে নড়ে উঠল। কলাবতীর মনে পড়ল বড়দিও ঠিক এই কথাই ক্লাসে বলেছিলেন, তবে প্রসঙ্গটা অন্যরকম ছিল। দেখা, শোনা, বোঝা যেন যথার্থ হয় অর্থাৎ লেখাটা রগরগে করার জন্য, তর্ক বাধানোর জন্য বানিয়ে মিথ্যা কিছু লিখো না।
”কলাবতী, তা হলে সামনের রোববারই তুমি মাঠে যাও। লিগ ক্রিকেট চলছে। ময়দানের বড় মাঠগুলো তুমি তো চেনো। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, কালীঘাট, ইডেন— এগুলোয় পারলে ঢুঁ মারবে। বাড়ি থেকে সোজা ময়দান চলে যাবে, সন্ধের মধ্যেই অফিসে এসে লিখে দিয়ে তারপর বাড়ি। ডেসকে যে থাকবে সে তোমার লেখা ঝাড়মোছ করে দেবে, ভুলটুল কিছু হলে দেখিয়ে দেবে।”
”রোববার আমি ডেসকে থাকব, কিছু চিন্তা কোরো না।” কেষ্ট ভট্টাচার্য আশ্বস্ত করল কলাবতীকে।
”আমি কোন ম্যাচটা তা হলে করব?” এতক্ষণে কলাবতী কথা বলল।
”সব ম্যাচ।” ভবনাথ দু’হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ”গড়ের মাঠে যত খেলা আছে, সব।”
কলাবতী আবার বিভ্রান্ত হল। রবিবার ময়দানে দুটো ডিভিশনের কতগুলো লিগ ম্যাচ হয়? পনেরো—কুড়িটা! তা হলে সব ম্যাচ একজনের পক্ষে দেখা কি সম্ভব!
”আরে তুমি কি সব ম্যাচ দেখবে নাকি?” সুব্রত পেপার ওয়েট ঘোরানো বন্ধ করল। ”সব ম্যাচের রেজাল্টটা শুধু নেবে। এ—মাঠ ও—মাঠ ঘোরাঘুরিও করতে হবে না। সি এস জে সি, মানে ক্যালকাটা স্পোর্টস জার্নালিস্ট ক্লাব টেন্টটা তো চেনো?”
কলাবতী মাথা কাত করল। একবার তাদের বাংলা দলের প্রেস কনফারেন্স হয়েছিল ওখানে। সে হাজির ছিল। সুব্রত পেপার ওয়েটে মনোনিবেশ করেছে। তার অসম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব নিল কেষ্ট। ”ক্লাবের লোকেরাই স্কোরবুক নিয়ে টেন্টে আসবে। তাই থেকে তুমি যা দরকারি মনে হবে টুকে নেবে।”
বেয়ারা চন্দ্রনাথ একগোছা কপি টেলিপ্রিন্টার থেকে এনে পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে রেখে যাওয়ার আগে কলাবতীর দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। পরেশ কপিগুলো টেনে নিল। টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলে সুব্রত বলল, ”বঙ্গবাণী স্পোর্টস।”
তখন ভবনাথ গলা নামিয়ে কলাবতীকে বোঝাতে শুরু করল, ”যারা স্কোরবুক নিয়ে আসবে তারাই বলে দেবে সেঞ্চুরি হয়েছে কিনা, কোনও বোলার পাঁচ—ছ’টা উইকেট পেয়েছে কিনা, হ্যাটট্রিক হয়েছে কিনা। নামী কোনও প্লেয়ার সেঞ্চুরি করলে কত বলে কত মিনিটে, ক’টা বাউন্ডারি আর ওভার বাউন্ডারি, ওটাও লিখে নেবে। কোনওরকম ডিসপিউট দেখা দিলে, কার কী বক্তব্য জেনে নেবে।”
কিছু কপি কৃষ্ণপদর সামনে ঠেলে দিয়ে পরেশ বলল, ”দ্যাখ তো কেষ্ট, ক্রিকেট বোর্ডের মিটিং ছিল, কোনও খবরটবর আছে কিনা।”
সুব্রত মুখ নামিয়ে টেলিফোনে কথা বলে যাচ্ছে নিচুস্বরে। ভবনাথ বোকা ছাত্রীকে জ্যামিতির কঠিন একটা প্রবলেম বোঝাবার মতো মুখ করে বলল, ”আউট—ফাউট নিয়ে খুব ঝামেলা হয়। সাপোর্টাররা তো বটেই, ব্যাটসম্যানরাও রেফারিকে মারে।”
